ইলিশশূন্য নদী, সমুদ্রে নিষেধাজ্ঞা : জীবিকা সংকটে বরিশালের জেলেরা

বণিক বার্তা প্রতিনিধি বরিশাল | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ২০, ২০১৯

বরিশালের নদীতীর ও উপকূলবর্তী জেলেদের জীবিকার প্রধান উৎস ইলিশ মাছ। বর্তমানে জেলার নদীগুলোয় ইলিশ মিলছে না। অন্যদিকে সমুদ্রে চলছে মাছ ধরায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা। এ অবস্থায় বরিশালের হিজলা, মুলাদি, মেহেন্দিগঞ্জ ও সদর উপজেলার জেলেরা চরম জীবিকা সংকটে পড়েছেন।

মেঘনা নদীতীরবর্তী হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের জেলে পল্লীর জেলেরা জানান, বর্তমানে নদীতে জাটকা ধরায় নিষেধাজ্ঞা চললেও বড় ইলিশ ধরা যাবে। কিন্তু নদীগুলোয় এখন ইলিশ মিলছে না। এ অবস্থায় সাগরে গিয়ে মাছ ধরারও উপায় নেই। কারণ ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সাগরে মাছ ধরায় সরকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ শহরে গিয়ে দিনমজুরের কাজ করছেন। দাদন পরিশোধের চাপে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকেই।

তারা অভিযোগ করে বলেন, বছরের বেশির ভাগ সময়ই তাদেরকে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়তে হয়। অথচ এ সময় প্রতিশ্রুত সরকারি সহায়তাও সঠিকভাবে দেয়া হয় না। দিন-রাত নদীতে থাকায় এ সাহায্যের খোঁজও তারা তেমন জানেন না। স্থানীয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে সাহায্য পেতে হলে বাড়তি টাকা গুনতে হয়। ফলে সারা বছর দাদনদারসহ বিভিন্ন এনজিওর কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে মৌসুমে মাছ না পেয়ে অনেক জেলেই এখন পেশা ছাড়ছেন।

তেঁতুলিয়া ও মাসকাটা নদীর জেলেপাড়াগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দাদন পরিশোধ তো দূরের কথা, এখন প্রতিদিনের খাবার জোগানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানিক মাঝি নামে এক জেলে বলেন, সারা দিন জাল ফেলে এক-দুটির বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ইলিশ বিক্রি করে দাদনদারের টাকা পরিশোধ সম্ভব নয়।

রহিম মিয়া নামে এক দাদনদার বলেন, তিনি এ বছর ৭০ জন জেলেকে কয়েক লাখ টাকা দাদন দিয়েছেন। এর বিপরীতে গত দুদিনে এসব জেলে মাত্র ৩২ কেজি ইলিশ মাছ সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

মেহেন্দিগঞ্জের কালাবদর নদীতে বেশ কয়েকজন জেলে জানান, আগে জ্যৈষ্ঠ মাসে তারা প্রচুর ইলিশ পেতেন। কিন্তু এবার জ্যৈষ্ঠের শেষেও তাদের খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের মাসকাটা নদীর জেলে সুমন জমাদ্দার, খলিল মৃধা, আজাহার মাঝি, রফিক সিকদার বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে তারা আর নদীমুখী হবেন না।

এদিকে ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে বরিশালের পোর্টরোডের মাছের মোকামগুলোয়। ইয়ার উদ্দিন নামে এক মাছের ব্যবসায়ী বলেন, প্রতি বছর এ সময় মোকামে শ্রমিকরা মাছ আনা-নেয়ায় ব্যস্ত সময় পার করেন। কিন্তু এ বছর ব্যতিক্রম। মাছের দেখা মিলছে না। আরো একাধিক মত্স্য ব্যবসায়ী জানান, বরিশালের মোকামে ইলিশ সরবরাহের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

ভরা মৌসুমে এ মোকামে প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ হাজার মণ ইলিশ বেচাকেনা হলেও এবার মৌসুমের শুরুতে মোকাম প্রায় ইলিশশূন্য।

জেলা মত্স্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস জানান, বরিশালে ৭৪ হাজার ৪৯৪ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। এ মৌসুমে বরিশালে সরকারের পক্ষ থেকে মাত্র ৭৪ দশমিক ৪ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ চাল সব জেলেকে দেয়া সম্ভব হবে না। তাই ইউনিয়ন পর্যায়ে জেলেদের তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাই করে ৩১ হাজার ৩১৫ জন জেলের মধ্যে নিষেধাজ্ঞার চার মাস ৪০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হবে।

জেলা মত্স্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, জাটকা নিধনে নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত আট মাস নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সাগরে দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে নদীতে কিছুদিনের মধ্যেই ইলিশ মিলবে। তখন আর জেলেদের সমস্যা হবে না।