আন্তর্জাতিক ব্যবসা

ভারতীয় ধনীরা দানে অনাগ্রহী কেন!

বণিক বার্তা ডেস্ক | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

সম্প্রতি জনকল্যাণে বিপুল পরিমাণ সম্পদ দান করে ভারতের শীর্ষ দানবীরে পরিণত হয়েছেন আইটি ধনকুবের আজিম প্রেমজি, জায়গা করে নিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ দাতাদের কাতারে। কিন্তু প্রেমজির এ উদারতা নতুন একটি প্রশ্ন তৈরি করেছে, আর সেটি হলো ভারতে ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সে হিসাবে দাতব্যকাজে অর্থের পরিমাণ কেন বাড়ছে না?

সাম্প্রতিক সময়ে দান করা ৭৫০ কোটি ডলারসহ প্রেমজির মোট দানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন রুপি বা ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রেমজি কিন্তু বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনীর একজন নন।

দাশরা অ্যান্ড বাইনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপনি যদি অতি ধনী দাতাদের (যারা ১৪ লাখ ডলারের বেশি দান করেন) দান করা সব অর্থের হিসাব ধরেন, তবে দেখা যাবে সেখানে প্রেমজির অবদান ৮০ শতাংশ।

দাশরার সহপ্রতিষ্ঠাতা দেভাল সংঘভি বলেন, ভারতে জনকল্যাণে দান বাড়ছে ঠিকই; তবে এটি প্রয়োজনীয় দ্রুততার সঙ্গে বাড়ছে না। ২০১৪-১৮ সাল পর্যন্ত ভারতে মানবকল্যাণে ব্যক্তিগত দান বেড়েছে প্রতি বছর ১৫ শতাংশ হারে। গত পাঁচ বছরে যেখানে অতি ধনীর সংখ্যা বছরপ্রতি ১২ শতাংশ হারে বেড়েছে এবং প্রত্যাশা করা হচ্ছে ২০২২ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ও সম্পদ দ্বিগুণ হবে, সেখানে দান না বাড়ার বিষয়টি ‘বিশেষ সমস্যাজনক’ বলে দাশরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর দান করা নিট মূল্যের শতাংশের সঙ্গে তুলনা করলে, প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর ভারতের ধনীরা ৫০০ কোটি থেকে ৮০০ কোটি ডলার দান করতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হলো, কেন ভারতের ধনীরা দান করতে চান না। দিল্লির অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সোস্যাল ইম্প্যাক্ট অ্যান্ড ফিল্যানথ্রপির পরিচালক ইনগ্রিদ শ্রীনাথ বলেন, এর পেছনের অন্যতম প্রধান কারণ কর কর্মকর্তাদের নজরে পড়ার ভয়। ধনীরা কর কর্মকর্তাদের নজরে পড়তে চান না। আবার ধনীরা এও চান না যে, তাদের অর্থের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বাড়ুক।

ইনগ্রিদ শ্রীনাথ বিশ্বাস করেন, ভারতের সম্পদ শুধু এক প্রজন্ম পুরনো এবং যারা এর বর্তমান মালিক, তারা সম্পদ দান করাকে নিরাপদ মনে করেন না। তবে ইনগ্রিদ শ্রীনাথ সতর্ক করে বলেন, অসম্পূর্ণ হওয়ায় দানের তথ্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না, ভারতের মানবকল্যাণে দান দিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা কঠিন।

ভারতে কী পরিমাণ সম্পদ দান করা হয়, তা কেন্দ্রীয়ভাবে রেকর্ড রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। কর আইন কঠিন এবং দানের বিপরীতে খুব বেশি ছাড় নেই। তাই দাশরার মতো প্রতিবেদনকে নির্ভর করতে হয়েছে সরকার থেকে শুরু করে, খবর সংগ্রহকারী তৃতীয় পক্ষ ও ব্যক্তিগত ঘোষণাসহ বিভিন্ন উেসর ওপর। বহু লোক রয়েছে, যারা পরিচয় লুকিয়ে দান করে, যা জনকল্যাণে কী পরিমাণ দান করা হয়, তার হিসাবকে আরো জটিল করে তুলেছে। তবে দাশরা প্রতিবেদনের সহলেখক আনন্ত ভাগবতী বলেন, তথ্য সংগ্রহ যত দুর্বলই হোক, বড় দান হিসাবের বাইরে থাকতে পারে না।

ভাগবতী মনে করেন, ভারতের জনকল্যাণে প্রয়োজন এমন দাতাদের, যারা কোনো একটি সমস্যা সমাধানের প্রতিজ্ঞা করবেন। এটি কোনো যেনতেন সমস্যা হবে না। ভালো হবে যদি এটি হয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির লক্ষ্য পূরণসংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য দূরীকরণ থেকে শুরু করে ক্ষুধা নিবারণ ও সাধারণ মানুষের জ্বালানিপ্রাপ্তি।

দাশরার পরামর্শ ‘কৌশলী জনকল্যাণমূলক’ দান। এটি দান ও জনকল্যাণের মধ্য পার্থক্য তৈরি করে। দানকারী হয়তো একদিন গরিবদের পেটপুরে খাওয়াতে পারেন, কিন্তু ক্ষুধা হ্রাস বা দূরীকরণে কাজ করার চেয়ে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে দান করা অধিক জনকল্যাণমূলক বলে মনে করেন তারা। এ হিসাবে ভারতের অনেক ধনী দাতা থাকতে পারেন, তবে এখনো যথেষ্ট মানবকল্যাণী ধনীর অভাব রয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণভাবে ভাগবতী বলেন, মানবকল্যাণে এমন দাতাদের প্রয়োজন রয়েছে, যারা কীভাবে অর্থ ব্যয় করা হবে তা নির্দিষ্ট করে বলে দেবে না। শর্ত যুক্ত হলে তাকে আনন্ত ভাগবতী বলছেন ‘নিয়ন্ত্রিত দান’।

তবে শ্রীনাথ মনে করেন, এ প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। যেমন দান করতে গেলে সবার আগে মনে আসত শিক্ষা খাত। কিন্তু এখন শিক্ষা ছাড়িয়ে স্যানিটেশন, মানসিক স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান গবেষণায় দান করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্ম ও অভিপ্রায়ের মধ্যকার ফারাক। কিছু ধনী ব্যক্তি শুধু অন্যদের তুলনায় বেশি করে নিজ সম্পদ দান করতে চান। অনেক ধনী মনে করেন, নিজ সম্পদ দান করে তারা বিশ্বকে ঋণী করছেন। শ্রীনাথ বলেন, দানের উদারতা এমন একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, যার সঙ্গে বিশ্ব এবং এতে নিজের ভূমিকা কীভাবে দেখেন তা যুক্ত রয়েছে। অর্থের পরিমাণের সঙ্গে দান করতে চাওয়ার কোনো যোগসূত্র নেই।

সূত্র: বিবিসি