টকিজ

স্বাধীন ভারতে প্রথম নিষিদ্ধ হয় মৃণালের ‘নীল আকাশের নীচে’

ফিচার ডেস্ক | ২১:০৮:০০ মিনিট, মে ১৫, ২০১৯

মৃণাল সেনের ধ্রুপদি ছবি নীল আকাশের নীচে, এ ছবি দর্শক-স্মরণীয় আছে কাহিনীর গভীরতার কারণে। কিন্তু স্বাধীন ভারতে এটাই নিষিদ্ধ হওয়া প্রথম ছবি। এক গৃহবধূর রাস্তায় ফেরি করে ফেরা এক লোকের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের সাদাসিধে কাহিনীর বয়ান এটি, কিন্তু তা-ই নিষিদ্ধ করা হয় উচ্চকিত রাজনৈতিক বক্তব্য—কমিউনিস্ট উপাদান—রয়েছে অভিযোগে তোলে।

সাদা-কালো এ ছবির পটভূমি ১৯৩০ সালের ভারতবর্ষ। এক সোজা-সরল চীনা ফেরিওয়ালা, নাম ওয়াং লু। স্বদেশী অন্য চীনা বন্ধুদের সঙ্গে ওপিয়াম ব্যবসায় না জড়িয়ে কলকাতার রাস্তায় চীনা সিল্ক বিক্রি করে বেড়ায়। আর বাঙালি গৃহবধূ বাসন্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। চীনা ফেরিওয়ালা লুর সঙ্গে এক পর্যায়ে ভাইবোনের মতো সম্পর্কে বাধা পড়ে। বাসন্তীর স্বামী একজন আইনজীবী। স্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খুব একটা ওয়াকিবহাল নয়। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে বাসন্তী গ্রেফতার হলে ওয়াং লুও জড়িয়ে যায় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে। পরে সে নিজ দেশে ফিরে গিয়েও ১৯৩১ সালের চীনে জাপানি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু করে।

নীল আকাশের নীচে ভারতের খেটে খাওয়া অনগ্রসর মানুষের গল্প, যারা সমস্যার পাহাড় নিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস করছে, নীল আকাশ হলো তাদের ছাদ।

মুক্তির সময় অভিযোগ ওঠে, এ ছবিতে কমিউনিস্ট বার্তা রয়েছে। ফলে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার নেহরু সরকারের মধ্যে মৃণালের এ ছবি নিয়ে অস্বস্তি দেখা দেয়। নীল আকাশের নীচে একই সঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ভারতীয়দের সামাজিক, অর্থনৈতিক গোলকধাঁধায় দুর্বিষহ দিনাতিপাতের কাহিনীও।

সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক দুরবস্থা আর একাকিত্ব থ্রি পয়েন্ট আলোক প্রক্ষেপণের কায়দায় দগদগে ঘায়ের মতো মূর্ত এ ছবিতে।

মৃণাল সেন বোঝাতে চেয়েছেন বিশাল এক আকাশের নিচে বসবাস করলেও, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ প্রকট আকারে বিরাজ করছে জীবনের প্রতিটি স্তরে। কালী ব্যানার্জি দরিদ্র ফেরিওয়ালা ওয়াং লুর ভূমিকায় অভিনয় করেন।

মৃণাল সেনের জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুরের এক মফস্বল শহরে। ১৯৪০ সালে পরিবারে সঙ্গে মৃণাল কলকাতায় পাড়ি জমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মতো ঘটনাবলির সাক্ষীই শুধু নন তিনি, রবীন্দ্রনাথের শেষকৃত্যেরও সাক্ষী তিনি। আর ইতিহাসের এ ঘটনাবলি তার জীবনকেও দারুণ প্রভাবিত করে। তার চলচ্চিত্রে প্রবেশ ঘটে রাত-ভোর  ছবি দিয়ে, ১৯৫৫ সালে। পূর্ণদৈর্ঘ্য-প্রামাণ্য চিত্র সব মিলিয়ে ৩১টির মতো ছবি বানিয়েছেন তিনি। দেশে ও বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার জয় করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দাদাসাহেব ফালকে এবং পদ্মভূষণ। মৃণাল সেন সংসদ সদস্যও মনোনীত হয়েছিলেন।

 

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া