শেষ পাতা

সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই ব্যবস্থাপনা : স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং শ্রমিকরা

তাওছিয়া তাজমিম | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ইলেকট্রনিক বা ই-বর্জ্যের পরিমাণও। এসব ই-বর্জ্যের দূষণ থেকে প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে প্রয়োজন পড়ে রিসাইক্লিংয়ের বা তা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করে তোলার। দেশে এসব ই-বর্জ্যের রিসাইক্লিং হচ্ছে স্বল্পমাত্রায়। আবার যেটুকু হচ্ছে সেখানেও ব্যবহার হচ্ছে না কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ। ফলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ছাড়াই কাজ করার কারণে ক্যান্সার, যক্ষ্মাসহ কিডনি ও শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে পড়ছেন দেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ই-বর্জ্য শ্রমিকরা।

বুয়েটের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (সিইআরএম) পরিচালিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব জেনারেশন অব ই-ওয়েস্ট, ইটস ইমপ্যাক্টস অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্স রিকভারি পটেনশিয়াল ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণায় দেশে ই-বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ও এসব বর্জ্যের ঝুঁকি সম্পর্কে রিসাইক্লিং কর্মীদের সচেতনতার মাত্রা ইত্যাদি যাচাই করে দেখা হয়। এতে অর্থায়ন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড, নিমতলী, মতিঝিল, চানখাঁরপুলসহ বেশ কয়েকটি এলাকার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ৫৩টি ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং কারখানার কর্মীদের ওপর এ গবেষণা চালানো হয়।

দেশে বহুল প্রচলিত ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যে রয়েছে টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার, ফ্রিজ, তথ্যপ্রযুক্তি-সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি, সেলফোন, কম্পিউটার, সিএফএল বাল্ব ইত্যাদি। আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর এগুলো পরিণত হয় ই-বর্জ্যে। এসব ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

গবেষণায় উঠে আসে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের কাজে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার না করার কারণে এরা সরাসরি ই-বর্জ্যজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ক্রোমিয়াম ও সিসার মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু গ্রহণের কারণে কার্সিনোজেনিক (ক্যান্সার সৃষ্টিকারী) ও নন-কার্সিনোজেনিক উপাদানজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন সব বয়সী শ্রমিকরা। যক্ষ্মা, রক্তের রোগ, কিডনি, শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা, ফুসফুসের ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতিসহ বিভিন্ন ধরনের রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন এসব শ্রমিক।

এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) তথ্যানুযায়ী, ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শিশু। ২০১৪ সালে পরিচালিত আরেক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে সিইআরএমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, এসব শিশু শ্রমিকের প্রায় ৮৩ শতাংশই হয় দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে, নয়তো ই-বর্জ্যের বিষাক্ত উপাদানের সরাসরি প্রভাবজনিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এদের মধ্যে আবার প্রতি বছর মারা যাচ্ছে প্রায় ১৫ শতাংশ শিশু শ্রমিক।

এ বিষয়ে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ই-বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের ভারী ধাতু থাকে। ক্যান্সার উৎপাদনকারী যে কয়টি ফ্যাক্টর রয়েছে, ভারী ধাতু তার মধ্যে অন্যতম। এগুলো শরীরে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। শরীরের স্বাভাবিক যে জৈবিক প্রক্রিয়া, তাতেও পরিবর্তন আনে এগুলো। বিশেষ করে লিভার ও কিডনির কার্যক্রম ব্যাহত করে। একই সঙ্গে কারো শরীরে যদি অনেক বেশি পরিমাণে ভারী ধাতু থাকে, তাহলে তার কিডনি ফেইলিওর হতে পারে। সে কারণে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের কাজে যারা নিয়োজিত তাদের যথাযথ সুরক্ষা উপকরণ নিয়ে কাজ করা উচিত।

ই-বর্জ্যজনিত মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকলেও এ নিয়ে সচেতন নন অধিকাংশ শ্রমিক। গবেষণায় দেখা যায়, ই-বর্জ্যে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন মাত্র ৭ শতাংশ শ্রমিক। স্ক্যানার, প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিন থেকে ধুলা নির্গমনের বিষয়ে ধারণা রয়েছে ২৪ শতাংশ শ্রমিকের। ব্যাটারিতে অ্যাসিডের উপস্থিতি সম্পর্কে জানেন ৯ শতাংশ এবং মাত্র ৩ শতাংশ শ্রমিকের রেফ্রিজারেটরের বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।

গবেষক দলের প্রধান সিইআরএমের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. রওশন মমতাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ই-বর্জ্যের ধারণাটি নতুন। ফলে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষ অবগত নয়। যারা এসব বর্জ্য নিয়ে কাজ করে, তাদের ঝুঁকিটা বেশি। এসব বর্জ্যে যে উপাদানগুলো রয়েছে, সেগুলো তাদের শরীরে প্রবেশ করে। তা থেকে অনেক ধরনের রোগ হওয়ার ঝুঁকি আছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় সব শ্রমিকই কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেন না। এসব বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে মালিক-শ্রমিক কেউই সচেতন নন। তবে ই-বর্জ্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন। সেখানকার শ্রমিকরা মাস্ক, হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেন।

গবেষণায় বলা হয়, রেফ্রিজারেটর ভাঙার সময় মাত্র ১ শতাংশ শ্রমিক মুখে মাস্ক ব্যবহার করেন। মাস্ক বা অন্য কোনো ধরনের সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার না করে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে কাজ করছেন শ্রমিকরা। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এসব গ্যাস শরীরে প্রবেশ করায় তারা বিভিন্ন ধরনের অসুখে ভোগেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়ে থাকে বলে জানান আজিজু রিসাইক্লিং অ্যান্ড ই-ওয়েস্ট কোম্পানি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, আমাদের কারখানায় আন্তর্জাতিক মান অনুসারে শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। সে কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অসুখে ভোগার হার কম। তবে অধিকাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে এসব মানা হয় না। কারখানার মালিকরা যাতে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাধ্য হন, সেজন্য আইন করে হলেও ব্যবস্থা নিতে হবে।