শেষ পাতা, খবর, , ,

২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

টিপু সুলতান ও বিডিবিএলের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০০:০০:০০ মিনিট, জুলাই ১২, ২০১৯

খোলাবাজার থেকে গম ক্রয়ে সরকারের চুক্তির ভুয়া কাগজ দেখিয়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) ২৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে মেসার্স ঢাকা ট্রেডিং হাউজের কর্ণধার টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে। বিডিবিএলের কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় টিপু সুলতান ও বিডিবিএলের তিন কর্মকর্তাসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

কমিশনের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মামলাটি করতে যাচ্ছে দুদক। মামলায় প্রধান আসামি করা হচ্ছে ব্যবসায়ী টিপু সুলতানকে। অন্য আসামিরা হচ্ছেন বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখার এসপিও দীনেশ চন্দ্র সাহা, এজিএম দেওয়ান মোহাম্মদ ইসহাক ও জেনারেল ম্যানেজার (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ রহমান কাদরী।

দুদক সূত্র জানায়, খোলাবাজার থেকে গম বা ধান কেনার জন্য কোনো বেসরকারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের চুক্তি হয় না। সরকারি কর্মকর্তারা নিজেরা সরাসরি এ গম বা ধান ক্রয়ের কাজটি করেন। অথচ সরকারের সঙ্গে কৃষকদের কাছ থেকে ১৫ হাজার টন গম ক্রয়ের ভুয়া চুক্তির কাগজ দেখিয়ে ৩০ কোটি টাকার ঋণ আবেদন করেন ব্যবসায়ী টিপু সুলতান। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করেই ২৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যবসায়ী টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে এ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগ উঠলে তা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় বাজার থেকে ১৫ হাজার টন গম সংগ্রহের জন্য খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী টিপু সুলতান স্বাক্ষরিত এমওইউর কাগজ দেখিয়ে ব্যাংকের কাছে ঋণের আবেদন করা হয়। ২০১২ সালের ২১ মার্চ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৬৭তম সভায় প্রস্তাবিত এলটিআর ফ্যাসিটিলির ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ জামানত হিসেবে ও সমপরিমাণ অর্থের এফডিআর লিয়েন রাখার শর্তে ১৫ শতাংশ মার্জিনে ৩০ কোটি টাকার লোকাল এলসি লিমিট অনুমোদন করা হয়। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ হিসাবে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার এলটিআর ঋণ মঞ্জুর করা হয়। একই বছরের ৪ জুন মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হলে তার পরদিনই ৫ জুন বিডিবিএলে এলসি স্থাপন করা হয়। এলসি নেগোসিয়েশন ব্যাংক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের বিজয়নগর শাখায় ৬ জুন ফরওয়ার্ডিং শিডিউলসহ শিপিং ডকুমেন্টস দাখিল করা হয়। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ওইদিনই তা বিডিবিএলে পাঠানো হয়। বিডিবিএলের নোটিংয়ে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ট্রেডিং হাউজ ৬ জুন পত্রের মাধ্যমে এলসিতে উল্লেখিত মালপত্র বুঝে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ডকুমেন্ট ছাড় করার অনুরোধ করা হয়েছে।

আগের দিন এলসি স্থাপন করার পরদিনই ১৫ হাজার টন গম বুঝে পাওয়ার বিষয়টি ব্যাংলদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের সন্দেহের উদ্রেক করে। পরবর্তী সময়ে বিডিবিএল কর্তৃক নিয়োগকৃত অডিট ফার্ম জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোং কর্তৃক প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের গ্রাহক মেসার্স ঢাকা ট্রেডিংয়ের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যাংকিং পদক্ষেপ গ্রহণ, সরবরাহ ডকুমেন্টের সত্যতা যাচাই-বাছাইকরণ ঋণের শ্রেণীকরণ সঠিক হচ্ছে কিনা তা নিরীক্ষার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত নিরীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করে খসড়া প্রতিবেদন দাখিল করে। রেকর্ডপত্রাদি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আপ টু ডেট ইনকাম ট্যাক্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা হয়নি। কেওয়াইসিতে টিন নম্বর সংযোজন করা হয়নি। কেওয়াইসির পরিচয়দানকারী তথ্য সঠিক নয়। কেওয়াইসির গ্রাহক টিপু সুলতানের পিতার নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রে টিপু সুলতানের পিতার নাম এক নয়। ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকা ট্রেডিং হাউজের এলটিআর অ্যাকাউন্ট নং ৮৪১০০০০০৮৪ টি খোলেন ও ৯ এপ্রিল ঋণসংক্রান্ত ২৫ কোটি টাকা অনুমোদন হয় এবং ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। ২৫ কোটি টাকার ঋণটি গ্রাহকের পরিশোধ প্রক্রিয়া, দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাই না করেই খুব দ্রুত অনুমোদন করা হয়। যে এমওইউর জন্য ওই ঋণটি দেয়া হয়, তা পরবর্তী সময়ে জাল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, অর্থাৎ জাল রেকর্ডপত্রাদিকে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ঋণটিকে সুকৌশলে অনুমোদন করে নেয়া হয়েছে। পাঁচ হাজার টন পণ্য একদিনে একটি ট্রাকে পরিবহন দেখানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এলটিআরের বিপরীতে কোনো টাকা পরিশোধ হয়নি এবং ঋণটি বর্তমানে শ্রেণীকৃত অবস্থায় আছে, যার বিপরীতে মর্টগেজ একেবারেই অপ্রতুল এবং এটা পরিশোধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

খাদ্য অধিদপ্তরের বণ্টন ও বিতরণ বিভাগের পরিচালক মো. বদরুল হাসান স্বাক্ষরিত ইউও নোট নং ৩-এর কপি ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি অনুযায়ী, তিনি (বদরুল হাসান) টিপু সুলতানের সঙ্গে কোনো এমওইউর চুক্তি সম্পাদন করেননি। এছাড়া একই বছর (২০১৫) ২৬ জানুয়ারি জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টসের বিশেষ অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণটি প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে ব্যাংক কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।

গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল অব ফুডের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার লিখিত ছাপানো মনোগ্রামযুক্ত প্যাডের পাতা গোপনে ও সুকৌশলে সংগ্রহ করে ২০১২ সালের ২৪ মার্চ ইস্যু করা দেখিয়ে পরিচালক বদরুল হাসান খাদ্য বিভাগের মহাপরিচালকের লিখিত ভুয়া সিল ও তার স্বাক্ষর জাল করে নিজ নামে টেন্ডার গৃহীত এবং এমওইউ সম্পাদিত মর্মে একখানা ইংরেজি পত্র ইস্যু দেখিয়ে তা নিজেই অত্র ব্যাংকে ২০১২ সালের ৭ মার্চ দাখিল করে ডকুমেন্টটি সরকারি অফিসে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত ও স্বাক্ষরিত মর্মে মঞ্জুরার্থে সুকৌশলে ব্যাংকের বিশ্বাস জন্মান এবং নিজেরা লাভবান হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতিসাধন করে গ্রাহককে ওই টাকা আত্মসাতে সরাসরি সহায়তা করে দণ্ডবিধির সম্পৃক্ত ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। ভুয়া চুক্তিপত্র দাখিল করে নিজেরা লাভবান হয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক প্রতারণার মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে ওই ভুয়া ডকুমেন্ট কোনোরূপ যাচাই-বাছাই ছাড়া এর বিপরীতে বিডিবিএল থেকে গ্রাহক টিপু সুলতানকে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলনের সুযোগ করে দিয়েছেন। গ্রাহক টিপু সুলতান ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন মর্মে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৭১, ১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় কমিশন কর্তৃক একটি মামলা রুজুর অনুমোদন দেয়া হয়। শিগগিরই পল্টন থানায় মামলা করা হবে।