খবর

দুই আসামির স্বীকারোক্তি : অধ্যক্ষের পরামর্শ ও নির্দেশেই নুসরাতের গায়ে আগুন

বণিক বার্তা অনলাইন | ১১:৪২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৫, ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসা ছাত্রী ও আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ ও পরামর্শ কারাগারে থাকা মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার কাছ থেকে পেয়েছিলেন বলে ‘স্বীকার করে’ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নূর উদ্দিন ও শাহদাত হোসেন শামীম।

গতকাল রোববার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জাকির হোসাইনের আদালতে জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। সেদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত তাদের দুজনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত।

জবানবন্দিতে নুর বলেছেন, এপ্রিলের ১ ও ৩ তারিখ কারাগারে আটক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার সঙ্গে দেখা করেন তিনি। সেখানেই নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। অধ্যক্ষের পরামর্শেই নুসরাতের গায়ে আগুন ধরানো হয়।

পরে রাত ১টার দিকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন) তাহেরুল হক চৌহান আসামিদের বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

তিনি বলেন, আসামিরা অপরাধ স্বীকার করেছেন। তারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে দায় স্বীকার করেছেন। তারা জেলখানা থেকে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার কাছ থেকে হুকুম পেয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

তাহেরুল হক চৌহান জানান, এ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ১৩ জনের নাম এসেছে। এছাড়া বিক্ষিপ্তভাবে কিছু নাম এসেছে। পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত খতিয়ে দেখে সে বিষয়ে নিশ্চিত হবে।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত যে চারজন তাদের সবাইকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। দুজন গ্রেফতার আছে, বাকি দুইজনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। যেকোনো সময় তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন চৌহান।

তাহেরুল হক চৌহান বলেন, আদালত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সিআরপিসির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আসামিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজ্ঞ আদালতের কাছে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। আসামিরা পুরো বিষয় খোলাসা করেছেন।

হত্যাকাণ্ডটি কারা ঘটিয়েছে, কীভাবে ঘটিয়েছে, কী প্রক্রিয়ায় ঘটিয়েছে বিস্তারিত বলেছেন। কিন্তু তা মামলার তদন্তের স্বার্থে পেশ করা যাবে না।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন ওই ছাত্রীর মা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে অধ্যক্ষ তার অফিসের পিয়ন নূরুল আমিনের মাধ্যমে ছাত্রীকে ডেকে নেন। পরীক্ষার আধাঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্র দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই ছাত্রীর শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। পরে পরিবারের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হন অধ্যক্ষ।

গত ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। সেখানে মাদ্রাসার এক ছাত্রী তাকে জানান, তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কে বা কারা মারধর করেছে। এ কথা শুনে রাফি ওই ভবনের চারতলায় ছুটে যান। সেখানে মুখোশ পরা চার-পাঁচজন ছাত্রী তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তারা গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।

পরে আগুনে ঝলসে যাওয়া নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় না ফেরার দেশে চলে যান ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টার পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। টানা ১০৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে হার মানেন এ ছাত্রী।

পরদিন বৃহস্পতিবার স্থানীয় ছাবের সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে সন্ধ্যায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় নুসরাতের মরদেহ।