টকিজ

টাকার বিনিময়ে স্মারক ডাকটিকিট!

রুবেল পারভেজ | ২১:৫১:০০ মিনিট, মে ১৪, ২০১৯

স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যে কয়েকজন বরেণ্য সাহিত্যিকের নাম অগ্রগণ্য, তাদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব শওকত ওসমান। দেশের ক্রান্তিকালে শওকত ওসমানের বলিষ্ঠ লেখনী সবাইকে দিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রণা। শওকত ওসমানই একমাত্র সাহিত্যিক, যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার প্রতিবাদে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান লেখক ও প্রবল রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী এ শিল্পীকে নিয়েই দুঃখজনক এক ঘটনার জন্ম দিল বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

কিংবদন্তি এ কথাশিল্পীকে নিয়ে সরকারিভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়ার কথা থাকলেও এত দিনে তার কিছুই হয়নি। উল্টো তাকে নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করতে ‘কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদ’কে দেড় লাখ টাকা দিতে হয়েছে ডাক বিভাগ বরাবর। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি শিল্পীর ১০২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের এ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে ডাক বিভাগ।

এখানেই শেষ নয়, এর আগে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের জন্য শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের দেয়া স্মারক ডাকটিকিটবিষয়ক প্রস্তাব পাস নিয়েও ডাক বিভাগ দীর্ঘ প্রায় আট মাস গড়িমসি করেছে বলে অভিযোগ শিল্পীর পরিবারের। তারা দাবি করেন, এমন পরিস্থিতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ আকবর হুসাইনের হস্তক্ষেপে স্মারক ডাকটিকিটটি প্রকাশে গতি পায়। এ বিষয়ে ডাক বিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডলের সঙ্গে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এবং বলেন, ‘আমি অবসরে চলে যাওয়ায় এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।’ তবে ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার ভাষ্য, যথাযথ নিয়ম মেনেই তারা যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করেছেন।

শওকত ওসমানের মতো ব্যক্তিত্বের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা নিয়ে ডাক বিভাগের অর্থ গ্রহণকে অবিবেচনাপ্রসূত ও অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছেন চিত্রশিল্পী হাশেম খান এবং সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিকের মতো ব্যক্তিত্বরা।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাশেম খান বলেন, ‘শওকত ওসমানের মতো ব্যক্তিত্বের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি মোটেও কাম্য নয়। বরং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ডাক বিভাগকে নিজের দায়িত্বেই এটি করার কথা এবং এ থেকে প্রাপ্য রয়্যালটি তার পরিবারকে দেয়া উচিত ছিল।’ এর কারণ জানাতে গিয়ে জনাব হাশেম খানের ব্যাখ্যা, ‘শওকত ওসমানের ছবি ব্যবহার করে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করলে ডাক বিভাগেরই সুনাম বাড়ে এবং তারা ধন্য হয়। এক্ষেত্রে ডাক বিভাগ কর্তৃক অর্থ গ্রহণের বিষয়টির জোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এটি করা একদমই ঠিক হয়নি।’

বাংলাদেশ পোস্ট অফিস আইন (২০১৮-এর খসড়া) অনুযায়ী, বিশেষ সময় বা বিশেষ উদ্দেশ্যে বিশেষ বিষয় বা বিশেষ ঘটনাকে প্রতিফলিত করার উদ্দেশ্যে বিশেষ দিনে যে ডাকটিকিট প্রকাশ করে, তাকে বলা হয় স্মারক ডাকটিকিট। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে স্ব স্ব ক্ষেত্রে যেসব ব্যক্তিত্বের অবদান রয়েছে এবং পুরো জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তাদের সম্মান জানিয়েও এ আইনের অধীনে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে সরকার।

এক্ষেত্রে সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ডাক বিভাগের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদা, বেগম সুফিয়া কামালসহ আরো অনেক দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সরকারি খরচে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। সেক্ষেত্রে শওকত ওসমানের বেলায় এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটল কেন? এমন প্রশ্ন নিয়ে যোগাযোগ করা হয় ডাক অধিদপ্তরের শাখা কর্মকর্তা (ফিলাটেলি) মোহাম্মদ ওয়াহিদ উজ-জামানের সঙ্গে। যিনি শওকত ওসমানের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘দুটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ হয়। প্রথমত, ডাক বিভাগ নিজে উদ্যোগী হয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এজন্য আমাদের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা আছে এবং সেখানে অ্যাডভাইজরি কমিটি সুপারিশ করে কাদের নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হবে। এ নিয়মে যাবতীয় খরচ সরকার বহন করে। দ্বিতীয়ত, ডাক বিভাগের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনার আওতায় অন্তর্ভুক্ত নয় অথচ কোনো ব্যক্তির পরিবার বা কোনো সংগঠন যদি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের জন্য উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আবেদন করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কমিটি তা খতিয়ে দেখে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে গৃহীত হয়ে আসার পর স্মারক ডাকটিকিট তৈরির খরচ বাবদ আবেদনকারীর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদ আবেদন করায় স্মারক ডাকটিকিট তৈরির যাবতীয় খরচ তাদেরই বহন করতে হয়েছে। আমাদের নীতিমালায় বিষয়টি উল্লেখ আছে (২ লাখ টাকা দেয়ার কথা থাকলেও শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেয়া হয়েছে)।’ পরের প্রশ্নে এ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, শওকত ওসমানের মৃত্যুর পর দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ডাক বিভাগের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনায় তাকে নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশের বিষয়টি কেন আনা হলো না? উত্তরে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিত্বদের নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশে দায়িত্বপ্রাপ্তরা খুবই সতর্ক থাকেন। কিন্তু শওকত ওসমানের বেলায় হয়তো তারা ওভাবে কখনো ভাবেননি। এ কারণেই এতদিন কিছু করা হয়নি।’

এদিকে শওকত ওসমানের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ নিয়ে ডাক বিভাগের এমন নিয়ম মানতে নারাজ লেখক ও প্রাবন্ধিক আহমদ রফিক। আহমদ রফিক একই সঙ্গে কথাশিল্পী শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতিও। তিনি বলেন, ‘যে যুক্তিই দেয়া হোক না কেন, শওকত ওসমানের মতো ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এমনটা করা ঠিক হয়নি। কারণ তিনি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পক্ষে তার যথেষ্ট অবদান আছে। তার মতো ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে টাকা নেয়ার মানে তাকে ছোট করাই হলো।’ আহমদ রফিক আরো যোগ করেন, ‘সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। যখন ডাক বিভাগ দেখল তাদের হাতে শওকত ওসমানকে নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশের আবেদন এসেছে, তখন ডাক বিভাগেরই দায়িত্বটি যথাযথভাবে পালন করা উচিত ছিল।’

দেশের কীর্তিমান ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের এমন নিয়মের প্রসঙ্গটি নিয়ে এ পর্যায়ে কথা হয় ডাক বিভাগের স্টাম্প অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য শেখ শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আসলে ডাক বিভাগ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। একজন স্টাম্প সংগ্রাহক হিসেবে বলতে পারি, তারা চাইলেই যেকোনোভাবে শওকত ওসমানকে তার প্রাপ্যটুকু দিতে পারত।’

সব শেষে পুরো বিষয়টি নিয়ে কথা হয় শওকত ওসমানের ছেলে জাঁ-নেসার ওসমানের সঙ্গে। এ সময় আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা না-হয় আমাদের বাবার হয়ে আবেদন করেছি এবং দেড় লাখ টাকা দিতে পেরেছি। কিন্তু অন্য কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির যদি এ দুটোর কোনোটিই না থাকে, তাহলে কি তাকে নিয়ে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করা হবে না? সেক্ষেত্রে কি ডাক বিভাগের দয়ার দিকে তাকিয়েই অনন্তকাল ধরে অপেক্ষায় থাকতে হবে?’