শেষ পাতা

নড়াইলের কিষাণ অ্যাকিউমুলেটরস লিমিটেড

কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ

বণিক বার্তা প্রতিনিধি, নড়াইল | ০১:৪৫:০০ মিনিট, মে ১৬, ২০১৯

নড়াইল শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের গ্রাম উজিরপুর। ছোট এই গ্রামে প্রায় আট একর জমিতে গড়ে ওঠে কিষাণ অ্যাকিউমুলেটরস লিমিটেড নামে একটি ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট। ২০১৮ সালে সফলভাবে উৎপাদন শুরু করা এ কারখানা এখন দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট।

মূলত নিজ জেলা নড়াইলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে উজিরপুরে এ কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন প্রকৌশলী মো. কালাম হোসেন। কারখানাটিতে বর্তমানে তিন শতাধিক কর্মী কাজ করেন। এর মধ্যে ১৬০ জন রয়েছেন স্থায়ী কর্মী, যার এক-তৃতীয়াংশই নারী। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এ কারখানা পুরোপুরি শ্রমিকবান্ধব। এখানে নারী-পুরুষ কোনো বেতনবৈষম্য নেই। শ্রমিকদের তিন বেলা খাবার কারখানা থেকেই দেয়া হয়। এছাড়া শ্রমিকদের জন্য বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট পোশাক রয়েছে। মাসে একবার করে বিনা মূল্যে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থাও আছে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।

কারখানাটিতে কর্মরতদের অধিকাংশই স্থানীয়। বাড়ি থেকে আসা-যাওয়া করেই কাজ করেন তারা, যা তাদের এনে দিয়েছে বাড়তি সুবিধা। আসলাম নামে কারখানাটির এক শ্রমিক বলেন, প্রতিদিন মূল ডিউটি করার পরে দিনে চার-ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম করতে পারি। প্রতি মাসে ৫-৬ তারিখের মধ্যে বেতন পেয়ে যাই। শ্রমিক আসিক বিল্লাহ জানান, নিজ বাড়ি থেকে কাজে আসি, তাই বাড়তি খরচ হয় না। এখান থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে পরিবার নিয়ে ভালো আছি।

নারী-পুরুষ বেতনবৈষম্য না থাকায় বেশ খুশি কারখানাটির নারী কর্মীরাও। আসমা আক্তার নামের এক নারী শ্রমিক জানান, আগে তিনি ঢাকায় একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। সেখানে পুরুষরা একই কাজ করে তার চেয়ে বেশি বেতন পেতেন। কিন্তু এ কারখানায় নারী-পুরুষ কোনো ভেদাভেদ নেই। প্রত্যেক নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরি সমান।

কারখানাটি প্রতিষ্ঠার পর গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা খন্দকার সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, কারখানায় স্থায়ী কর্মী দেড় শতাধিক হলেও এলাকার আরো অন্তত ২০০ জন বেকার মানুষ বিভিন্নভাবে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। সব মিলিয়ে কারখানাটি চালু হওয়ায় তিন শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

কারখানার নির্বাহী পরিচালক মো. সুরুজ্জামান জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে সম্পূর্ণ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করা হয়, যাতে এখানে কাজ করা শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে  কোনো ক্ষতি না হয়। নড়াইলের মানুষের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ চলছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

কেবল কর্মীবান্ধব নয়, কারখানাটি পরিবেশবান্ধবও। পরিবেশের কথা চিন্তা করে কারখানাটিতে রয়েছে নিজস্ব ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ও বায়ু ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। কারখানার সব বর্জ্য পানি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে পরিশোধন হয়ে নির্দিষ্ট পুকুরে যায়। সেই পুকুরে মাছের চাষ করা হয়। বায়ুদূষণ রোধে এখানে বায়ু ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করা হয় এ কারখানায় রিসাইকেল করার জন্য। এসব পুরনো ব্যাটারির সিসা আলাদা করা হয়। পরে ওই সিসাকে গলিয়ে বর্জ্য আলাদা করে পুনর্ব্যবহার উপযোগী (পিওর) সিসা বের করা হয়। গ্রে-অক্সাইড ও রেড-অক্সাইড দুই ভাগে ভাগ করে লুকাস, নাভানা, সাইফ পাওয়ারটেকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটারি কারখানায় বিক্রি করা হয় এসব সিসা।

কারখানার কর্মকর্তারা জানান, সিসা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেখানে-সেখানে পুরনো ব্যাটারি দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে সেই ব্যাটারির সিসায় পরিবেশের অনেক ক্ষতি হয়। এ কারখানায় পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে সিসা সংগ্রহ করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করায় পরিবেশের অনেক উপকার হচ্ছে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা বলেন, সিসা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলেও কারখানাটিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়ছে না। জেলায় আগামীতে যারা কলকারখানা নির্মাণ করতে চান, তাদের পরিবেশের কথা চিন্তা করে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার অনুরোধ জানান জেলার এ কর্মকর্তা।

বাংলাদেশে মোট তিনটি ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট রয়েছে। মধুখালী ও গাজীপুরে আলাদা দুটি ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট আছে। দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নড়াইল পৌর এলাকার উজিরপুর গ্রামের এই পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি রিসাইকেল প্লান্ট। পুরনো অব্যবহূত ব্যাটারি থেকে এখানে মাসে ৫০০ টন সিসা উৎপাদন করার ক্ষমতা রয়েছে।

পরিবেশ নিয়ে কাজ করা এনজিও স্বাবলম্বীর নির্বাহী পরিচালক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য পরিবেশের ক্ষতি করছে। কিন্তু এ কারখানাটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এখানে কর্মরত শ্রমিকদের কোনো ঝুঁকি নেই, পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামীতে নড়াইলে যেসব কলকারখানা নির্মাণ হবে, সেগুলো যেন পরিবেশবান্ধব কলকারখানা হয়।