আন্তর্জাতিক খবর

ভারতের নির্বাচন কমিশন কি আসলেই ‘দন্তহীন’?

বণিক বার্তা অনলাইন | ১৫:২৮:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলছে। মোট ৯০ কোটি ভোটার এবারের নির্বাচনে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। ভোট গ্রহণের জন্য ১০ লাখেরও বেশি ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশাল এ ভোটযজ্ঞ সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্নের দায়িত্ব নিয়ম অনুযায়ী দেশটির নির্বাচন কমিশনেরই (ইসি)। কিন্তু সমালোচকরা নির্বাচনকে ঘিরে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলছেন। তারা বলছেন ইসি ‘দন্তবিহীন বাঘ’ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ বিষয়টিই তুলে ধরেছেন সংবাদমাধ্যমটির হিন্দি সংস্করণের প্রতিনিধি ভিনেদ খের।

গত ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ লোকসভা নির্বাচন চলবে আগামী ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। ২৩ এপ্রিল ভোট গণনার পরই জানা যাবে প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদির নের্তৃত্বে থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আবার ক্ষমতা গঠন করছে কিনা।

এ নির্বাচনে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কংগ্রেস ও কিছু আঞ্চলিক দল মাঠে নেমেছে। ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য এবং নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তর প্রদেশ থেকে দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক দল বিজেপির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে জোটও বেঁধেছে। এর মধ্যে যেকোনো দল অথবা জোটকে ৫৪৩ আসনের লোকসভা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কমপক্ষে ২৭২টি আসন লাভ করতে হবে। নির্বাচনের সব প্রার্থীর জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে বিভিন্ন নীতিমালা মেনে চলতে হবে। আর প্রার্থীরা যে নিয়ম-নীতিমালা মেনে চলছেন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসির।

সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্নে প্রার্থীদের জন্য কিছু ‘সাধারণ আচরণবিধি’ গ্রহণ করেছে ইসি। ক্ষমতাসীন দলের জন্যও এসব নীতিমালা প্রযোজ্য। আচরণবিধির মধ্যে নির্বাচনি প্রচারনায় সরকারি পরিবহন অথবা কোনো ধরনের সম্পদের ব্যবহার করা যাবে না এবং সরকারি তহবিলের অর্থ খরচ করে কোনো বিজ্ঞাপনও প্রচার করা যাবে না। শুধু তাই নয়, কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা অনুমোদনযোগ্য সে বিষয়েও কঠোর নীতিমালা বেধে দেয়া হয়েছে।

তবে এ চলতি নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে প্রার্থীরা এসব নীতিমালার খুব একটা তোয়াক্কা করছেন না। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপির মধ্যেই নিয়ম-ভাঙ্গার প্রবণতা বেশি। দলটির ‘অভিনব’ প্রচারণা কৌশল নিয়ে চরম সমালোচনা করছেন বিরোধীপক্ষ ও পর্যবেক্ষকরা। এরা সবাই নিয়মভাঙ্গার জন্য ইসির কাছে বিজেপের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে সরকারের বিরুদ্ধে দুটি রায় দিয়েছেন নির্বাচন কমিশন।

এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার দেয়া এক রায়ে ইসি জানিয়েছে, তাদের অনুমোতি ছাড়া নামো টিভি সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভাষণ সম্প্রচারের জন্য এই চ্যানেলটি নিবেদিত। এই সিদ্ধান্ত জানানোর কয়েকদিন আগে নরেন্দ্র মোদির আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র সম্প্রচারেও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইসি।

এ দুটি রায়ের মাধ্যমে নিজেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমালোচনার উত্তাপ কিছুটা প্রশমন করতে পেরেছে ইসি। কিন্তু আরো অনেক অনিয়ম রয়েছে যা বিরোধীদল ও স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে।

মানুষের ভিড়ে ঠাসা ট্রেনগুলোয় যাত্রীদের কাগজের তৈরি কাপে চা পান করানো হচ্ছে, আর এই কাপেই লেখা রয়েছে বিজেপির নির্বাচনী স্লোগান। এয়ারইন্ডিয়ার যাত্রীদের দেয়া বোর্ডিং পাসে মোদির ছবি সম্বলিত ২০১৮ সালের এক ব্যবসা বিষয়ক সম্মেলনেরও বিজ্ঞাপন রয়েছে। এ দুটি বিষয় নিয়েই তীব্র সমালোচনা চলছে। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণামূলক কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেখা গিয়েছে ভারত শাসিত কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলায় নিহত সেনাসদস্যদের ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া পাকিস্তানে আটক ও পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়া ভারতীয় পাইলট অভিনন্দনের ছবিও রাজনৈতিক পোস্টারে ব্যবহার করছে বিজেপি। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তো সেনাবাহিনীকে ‘মোদির আর্মি’ হিসেবেই অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

এ রকম অনেক ঘটনা নিয়েই ইসি নোটিশ দিয়েছে, সতর্ক করে চিঠিও পাঠিয়েছে। তারপরও প্রশ্ন উঠেছে আসলেই কি নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলতে পারছে ইসি? সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এন গোপালস্বামী বিশ্বাস করেন, এর পুরোটাই নির্ভর করে আপনার কতোটা লজ্জাবোধ রয়েছে তার ওপর।

অন্যান্য সাবেক কমিশনাররাও জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্ব পেলেই ইসির অভিযোগ কার্যকর হয়। ফলাফল হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ভোট হারায়। তবে বাস্তবে এমন ঘটে কিনা সে বিষয়েও কোনো প্রমাণ বা গবেষণা পাওয়া যায়নি।

এমন ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছেন সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটিজের (সিএসডিএস) প্রধান সঞ্জয় কুমার।

বিজেপির এমপি স্বাক্ষী মহারাজ বলেন, ইসি যে কাজই করে তা ভালো। এটি ভোটের ওপর প্রভাব ফেলে না।
তবে সাবেক সিইসি ভিএস সম্পদ বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের শক্তিশালী বার্তা দেয়ার ক্ষমতা রয়েছে ইসির। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠেয় সাধারন নির্বাচনকালীন সময়ে তিনি ইসির দায়িত্বে ছিলেন। সেসময় বিজেপি নেতা অমিত শাহ এবং সমাজবাদী পার্টির আজম খানকে উত্তর প্রদেশে শোভাযাত্রা ও রাজনৈতিক মিছিল বের করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিলো। তাদের বিরুদ্ধে বিভেদসৃষ্টিকারী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে ক্ষমা প্রার্থনার পর অমিত শাহর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। কিন্তু খানকে কোনো জনসমাবেশে বক্তৃতা দিতে দেয়া হয়নি।

এদিকে সাবেক সিইসি এন গোপাল স্বামী বলেন, নির্বাচনের সময় বহু মামলা হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো নির্বাচনের পর দৃশ্যপট থেকে নির্বাচন কমিশন সরে যায় এবং পুলিশকেই তখন এগুলোর দায় নিতে হয়।

এসব সমস্যা কেনো হচ্ছে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্ধারিত আচরণ বিধি কোনো আইন নয়। ফলে এখানে কোনো শাস্তিরও নিয়ম নেই। শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন সময় পর্যন্তই তা থেকে যায়।

সাবেক সিইএস টিএস কৃষ্ণমূর্তি বলেন, ইসিকে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয়। আমরা অনেকবার অনেক ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করেছি কিন্তু কোনো দলই এতে আগ্রহ দেখায়নি। তাই সামগ্রিকভাবে সমস্ত দোষ ইসির ঘাড়ে চাপানো যাবে না। নির্বাচন কমিশন বড়জোর কোনো প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা এবং জরিমানা আরোপ করতে পারে। তবে এসব শাস্তি রাজনৈতিক দলগুলো কোনো পাত্তা দেয় না।