শেষ পাতা

নকশা না মেনে নির্মাণ : ভাঙতে হচ্ছে ডমিনো ফ্লেমিনকো কনভেনশন সেন্টার

নিহাল হাসনাইন | ০১:০৬:০০ মিনিট, মে ১৪, ২০১৯

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ, তবে অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে। নির্মাণ শেষে কনভেনশন সেন্টার হিসেবে ব্যবহার হলেও নেয়া হয়নি সে অনুমতিও। নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত হওয়ায় অগ্নিদুর্ঘটনাসহ নানা ঝুঁকি দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ বিবেচনায় ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে রাজধানীর ফার্মগেটে ডমিনো ফ্লেমিনকো কনভেনশন সেন্টার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভবনটি ভাঙার দায়িত্ব পালন করবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশেষ সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, কনভেনশন সেন্টারটি নির্মাণে রাজউক অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুসরণ করা হয়নি। এ স্থাপনা ভেঙে ফেলতে হবে। ভাঙার দায়িত্ব পালন করবে রাজউক।

জানা গেছে, চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি কনভেনশন সেন্টারটি পরিদর্শনে যায় রাজউকের একটি প্রতিনিধি দল। পরিদর্শন চালিয়ে ভবনটি নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণের প্রমাণ পান প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। পরে ভবনটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা দিয়ে এটি সিলগালা করে দেয় রাজউক।

রাজউক সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে ওই জমির মালিক পাঁচতলা একটি বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য নকশা পাস করিয়েছিলেন। সে সময় নকশা অনুযায়ী নিচে বেজমেন্ট রেখে ভবনের নির্মাণকাজও শুরু হয়। কিন্তু এরপর জমির মালিক মারা যাওয়ায় ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। তারপর ২০১১ সালে জমিসহ পুরো প্রকল্পটি কিনে নিয়ে আবারো নির্মাণকাজ শুরু করে ডমিনো। এক্ষেত্রে মূল নকশার বেজমেন্ট না রেখেই ভবনটি নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া পাঁচতলার অনুমোদন নিয়ে ভবনটি গড়ে তোলা হয়েছে সাততলা পর্যন্ত।

রাজধানীর ফার্মগেট কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের উল্টোদিকেই ডমিনো ফ্লেমিনকো কনভেনশন সেন্টার। ভিআইপি রোডঘেঁষে গড়ে ওঠা কনভেনশন সেন্টারটির অবস্থান ও স্থাপত্যশৈলীর কারণে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একসময় রোজই সেখানে দু-চারটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো।

জানুয়ারির আগ পর্যন্ত ভবনটিতে কর্মরত ছিলেন ডমিনোর নিজস্ব ১৪ জন কর্মী। বর্তমানে সেখানে রয়েছেন মাত্র দুজন। এরা ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করছেন। এদের একজন সিকিউরিটি কমান্ডার মো. শাকিল জানান, চালু থাকা অবস্থায় কনভেনশন সেন্টারটির প্রতি মাসে আয় ছিল ১০-১২ লাখ টাকা। সে সময় এখানে অনেকেরই কর্মসংস্থান হয়েছিল।

ভবনটির নিচে কোনো বেজমেন্ট রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, নিচে কোনো বেজমেন্ট করা হয়নি। অতিথিদের গাড়ি রাখার জন্য সামনে জায়গা রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ভবনটি পুরোপুরিই নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ভবনের অনুমতি নিয়ে এখানে কনভেনশন সেন্টার গড়ে তোলার বিষয়টি পুরোপুরি আইনের লঙ্ঘন। কারণ একটি কনভেনশন সেন্টারে প্রতিদিন অনেক মানুষের আনাগোনা হয়। অনেক গাড়ি আসে। এজন্য সেখানে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা থাকার একটি বিষয় রয়েছে। কিন্তু তারা কোনো ধরনের অনুমতি না নিয়েই বাণিজ্যিক ভবনকে কনভেনশন সেন্টারে রূপান্তর করেছে।

তিনি আরো বলেন, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানুয়ারিতে ভবনটি ভাঙার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে সময় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভবনটি ভাঙার জন্য সময় চেয়ে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এজন্য তখন কনভেনশন সেন্টারটিকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে সিলগালা করে দেয়া হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনটির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাজধানীতে ডমিনো ফ্লেমিনকো কনভেনশন সেন্টারের মতো প্রায় দেড় লাখ ভবন নকশাবহির্ভূতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। রাজউকের সর্বশেষ এক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রাজউকের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে মোট ভবন রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ১০৬টি। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নির্মিত ভবনের সংখ্যা ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬। এসব ভবনের মধ্যে ১ লাখ ৩১ হাজার ৫৮৩টিতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনের কথা জানতে পেরেছে রাজউক।

রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন ও ভবন নির্মাণ হয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব রাজউকের।

যদিও সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, দুই কোটিরও বেশি মানুষের আবাসস্থল ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর পর্যন্ত রাজউকের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত। বিদ্যমান জনবল দিয়ে বিশাল আয়তনে নির্মিত ও নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কর্মযজ্ঞ পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নকশা মেনে ভবন নির্মিত হচ্ছে কিনা বা নির্মিত ভবনে নকশা মানা হয়েছে কিনা তা নজরদারি করা সম্ভব হচ্ছে না।

নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা ভবনগুলোর অগুন বা যেকোনো দুর্ঘটনা মোকাবেলায় বেগ পেতে হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রাজধানীর বেশির ভাগ ভবনই মূল নকশা অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। আবার কিছু বাণিজ্যিক ভবন নকশার সময় বিপণিবিতান করা হবে বলে অনুমতি নিলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে রেস্টুরেন্ট করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই বিপণিবিতানের চেয়ে রেস্টুরেন্টে অতিমাত্রায় বিস্ফোরণের ঝুঁকি থেকে যায়। আগুন লাগলে বা যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওইসব ভবন থেকে বসবাসকারীদের দ্রুত উদ্ধার করতে বেগ পেতে হয়।