সম্পাদকীয়

শুভ নববর্ষ ১৪২৬ : শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাই হোক অঙ্গীকার

০৩:৩২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৪, ২০১৯

বাংলা নতুন বছরের শুভেচ্ছা। পুরনো বছরের অর্জনগুলো সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নতুন বছরকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা জানি, অসাম্প্রদায়িকতা বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। সাম্য-সমতার পক্ষে, বৈষম্য-ধর্মান্ধতার বিপক্ষে এবং নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাঙালির চিরায়ত অবস্থান আমাদের জাতিগত অহংকার। নিজেদের আত্মপরিচয়ের এদিকটি আমরা যেন অটুট রাখতে পারি, নতুন বছরের শুরুতে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। একটি জাতি যখন সামাজিক শৃঙ্খলা ও সংস্কৃতির ধারা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তার মেধা-মননের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে যার চড়া মূল্য গুনতে হয়। তাই নতুন বছর উদযাপনের প্রাক্কালে সমাজের মলিনতা ও বিশৃঙ্খলা দূর করার প্রত্যয়গুলো মনে রাখা চাই। আমরা আরো জানি, বাংলাদেশ বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের মানুষের আবাসভূমি। বাংলা নববর্ষ এমন এক উৎসব, যেখানে এসে সব পরিচয় একাকার হয়ে যায়। আমরা হাজার বছরের যে সাংস্কৃতিক চেতনা ধারণ করে আসছি, পহেলা বৈশাখে তারই পুনর্জন্ম ঘটুক।

বর্তমানে আমরা এমন এক অনিশ্চিত সময়ে বাস করছি, যেখানে অপ্রত্যাশিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। একদিকে দেশজুড়ে নানা ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড চলছে, অন্যদিকে প্রতিদিন কেউ না কেউ দুর্ঘটনা, নিপীড়ন, প্রতিহিংসার বলি হচ্ছে। নিয়ম করে বেড়ে চলেছে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনা। আবরার, নুসরাত কিংবা শিশু মনিরের মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো আমাদের স্বাভাবিক জীবনের গতি রোধ করে। বাংলা নববর্ষ উদযাপনের শুরুতে নতুন করে নিজেদের অবস্থান আমাদের স্পষ্ট হওয়া জরুরি। অন্যায় ও অপরাধের বিচারের দাবি সর্বজনীন। আমরা ইতিবাচক সাফল্য পেয়েছি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে। একই সঙ্গে বৈষম্য বৃদ্ধি, ব্যাংক থেকে অর্থ লোপাট, অপ্রতুল কর্মসংস্থানের বিষয়গুলোও আমলে নিতে হবে। হাজারো কাঠ-খড় পুড়িয়ে আমরা কেন সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারছি না, কেন যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের এমন রুগ্ণ দশা, ঢাকা কেন যানজটে বিশ্বের শীর্ষ শহর, আজও কেন কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেল না—এসব প্রশ্নের সমাধান জরুরি। 

অচিরেই উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের নাম। প্রত্যাশা রাখি, ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে গিয়ে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে অবদান রাখা সম্ভব হবে। তবে সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ও মূল্যবোধ গঠনে সব ধরনের নিপীড়ন বন্ধ হওয়া জরুরি। মানুষের মেধা ও শ্রম কাজে লাগানোর জন্য গঠনমূলক ব্যবস্থা থাকাও অপরিহার্য। দেশের উন্নয়নে সামাজিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সৌহার্দ, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে অবদান রাখার নতুন অঙ্গীকার করা চাই। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে উদযাপিত হয় আদিবাসীদের বৈসুক, সাংগ্রাই, বিজু ইত্যাদি উৎসব। নানা আয়োজন চলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে। নিজেদের বর্ষবরণ উৎসবে অংশ নেয়ার পাশাপাশি আমরা যদি অন্যদের উৎসবগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই, তাহলে তা সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নববর্ষ উদযাপনের ব্যাপকতা ও তাতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বলে দেয়, এভাবেই বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা গত বছর যেসব অপ্রাপ্তি ও অপূর্ণতা ছিল, নতুন বছর তা মুছে দিয়ে নতুন বার্তা বয়ে আনবে। সমাজে সম্প্রীতির সুর যখন মিলছে না, তখন পহেলা বৈশাখের মতো এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোই হতে পারে সহিষ্ণুতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম। সমাজের দুর্নীতি, অনিয়ম দূর করে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকারই হোক পহেলা বৈশাখের নতুন চেতনা।