শেষ পাতা

মাদ্রাসা অধ্যক্ষের নির্দেশে হত্যার পরিকল্পনা: পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। আর নুসরাতকে পুড়িয়ে এ নির্দেশ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেন শাহাদাত হোসেন শামীম। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে আটজনকে আটক করেছে পুলিশ। মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে পিবিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশেই এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নুসরাতকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে করা মামলায় ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর তার মুক্তির দাবিতে ‘সিরাজ-উদ-দৌলা সাহেবের মুক্তি পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম নামে দুজনকে ২০ সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। তাদের নেতৃত্বে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে গত ২৮ ও ৩০ মার্চ উপজেলা সদরে দুই দফা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। ৪ এপ্রিল সিরাজ-উদ-দৌলার মুক্তির দাবিতে আরেকবার মানববন্ধন করেন আসামি নূর উদ্দিনসহ কয়েকজন। পরে তারা সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে দেখা করেন।

পিবিআই বলছে, নূর উদ্দিনসহ কয়েকজন সিরাজ-উদ-দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে নির্দেশ নিয়ে আসেন। ৫ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে মাদ্রাসার নিকটবর্তী হোস্টেলের পশ্চিম অংশে বনে এ ঘটনার মূল পরিকল্পনা করা হয়। এক্ষেত্রে অভিযুক্ত শাহাদাতের আগে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টিও নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এ ঘটনায় মাদ্রাসার দুই ছাত্রী ও তিন ছাত্র জড়িত। তাদের একজন মাদ্রাসাসংলগ্ন সাইক্লোন শেল্টারে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন শাহাদাতকে দেয়। পরে দুই ছাত্র ও দুই ছাত্রী বোরকা পরে সাইক্লোন শেল্টারের টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। তারাই নুসরাতের শরীরে আগুন লাগায়।

বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মাদ্রাসাটি পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষা শুরুর আগে সকাল ৭টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ক্লাস হয়। ৬ এপ্রিলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক ছাত্রী পলিথিনে করে কেরোসিন ও বোরকা এনে শামীমের কাছে হস্তান্তর করে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাস ছুটি হওয়ার আগেই তাদের তিনজন টয়লেটে লুকিয়ে ছিল। পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে কেন্দ্রে গিয়ে নুসরাতকে এক ছাত্রী বলে, তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদে মারধর করা হচ্ছে। এ কথা বলে ওই ছাত্রী নুসরাতকে ছাদে নিয়ে যায়। পরে সেখানে একপর্যায়ে বোরকা পরা চারজন মিলে ওড়না দিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে ফেলে। আর তখনই কেরোসিন ঢেলে তার শরীরে আগুন দিয়ে সবাই নিচে নেমে আসে।

পিবিআই প্রধান বলেন, ঘটনার সময় নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে পাঁচজন বাইরে পাহারায় ছিল। আগুন দিয়ে বোরকা পরা চারজন নিচে নেমে ভিড়ের সঙ্গে মিশে যায়।

মারাত্মক দগ্ধ অবস্থায় ওইদিন রাতেই নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রোববার চিকিৎসকদের কাছে দেয়া শেষ জবানবন্দিতে নুসরাত বলেছিলেন, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই চারজনের একজনের নাম শম্পা। এর পর বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ ঘটনায় জড়িত শম্পা নামে ওই ছাত্রীকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ডিআইজি বনজ কুমার বলেন, এর আগেও নুসরাতের চোখে চুন মারা হয়েছিল। সে ঘটনা তারা চাপা দিতে পেরেছিল, এমনকি ২৭ মার্চের ঘটনাও সামলে নিয়েছিল। ফলে তারা ভেবেছিল, নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার পর বিষয়টি সামলানো যাবে।