সম্পাদকীয়

শতবর্ষ আগেকার বাংলার আর্থিক চিত্র

ড. এম এ মোমেন | ০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

স্বদেশী আন্দোলনের একটি হাতিয়ার বিলেতি দ্রব্য বর্জন। আর বর্জনের বিকল্পই স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদন। ১৯০৫ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত চলমান ছিল স্বদেশী আন্দোলন।

বিলেতি পণ্য বর্জনের একটি চিত্র পাওয়া যায় রমেশচন্দ্র মজুমদারের বাংলার ইতিহাস চতুর্থ খণ্ডে: ‘মৈমনসিংহ জেলার মুচিরা একত্র হইয়া ঘোষণা করিল যে অতঃপর তাহারা বিলাতী জুতা মেরামত করিবে না। বরিশাল জেলার ঠাকুর-চাকরেরা সভা ডাকিয়া স্থির করিল যে যাহারা বিলাতী দ্রব্য কিনিবে তাহাদের বাড়িতে কাজ করিবে না। কালীঘাটের ধোপারা সভায় মিলিত হইয়া স্থির করিল যে তাহারা বিলাতী কাপড় কাচিবে না। ফরিদপুরের ধোপা ও মুচিরাও অনুরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। ছয় বছরের একটি বালিকা গুরুতর অসুখের সময়ও বিলাতী ওষুধ খাইতে অস্বীকার করিল। ব্রাহ্মণেরা স্থির করিলেন বিলাতী কাপড় ব্যবহার করিলে বিবাহে পৌরোহিত্য করিবেন না। পরীক্ষার উত্তর লিখিবার খাতা বিলাতী কাগজের বলিয়া ছাত্ররা পরীক্ষা দিতে অস্বীকার করিল। ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতেরা ব্যবস্থা দিলেন যে বিলাতী লবণ ও চিনি ব্যবহার করা হিন্দু ধর্মশাস্ত্রের বিরোধী।’

স্বদেশী আন্দোলনের জোশে স্বদেশী দ্রব্য উৎপাদন বেড়ে চলল। বামাবোধিনী পত্রিকা আশ্বিন ১৩১২ থেকে এক বছর সময়ের মধ্যে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত কলকারখানার একটি তালিকা দিয়েছে:

১. বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিল (শ্রীরামপুর) মূলধন ১২ লাখ টাকা; ২. বঙ্গীয় শিল্প বিদ্যালয়, মূলধন অজ্ঞাত; ৩. জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় মূলধন ১০ লাখ টাকা; ৪. শিল্প-বিজ্ঞান চর্চা সমিতির স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি লিমিটেড, ২ লাখ টাকা; ৫. ত্রিপুরা কোম্পানি লিমিটেড, ১৫ লাখ টাকা; ৬. ইন্ডিয়ান স্পিনিং অ্যান্ড উইভিং কোম্পানি লিমিটেড (ভারতীয় বস্ত্রবয়ন কোম্পানি) ১২ লাখ টাকা; ৭. দেশী বস্ত্র কোম্পানি লিমিটেড ৬ লাখ টাকা; ৮. ভারতহিতৈষী স্পিনিং অ্যান্ড উইভিং মিলস লিমিটেউ, ১ কোটি টাকা; ৯. কলকাতা উইভিং কোম্পানি লিমিটেউ, ৩০ হাজার টাকা; ১০. গোয়াবাগান স্পিনিং অ্যান্ড উইভিং কোম্পানি লিমিটেড, ৫০ হাজার টাকা; ১১. কলকাতা পটারি ওয়ার্কস (মৃৎপাত্র নির্মাণালয়) লিমিটেড ২ লাখ টাকা; ১২. ওরিয়েন্টাল সোপ ফ্যাক্টরি ৩০ হাজার টাকা; ১৩. লোটাস সোপ ফ্যাক্টরি মূলধন অজ্ঞাত; ১৪. ওরি ম্যাচ ফ্যাক্টরি ১ লাখ টাকা; ১৫. বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরি মূলধন অজ্ঞাত; ১৬. বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস, ২ লাখ টাকা; ১৭. বেঙ্গল স্টিম নেভিগেশন কোং লিমিটেড, মূলধন অজ্ঞাত; ১৮. জানকী নাথ রায় ব্রাদার্স পূর্ববঙ্গীয় স্টিমার সার্ভিস ৪ লাখ টাকা; ১৯. গ্লোব সিগারেট কোম্পানি মূলধন অজ্ঞাত; ২০. বেঙ্গল পেন্সিল ফ্যাক্টরি মূলধন অজ্ঞাত।

বাংলার বয়ন শিল্প

অসহযোগ আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ মহকুমার মাধবদী বাজার এবং সংলগ্ন অঞ্চল বাংলার ম্যানচেস্টার হিসেবে খ্যাত হয়ে ওঠে। বয়ন শিল্পের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। ‘দিন নাই রাত নাই, যখনই সে অঞ্চলে যাওয়া যায়, কেবলই তাঁতের ঠকাঠক শব্দ। মনে হয় ভারতের বয়ন শিল্প বুঝি আবার আপন গৌরবে সমুদ্ভাসিত হইয়া উঠিবে।’

১৯০৬ সালে কলকাতার শুল্ক বিভাগীয় কালেক্টর জানান, ম্যানচেস্টার থেকে কাপড় আমদানিতে অধোগতি সৃষ্টি হয়েছে।

মাধবদী বাজারের উত্তরে চার মাইল, পূর্বে দুই মাইল অর্থাৎ মেঘনা নদী পর্যন্ত, দক্ষিণে পাঁচ মাইল অর্থাৎ ভাওয়াল-বামনী নদী পর্যন্ত এবং পশ্চিমে চার মাইল অর্থাৎ লক্ষ্যা নদী পর্যন্ত তাঁত বসানো হয়েছে।

এক হাজার তাঁতে আনুমানিক পাঁচ হাজার পুরুষ ও নারী কাজ করছে। এ পাঁচ হাজারের মধ্যে অন্তত দুই হাজার স্ত্রীলোক, বিধবা অথবা ভিক্ষুক, এরা নলি জড়ানোর কাজ করে; এক হাজার অল্পবয়সী বালিকা, যারা খেলাধুলা করে দিন কাটাত, এখন সুতার টানা দেয়। বাকি দুই হাজার বখে যাওয়া সন্তান, যারা মা-বাবার ঘাড়ে বোঝা হিসেবে অবস্থান করত, এখন তারা কামাই করে।

প্রতি সোমবারে মাধবদীতে হাট বসে, প্রতি হাটে ৫০-৬০ হাজার টাকার তাঁতের কাপড় বিক্রি হয়। এ অঞ্চলে তৈরি ২৪ লাখ টাকার কাপড় মাধবদী বাজারে বিক্রি হয়।

দুটি বালক বুননের কাজে এবং একটি আট-নয় বছরের বালিকা তাঁতের কাজে থাকলে তাদের মাসিক ৫০-৬০ টাকা আয় হতে পারে; দুজন ভিক্ষুক বা বিধবা নলির কাজে মাসে ১১-১২ টাকা উপার্জন করতে পারে। এ পাঁচ হাজার লোক বছরে সোয়া ৭ টাকা রোজগার করে। মাধবদী অঞ্চলে ভিক্ষাবৃত্তি নেই বললেই চলে। তাঁতিরা অর্ধেক দেশী ও অর্ধেক বিলেতি সুতা ব্যবহার করে। মাধবদীতে পরিবহন সংকট রয়েছে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের জিনারদি স্টেশন মাধবদীর ছয় মাইল উত্তরে এবং নারায়ণগঞ্জ-ভৈরব স্টিমার লাইনের ভাঙ্গারচর স্টেশন তিন মাইল পূর্বে। আনা-নেয়ার খরচ বেশি পড়ে। কাছাকাছি কোনো সুতার কলও নেই।

এখানকার লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা, তোয়ালে, মশারির কাপড় ও শীতের মোটা চাদরের চাহিদা বেশি। এগুলোর কাটতি মূলত পূর্ব বাংলা ও আসামে।

১৯০৫-০৬ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময় এক ব্যক্তি মাধবদীতে হেটর্সলি তাঁত নিয়ে আসেন এবং নিজ খরচে অন্য একজনকে চালানো শেখান। ১৯২১-২২ সালে অন্য এক ব্যক্তি জাপানি নমুনার একটি তাঁত নিয়ে আসেন। এটির দেশীয় সংস্করণ চিত্তরঞ্জন তাঁত নামে পরিচিত, মাধবদীতে এ তাঁতের চাহিদাই প্রবল। তাঁতের মাকু ছাড়া তাঁতযন্ত্রের আর সবই স্থানীয়ভাবে তৈরি। সরকার অ্যান্ড সন্সের আধিকারিক মনে করেন, মাধবদীতে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ দিলেই এখানকার বস্ত্র শিল্প ধ্বংস হতে শুরু করবে।

(ঢাকার বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত সরকার অ্যান্ড সন্সের আধিকারিকের সাক্ষাত্কারের ওপর ভিত্তি করে রচিত)

ব্যবসার হাটে বাঙালির ভিড় নেই

ব্যবসার হাটে বাঙালির ভিড় নেই, আছে ইংরেজ ও অবাঙালির ভিড়। বাঙালির দেখা পাওয়া যায় না। ক্ষেত্রমোহন পুরকায়স্থ লিখেছেন, জীবনের অন্যসব ক্ষেত্রে অকৃতকার্য হয়ে বাঙালি ব্যবসায় নামে এবং মার খায়।

‘আধুনিক ব্যবসায় সফল হইবার জন্য যে ব্যবসায়ীর যথেষ্ট চরিত্র বল, সংগঠন দক্ষতা ও তীক্ষতা আবশ্যক, এই স্থূল কথাটাই বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত লোকের ভালো করিয়া জানা নাই।’ তিনি দেখিয়েছেন ১. যথেষ্ট কৃতী বাঙালি কোনো ব্যবসায়ী নেই, যাকে নিয়ে গর্ব করা যায়; ২. বাঙালির ব্যবসায়ের কোনো ঐতিহ্যও নেই; ৩. ব্যক্তিনিরপেক্ষ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের যোগ্যতা তাদের নেই। যেটুকু ব্যবসা আছে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মালিকসর্বস্ব; ৪. বাঙালির টেকনিক্যাল এডুকেশন না থাকায় ব্যবসায়ের বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে পারেনি; ৫. বাঙালি যে বয়সে ব্যবসায় নামে, কেনা ও বেচার সঠিক বাজার সম্পর্কে তার কোনো ধারণা জন্মে না।

ব্যবসার সফল হতে হলে বাঙালিকে কুড়ি বছর বয়সের মধ্যে আর সব চাকরির মায়া ছেড়ে সাধারণ ব্যবসায়ীর কাতারে নামতে হবে।

দারিদ্র্যের নির্বাসনের কথা এ কালে বেশি শোনা গেলেও ১৩৩৭ বঙ্গাব্দেই সুরেশচন্দ্র রায় এ বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, পাশ্চাত্য দেশ থেকে যে দারিদ্র্যকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তার মূলে কিন্তু কোনো জাদুবিদ্যা বা ম্যাজিক নেই। দেবতার বর পেয়ে দারিদ্র্য ঘুচিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকল্প নেই। বিপদাবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি সামাজিক বীমা চালু করার কথা বলেছেন।

পূর্ববঙ্গে পাটের বাহুল্য

১৯০৩-০৪ সালে বাংলা সরকারের কৃষি রিপোর্টে বলা হয়েছে, পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, ঢাকা, পাবনা, রাজশাহী ও বগুড়া জেলায় সমগ্র প্রদেশের দুই-তৃতীয়াংশ পাট উত্পন্ন হয়েছে আর উত্তরবঙ্গে অর্থাৎ রংপুর, দিনাজপুর ও জলপাইগুড়ি জেলায় এক-চতুর্থাংশ পাট উত্পন্ন হয়েছে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা ও রংপুর জেলায় অন্যান্য বছরের অর্ধেক পাট জন্মেছে, অতিবৃষ্টিতে ফসলের কিঞ্চিৎ ক্ষতিও হয়েছে। বিশেষত ফরিদপুর ও ঢাকা জেলায় উত্তম ফসল হয়েছে। অতিবৃষ্টি দিনাজপুর, বগুড়া ও যশোরে পাটের ক্ষতি করেছে। এ সময় বঙ্গদেশে ২৪ লাখ ৪৭ হাজার একর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে।

কয়েকটি জেলার হিসাব

ঢাকা ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯০০ একর, ময়মনসিংহ ৭ লাখ ৫০ হাজার একর, ফরিদপুর ১ লাখ ৪০ হাজার একর, চব্বিশ পরগনা ৮৮ হাজার ৩০০ একর,  যশোর ৬২ হাজার ১০০ একর, দিনাজপুর ১ লাখ ৩৪ হাজার একর, রংপুর ১ লাখ ১৭ হাজার একর, পাবনা ১ লাখ ৮২ হাজার একর, নোয়াখালী ৬৭ হাজার একর, পূর্ণিয়া ২ লাখ ৯১ হাজার একর।

বাংলা সরকারের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ শ্রাবণ ১৩১১ সংখ্যা কৃষকে প্রকাশিত হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯০৪-০৫ বর্ষে পাট চাষের আওতাধীন জমি বেড়ে ২৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪০০ একরে পৌঁছবে। কালেক্টররা আশা করেন, ৮১ শতাংশ ফসল ফলবে।

বাংলায় দেশলাই

১৩১৯ বাংলা সনের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা মহাজন বন্ধু রীতিমতো রায় দিয়েছে বাংলায় বড় কোনো দেশলাই ফ্যাক্টরি চালানো অসম্ভব।

বাংলায় দেশলাইয়ের কল না থাকলেও ভারতে বেশ কয়টি কল রয়েছে, যার উৎপাদনক্ষমতা বার্ষিক সাত লাখ গ্রোস। প্রতিদিন ৭০০ গ্রোস উৎপাদনে সক্ষম ৫৬টি ফ্যাক্টরি নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটবে। কিন্তু ভালোভাবে রফতানি করতে হলে ৭০টি ফ্যাক্টরি দরকার।

দক্ষিণ ভারতে কোমল বৃক্ষের গহিন বনের কোনো কমতি নেই। বন থেকে ফ্যাক্টরিতে রেলযোগে কাঠ বহন করতে প্রতি কিউবিক ফুটের পরিবহন ব্যয় চার আনা। সেই কাঠ থেকে তৈরি দেশলাই বাংলার আনতে পড়তায় মেলে না। এ কারণেই দেশলাইয়ের দাম বেশি।

এ অবস্থায় মহাজন বন্ধু বঙ্গবাসীকে যৌথ কারবার করার অর্থাৎ পুঁজি ও শ্রমের ভাগীদার হয়ে সেখানে দেশলাই ফ্যাক্টরি স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। তবেই সাশ্রয়ী মূল্যে বাংলার হাটবাজারে ন্যায্যমূল্যে দেশলাই ক্রয় করা সম্ভব হবে।

শতবর্ষ আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারদর

১৩১১ বঙ্গাব্দের মাঘ মাসে কলকাতার বঙ্গীয় বণিক সমিতি যে বাজারদর প্রচার করে, তা কৃষক সাময়িকীর মাঘ ১৩১১ (৫ম খণ্ড-১০ম) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। বণিক সমিতির তালিকা থেকে কিছু আবশ্যকীয় পণ্যের দর উদ্ধৃত করা হচ্ছে:

চাল (মণপ্রতি): বালাম সাড়ে ৩ টাকা, মোটা চাল ২ টাকা।

ডাল (মণপ্রতি): সোনামুগ সাড়ে ৩ টাকা, মাষকলাই ২ টাকা, মসুর ৩ টাকা, খেসারি ২ টাকা, বড় মটর দেড় টাকা।

তেল (মণপ্রতি): সরিষা (কলের) সাড়ে ৯ টাকা, সরিষা (ঘানি) ১২ টাকা, নারকেল (কলম্বো) ১৪ টাকা, কেরোসিন ৩ টাকা ১২ আনা।

লবণ (মণপ্রতি): লিভারপুল থেকে আমদানি ২ টাকা ১০ আনা, সৈন্ধব সোয়া ৩ টাকা।

তৈলজ (মণপ্রতি): সরিষা শ্বেতী ৪ টাকা, রাই ৩ টাকা ১৪ আনা, তিল সাড়ে ৪ টাকা, তিসি সাড়ে ৩ টাকা।

গম (মণপ্রতি): দুধেল ২ টাকা ১৪ আনা, যব ২ টাকা।

মসলা (মণপ্রতি): জিরা ৯ টাকা, মরিচ সাড়ে ২৩ টাকা, তেজপাতা সোয়া ৪ টাকা, বড় এলাচ ৩৬ টাকা, ছোট এলাচ ১১০ টাকা, গোলদানা ১৪০ টাকা, দারচিনি ২৩ টাকা, লবঙ্গ ৩৭ টাকা।

চিনি (মণপ্রতি): ইক্ষু ৯ টাকা, বাটা চিনি সাড়ে ৮ টাকা।

ময়দা (মণপ্রতি): কলের ময়দা সাড়ে ৪ টাকা, জাঁতার ময়দা সাড়ে ৩ টাকা।

আটা (মণপ্রতি): কলের আটা সোয়া ৪ টাকা, জাঁতার আটা সাড়ে ৩ টাকা।

সুজি (মণপ্রতি): কলের সুজি সাড়ে ৪ টাকা, জাঁতার সুজি সাড়ে ৪ টাকা।

গুড় (মণপ্রতি): ইক্ষু সাড়ে ৪ টাকা, খেজুর ৩ টাকা, দেশী চিটা আড়াই টাকা।

২০ গজ থান কাপড়: সাদা ধুতি ৪ টাকা।

বাঙালির অধঃপতন

৩ বৈশাখ ১৩১৩ ‘বঙ্গবাসিনী এক লেখিকা’ (জ্যৈষ্ঠ ১৩১৩/ জুন ১৯০৬ সংখ্যায় প্রকাশিত একটি পত্রে পত্রলেখিকার এর বেশি পরিচয় দেয়া হয়নি) জানিয়েছেন, বিদেশী জিনিসে বাসগৃহ পরিপূর্ণ, গোপনে বিদেশী বর্জনের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে দেশদ্রোহিতার চূড়ান্ত পরিচয় দিচ্ছে।

‘সৌভাগ্যই বল আর দুর্ভাগ্যই বল, আজি বাঙালির অধঃপতনের শেষ সীমায়। বাঙালি ঘরের অন্ন পরের হাতে দিয়া উপবাসে মরিতেছে, তাহার পরিধেয় বস্ত্র, রোগের ওষুধ, তৃষ্ণার জল, শিশুর খেলনা, যুবকের গ্রন্থ-তাহার কালি, কলম, কাগজ, তাহার বাক্স, দেরাজ, আয়না, চিরুনি, তাহার বাসন, বিছানা প্রায় সমস্ত গৃহসজ্জা, অধিক কি দেশলাইটি পর্যন্ত বিদেশী বণিক যোগাইতেছে। ইহার অপেক্ষা মর্মান্তিক ক্লেশ এই যে, বাঙালির যিনি রক্ষক শাসক সেই সুসভ্য সদাশয় রাজা- যে রাজার প্রজা হইয়া বাঙালি মানিতেছে, সেই রাজা বিদেশী বণিকের অনুকূল।’

... এই বাণিজ্য-কুশল অর্থপ্রিয় বণিকগণ দোষী না যে হতভাগ্য নির্ব্বোধ জাতি ইহাদিগের হস্তে সমস্ত ভার দিয়া, কর্ম্মফল অদৃষ্টের উপর চাপাইয়া পরিপূর্ণ নস্ফিলতা লইয়া অহিফেনভোজীর মতো অর্দ্ধোম্মীলিত নেত্রে ঢুলিতেছিল, সেই হতভাগ্য জাতি দোষী?’

পত্রলেখিকা উল্লেখ করেছেন, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, ফরাসডাঙ্গা, সিমলা, শান্তিপুর, চন্দ্রকোনার তন্তুবায়, বহরমপুর, খাগড়া, বরিশালের স্যাকরা, ঢাকার শঙ্খকার যে জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করতে পারে, সে জাতির অলস অকর্মণ্য ও পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কথা নয়। দোষ বিদেশী বণিকেরও নয়, দেশী কারিগরেরও নয়, অমার্জনীয় দোষ সমষ্টিগতভাবে দেশের সর্বসাধারণের, তাদের পরনির্ভর মানসিকতার।

 

লেখক: সাবেক সরকারি ও বেসরকারি বিমান কর্মকর্তা