শিল্প বাণিজ্য

উপেক্ষিত জাহাজ ভাঙা শ্রমিকের নিরাপত্তা

সচল হচ্ছে না ইয়ার্ডভিত্তিক সেফটি কমিটি

দেবব্রত রায়, চট্টগ্রাম ব্যুরো | ২১:৫৫:০০ মিনিট, মে ১৫, ২০১৯

শ্রমিক নিরাপত্তার দিক থেকে অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও জাহাজ ভাঙা শিল্পের ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন ও কার্যকর হচ্ছে না। এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বিধি ও ইয়ার্ড মালিকদের বারবার তাগিদ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে গত এক দশকে এ শিল্পে দুর্ঘটনায় তিন শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন আরো অনেকে।

কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা বিষয়ে জাহাজ ভাঙা শিল্প মালিক ও শ্রমিকপক্ষ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে শ্রমিকদের মধ্যে অনীহা রয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, ব্যবহার উপযোগী সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না। এছাড়া ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করানোর কারণে শ্রমিকদের অভিযোগ-অনুযোগ জানানোর জায়গাও থাকে না।

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে ১৯৬৫ সালে জাহাজ ভাঙা শিল্পের গোড়াপত্তন। ২০০৪-০৯ এ পাঁঁচ বছর বাংলাদেশ জাহাজ ভাঙা শিল্পে বিশ্বে প্রথম ছিল। এখন ভারত প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়। দেশে ইস্পাতের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশের জোগান আসে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে। এ থেকে বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পায় সরকার। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সচল অন্তত ৬০টি শিপইয়ার্ডে ২৫-৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু এ শিল্পের ৫০ বছরের ইতিহাসে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য তেমন কিছুই করা হয়নি।

কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) শ্রম পরিদর্শক শুভঙ্কর দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, শিপইয়ার্ড পরিদর্শনে গেলে শ্রমিকদের সেফটি নিয়ে নানা অভিযোগ পাই। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই ইয়ার্ডের মালিকদের তদারকি করতে হবে।

সেফটি কমিটির ব্যাপারে তিনি বলেন, বেশির ভাগ শিপইয়ার্ডে নিয়মানুযায়ী সেফটি কমিটি থাকলেও সেটার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কার্যকর কমিটি থাকলে দুর্ঘটনাসহ শ্রমিকদের নানা সমস্যার সমাধান সম্ভব হতো।

শ্রমিক আইনের ৭৮(ক) ধারায় শিপইয়ার্ডে ব্যক্তিগত সুরক্ষা মালিকপক্ষকে নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। পাশাপাশি প্রতিটি শিপইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন ও পরিচালনা করারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। শ্রমিক ও মালিক প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এ কমিটি প্রতি মাসে অন্তত একবার আলোচনা সভা করবে।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক ক্রাইসিস কমিটির গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সভায় মার্চের মধ্যে ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজও নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সহকারী সচিব নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইয়ার্ডে বিদ্যমান সেফটি কমিটির কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনার তাগিদ দেয়া হচ্ছে। আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে কমিটির কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। শ্রমিকদের সুরক্ষায় শ্রম এবং কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে তারা কিছু পরিকল্পনাও জমা দিয়েছেন বলে জানান নাজমুল ইসলাম।

তবে শ্রমিকরা বলছেন, নামমাত্র সেফটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাসিক আলোচনা সভা হয় না। নিরাপত্তা সরঞ্জাম আধুনিক না হওয়ায় শ্রমিকরা তা পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাছাড়া অনেক ইয়ার্ড মালিক ঠিকাদার দিয়ে কাজ করান। ঠিকাদাররা শ্রমিকদের সুরক্ষা বিবেচনায় রাখে না।

শিপ ব্রেকিং ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি তপন দত্ত বণিক বার্তাকে বলেন, কমিটি আছে কাগজে-কলমে। কমিটি কার্যকর থাকলে কেন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাস্তবায়ন হয়নি, নিয়োগপত্র কেন দেয়া হচ্ছে না কিংবা কর্মপরিবেশ এখনো কেন গড়ে উঠছে না?

শিপইয়ার্ডে শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা নিশ্চিত, মৃত্যু-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ইয়ার্ডের কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোস্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, দুয়েকটি ছাড়া কোনো ইয়ার্ডে সেফটি কমিটি চালু আছে বলে আমার জানা নেই। মালিকপক্ষ ইয়ার্ডে লোক দেখানো সেফটি কমিটি চালু রেখেছে।