প্রথম পাতা

আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভা

বোঝা নামাতে আপসের পথ

হাছান আদনান | ০১:০২:০০ মিনিট, মে ১৫, ২০১৯

অনেকে শিল্প করার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু সময়মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় কারখানা করেও তা চালু করতে পারেননি। কারখানা চালু করতে না পেরে পরিশোধ করতে পারেননি ব্যাংকঋণও। পরিস্থিতির কারণে খেলাপি হয়ে গেছে এ ঋণ। তবে অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে দেশ ছেড়েছেন। ঋণের টাকায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিলাসী জীবনযাপনও করছেন অনেকে। আইনি ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যাচ্ছেন ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপিরা। মামলা করেও এসব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা যাচ্ছে না।

খেলাপি ঋণকে অর্থনীতির বড় ‘বোঝা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ অবস্থায় কঠোরতা নয়, ‘বোঝা’ নামাতে বরং আপসের পথেই হাঁটছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে সায় দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা অনুমোদন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আজকের পর্ষদ সভায় নীতিমালাটি অনুমোদন হতে পারে বলে জানা গেছে।

যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, এর ফলে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ভেঙে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে যেসব বড় গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করছেন না, ব্যাংকিং খাতের ওপর তারা আরো চাপ তৈরি করবেন।

স্বাধীনতার পর থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন, এমন খেলাপিদের অফুরন্ত সুযোগ দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালাটি পর্যালোচনা করে নতুন নীতিমালা তৈরি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় সব শর্তই অপরিবর্তিত থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

আজ বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় নতুন নীতিমালাটি উপস্থাপন করা হচ্ছে। সভায় পাস হলে দু-একদিনের মধ্যেই খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল নীতিমালাসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে। তবে নীতিমালা তৈরিতে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। পর্ষদ সভার কর্মসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা না হলেও বিবিধ আলোচনায় পুনঃতফসিলসংক্রান্ত নীতিমালাটি উপস্থাপন করা হতে পারে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট হবে মোট ঋণের ২ শতাংশ। প্রজ্ঞাপন জারির পরবর্তী ৯০ দিন, তথা তিন মাসের মধ্যে পুনঃতফসিলের জন্য আবেদন করতে হবে। তবে পরিস্থিতির বিচারে এ মেয়াদ বাড়ানোও হতে পারে। পুনঃতফসিলের আবেদন করতে হবে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক এককালীন হিসাবায়ন করে।

ঋণের সুদহার অতীতে যা-ই থাক না কেন, পুনঃতফসিলের পর ওই ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ। তবে ৯ শতাংশের সুযোগ পেতে হলে ঋণটি এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এক বছরের মধ্যে এককালীন ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সে ঋণের সুদহার হবে ১১ শতাংশ। সম্পূর্ণ মওকুফ করে দেয়া হবে ঋণখেলাপিদের অনারোপিত সুদ। স্থগিত থাকবে আরোপিত সুদের ওপর ধার্যকৃত সুদও। ঋণ পরিশোধে থাকতে পারে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড। পুনঃতফসিলকৃত খেলাপি ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত সময় পাবেন খেলাপিরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি চিহ্নিত করতে একটি কমিটি গঠন করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় এ কমিটির নেতৃত্বে থাকবে। যেসব ঋণখেলাপি পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা নেবেন না, তাদের খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা নেবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো খসড়া নীতিমালায় ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপিরা পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা পাবেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কী প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি বাছাই করা হবে, সেটি সুস্পষ্ট নয়। এজন্য এ শর্তের বিরোধিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো ‘ইচ্ছাকৃত’ ঋণখেলাপি বাছাইয়ের সুযোগ নিয়ে দুর্নীতি হতে পারে। এ দায়িত্ব অর্থ মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি নিলে গড়ে উঠতে পারে সিন্ডিকেট। এক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল ইস্যুতে বাণিজ্য হবে। আবার ব্যাংকগুলোও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির দোহাই দিয়ে দুর্বল ও ছোট গ্রাহকদের পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী চিহ্নিত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরা প্রভাব খাটিয়ে বেরিয়ে আসবেন।

২০১৫ সালে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, এমন গ্রাহকদের ঋণ বিশেষ বিবেচনায় পুনর্গঠন করা হয়েছিল। ওই সময় ১১টি শিল্প গ্রুপের ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে বড় ধরনের সুবিধা দেয়া হয়। যদিও বড় সুবিধা পাওয়ার পরও দুই-তিনটি ছাড়া বাকি গ্রুপগুলো ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় ছোট, মাঝারি, বড় তথা সব ধরনের ঋণখেলাপি সুযোগ পাবেন। তবে এ প্রজ্ঞাপনের আওতায় বিশেষ সুবিধা পেতে ঋণখেলাপি ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে যৌথভাবে আদালতে চলমান মামলা স্থগিত করার আবেদন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যে খসড়া নীতিমালা পাঠানো হয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামীকালের (আজ) পর্ষদ সভায় এ-সংক্রান্ত কোনো কর্মসূচি আছে কিনা, সেটি আমি জানি না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের মতামত জানিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে।

প্রসঙ্গত, গত মার্চ থেকে ঋণখেলাপিদের মাফ করে দেয়া, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বেশ কয়েক দফায় বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। খেলাপি ঋণ কমানোর লক্ষ্যে গত ২৫ মার্চ এক ঘোষণায় তিনি বলেন, মোট ঋণের ২ শতাংশ এককালীন জমা দিয়ে ভালো খেলাপিরা নিয়মিত হতে পারবেন। ঋণের পুরো অর্থ পরিশোধে সময় পাবেন ১২ বছর। সুদহার ১০, ১২ বা ১৫ যা-ই থাকুক না কেন, ঋণের সুদ হবে ৭ শতাংশ। ১ মে থেকে এটি বাস্তবায়ন হবে। এরপর ২ এপ্রিল তিনি ঋণের সুদহার ৭-এর পরিবর্তে ৯ শতাংশ হবে বলে জানান। পরে খেলাপি গ্রাহকদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিলের একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় পুনঃতফসিলকৃত ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দিতে বলা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো খসড়া নীতিমালা ধরেই ঋণখেলাপিদের বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্রাহক-ব্যাংক সম্পর্কের ভিত্তিতেই আমরা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিই। যে গ্রাহক দুই বছরের পুনঃতফসিল সুবিধা পেলে ঋণ পরিশোধ করে দিতে পারবেন, তাকে ১০ বছর সময় দেয়া অযৌক্তিক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলসংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন করতে পারে। কিন্তু অযৌক্তিক কোনো কিছু চাপিয়ে দেয়া হলে, সেটি কার্যকর করা কঠিন হবে। প্রজ্ঞাপন জারি হলে তবেই এ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত ধারণা পাওয়া যাবে।

গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় একই সময়ে ৩৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পুনঃতফসিল করা খেলাপি ঋণ হিসাবে ধরলে ব্যাংক খাতে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি স্ট্রেসড লোন রয়েছে।