সম্পাদকীয়

ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সফর ও বাংলাদেশের আশু করণীয়

ড. আইনুন নিশাত | ২০:৩৩:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

গত ২ এপ্রিল (মঙ্গলবার) বণিক বার্তার দ্বিতীয় পাতায় প্রকাশিত একটি খবর পড়ে সে সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করার জন্য কলম ধরলাম। খবরটির শিরোনাম হলো, ‘ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ’। আমি কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছি যেন বাংলাদেশের অ্যাপ্রোচটি সফল হয় এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে অভিন্ন নদ-নদীর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি বিরাট দিকনির্দেশনামূলক কাজ হবে এটি সফল হলে। একটি অভিন্ন নদী—ইংরেজিতে যাকে ট্রান্সবাউন্ডারি রিভার বলা হয়—যা দুই বা ততোধিক দেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। বিশ্বজুড়ে বলা হয়, অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা অববাহিকাভিত্তিক হতে হবে। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত সব আইন-কানুন কিংবা গাইডলাইনে এটি জোরের সঙ্গে বলা আছে। টেকসই উন্নয়নের যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা আছে, তার ষষ্ঠ লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম টার্গেটটিতেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। অসুবিধা হলো, নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উজানের দেশ ভাটির দেশের সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়াতে চায় না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রীয় (ফেডারেল) ধরনের সরকারের দুটি প্রদেশের মধ্যেও একই ধরনের মনোভাব বিরাজ করে। ভারতের প্রত্যেকটি বড় নদী—যেটি দুটি প্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে—সেখানেও এ ধরনের জটিলতা আছে। অথচ বিশ্বের বহু দেশে অভিন্ন নদীর জন্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের মধ্যে কিংবা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন স্টেটের মধ্যে এ ধরনের সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, বতসোয়ানা, লেসেথো, মোজাম্বিক এ অংশেও অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক কার্যক্রম নেয়া হচ্ছে। নীল নদের ক্ষেত্রে অববাহিকার নয়টি দেশকে একত্র করে একটি চুক্তি হয়েছে। এখন উন্নয়নের কাজ হাতে নেয়ার মহাপরিকল্পনা প্রণীত হচ্ছে। মেকং নদীতে যে ছয়টি দেশ আছে, মিয়ানমার বাদ দিয়ে বাকি পাঁচ দেশ একত্রে কার্যক্রম শুরু করেছে। পরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে এবং সহযোগিতামূলক কাজের বহু উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ২০১১ সালে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার যে ফেমওয়ার্ক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাতে অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি ধারা রয়েছে। যেখানে কীভাবে দুই দেশ এগিয়ে যাবে তার দিকনির্দেশনা সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এর ২ নং ধারায় বলা হচ্ছে, এখন থেকে দুই দেশ সব অভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা অববাহিকাভিত্তিক করবে। ২০১১ থেকে আট বছর পেরিয়ে গেছে। খুব একটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হয় না।

আমরা মূলত গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের দিকে তাকিয়ে থাকি। যদিও ৫৪টি নদীকে অভিন্ন নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আমার মতে, সংখ্যাটা ৫৪-এর পরিবর্তে বোধ হয় ৭০-৭৫টি হবে। সেটি বড় কথা নয়। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ‘যার পরিকল্পনা সে করবে’, এর পরিবর্তে অভিন্ন পরিকল্পনার দিকে এগোতে হবে। গঙ্গায় ব্যবস্থাপনা করতে গেলে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ তিন দেশের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। ব্রহ্মপুত্রে সহযোগিতা করতে গেলে চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশ এ চারটি দেশের মধ্যে সমঝোতা দরকার। বাকি নদীগুলো বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়। এ কারণে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বাদ দিয়ে সব নদীতে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা হলেই কারিগরি সমঝোতা সম্ভব। এ পথে অনেকগুলো অন্তরায় আছে। প্রথম অন্তরায় হলো, ভারত সবকিছুতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে এগোতে চায়। সম্প্রতি ভারতের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তন হয়েছে। তারা এখন বহুমাত্রিক ব্যবস্থাপনার কথা বলছে। সার্ক একটি মৃতপ্রায় সংস্থা। কিন্তু তার অধীনে কিছু উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে এ অঞ্চলের দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে। বিবিআইএন অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভুটান, ইন্ডিয়া ও নেপাল এ চারটি দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনাটা অনেকদূর এগিয়েছে। স্থলপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি চুক্তি প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারত সই করেছে। ভুটান এখনো সই করেনি। কারণ পরিবেশগত বিষয়ে তাদের কিছু আপত্তি আছে। যেটি হয়ে গেলে এ চারটি দেশের মধ্যে সড়ক বা রেলপথে যোগাযোগ চালু হতে পারে। বিবিআইএনকে কেন্দ্র করে ভারত তাদের দ্বিপক্ষীয় অ্যাপ্রোচ/পদ্ধতির জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমরা মনে করি।

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যদি তিনটি দেশ জড়িত থাকে, তাহলে তাদের একত্রে বসে যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নেপাল আগ্রহ দেখাচ্ছে। কশী নদীতে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে ড্যাম ও জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি ধরে রেখে সারা বছর সস্তা/সাশ্রয়ী পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। এজন্য ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট প্রচুর লাগে। কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হয়। নেপাল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল যৌথভাবে যাতে কাজটি করতে পারে। কিন্তু সেখানে কী হচ্ছে, সেটা নিয়ে আমাদের কাছে স্বচ্ছ তথ্য-উপাত্ত নেই।

ভুটানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের মধ্যে দুটি বড় আকারের নদী রয়েছে। বাংলাদেশের দুটির নাম হলো ধরলা ও দুধকুমার। অন্যদিকে ভুটান থেকে উত্পত্তি হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে পড়েছে এ রকম অনেক উপনদী আছে এবং সেখান থেকে পানি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে মানস একটি উল্লেখযোগ্য বড় উপনদী। মানসের দুটি উপনদী। একটির নাম কুড়ি এবং অন্যটির নাম সংঘর। এ দুটি উপনদী ভুটানের মধ্যে মিলিত হয়েছে। যেখানে মিলিত হয়েছে, সেখানে ভুটান একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে। প্রকল্পটির নাম হলো দর্জিলং অথবা রোপতাসন হাইড্রো পাওয়ার স্টেশন। এটিতে ১ হাজার ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

ভুটানের অর্থনীতিতে পানিবিদ্যুৎ একটি বিরাট উপাদান। এরই মধ্যে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ উৎপাদিত পানিবিদ্যুতের যেটুকু ভুটানের প্রয়োজন হয়, তার অতিরিক্তটুকু তারা ভারতে রফতানি করে। এখন ভুটান চাইছে তা বাংলাদেশেও রফতানি করতে। দর্জিলং পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যদি তিনটি দেশ মিলে নির্মাণ করে, তবে স্বাভাবিকভাবেই ভুটানের অধিকার বেশি থাকবে। কারণ ভুটানের জমি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হবে বা উৎপাদনে সচল থাকবে। বিশাল জলাধারটি ভুটানের মাটিতেই থাকবে। কিন্তু বিশ্বে বহু ধরনের মডেল আছে, যেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো খরচ এবং উপকার কী করে ভাগ করে নেবে, তা প্রস্তাবিত আছে। অর্থাৎ এ জলাধারে পানি ধরে রাখার কারণে ব্রহ্মপুত্রে শুকনো মৌসুমে পানি বাড়বে। হয়তো তার প্রধান উপকার ভারত ও ভুটান পাবে। কারণ ব্রহ্মপুত্রে এরই মধ্যে যে প্রচুর পরিমাণ পানি আছে, তাতে অতিরিক্ত পানিটুকু খুব একটা প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু এই ১ হাজার ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণে তিনটি দেশ যদি মূলধন জোগান দেয়, তাহলে উৎপাদিত বিদ্যুতের কিছু অংশ অন্য দুটি দেশ পেতে পারে। এটি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ হবে। আর ভুটানের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারত ও বাংলাদেশ কিনে নিতে পারে। এ লক্ষ্যে ভুটান থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আসতে গেলে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে হবে। আমার জানামতে, এ লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যে, এ কাজ করাতে ভারত সহযোগিতা করবে। এরই মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বিহার কিংবা উত্তর প্রদেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হচ্ছে। কাজেই দর্জিলংয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটা অংশ বাংলাদেশ যাতে মালিক হিসেবে পেতে পারে এবং অতিরিক্ত কিছু বিদ্যুৎ যাতে কিনতে পারে, সে লক্ষ্যে যে আলাপ-আলোচনা চলছে, এটা অত্যন্ত মূল্যবান, সময়োপযোগী এবং এ সহযোগিতাটাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সব নদীর ব্যবস্থাপনায় পথিকৃৎ হয়ে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা হলো, আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল একটি বিষয়ভিত্তিক হয়তো হবে না। রাজনৈতিক পর্যায়ে যখন আলোচনা হবে তখন দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন, সবগুলোই আলোচনার টেবিলে আসবে। বণিক বার্তার ওই প্রতিবেদনে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে আলোচনা হবে, তার মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, পর্যটন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু, দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, আঞ্চলিক সহযোগিতা, ট্রানজিট এবং কানেক্টিভিটি, বিশেষ করে বিবিআইএনের অগ্রগতি। এটি একটি সঠিক পদক্ষেপ। ধরলা ও দুধকুমারে যদি অববাহিকাভিত্তিক উন্নয়ন করা যায়, উজানে জলাধার নির্মাণ করে সারা বছর পানির উচ্চতা যদি নিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ানো যায়, তাহলে বাংলাদেশের একটি নৌযান ভারতের ভেতর দিয়ে ভুটানে যেতে পারবে। একটি ভূমিবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) দেশের জন্য এটি একটি বড় পাওয়া। তাহলে একটি বার্জ ভুটান থেকে রওনা দিয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র হয়ে মোংলা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছতে পারবে। ভুটানের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এটি বিরাট অবদান রাখবে। বাংলাদেশের লাভ হবে ধরলা ও দুধকুমারের পানি শীতের সময় বাড়বে, কুড়িগ্রাম সেচ প্রকল্পে পানি পাওয়া যাবে। ধরলা-দুধকুমার বন্যার জন্য খুব খ্যাত, নদীভাঙনের জন্য প্রলয়ঙ্করী—এ দুটো সমস্যারও সমাধান হবে। উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা এলাকার যে দুঃখ, সেটি দূরীভূত হবে। পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। অভিন্ন নৌপথ চালিত হবে।

ভুটান এখন যে প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে দর্জিলংয়ে, এটি দেশটি থেকে ভারত হয়ে ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে। মানস নদটি সরাসরি বাংলাদেশে আসে না। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের উপনদ হওয়ার কারণে অবশ্যই বাংলাদেশের অধিকার ও আগ্রহ রয়েছে। আমি আশা করব—বাংলাদেশ যেভাবে ভুটানকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করতে রাজি হচ্ছে, বিশেষ করে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার ক্ষেত্রে—আলোচনার জন্য যেসব বিষয় নির্ধারণ হয়েছে, তার সব কয়টির ক্ষেত্রেই অগ্রগতি সাধন হোক। মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের সহযোগিতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো ভুটানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১০ বছর বাংলাদেশে ছিলেন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তারপর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশীদের মনোভাব বোঝেন, বাংলায় কথা বলতে পারেন। কাজেই তার মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রথম কংক্রিট পদক্ষেপ হবে বলে আমরা আশা করতে পারি।

এ বিষয়ে আমার চিন্তা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে। বাংলাদেশের কোন মন্ত্রণালয় এতগুলো বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করছে? প্রত্যেকটি বিষয়ের জন্য তো আলাদা মন্ত্রণালয় আছে। ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট—এ দুটো যোগাযোগ কিংবা নৌ-মন্ত্রণালয়ের কাজ। আমাদের নৌ-মন্ত্রণালয় যমুনা নদীতে ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু করেছে, যাতে নৌপথে চলাচল বাড়ে। দর্জিলংয়ের এ প্রকল্প সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র হয়ে ভুটানে যাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ এ নদীটির সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ না থাকলেও অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় এর মাধ্যমেও নৌ-যোগাযোগ হতে পারে। শিল্প স্থাপন, পর্যটন, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা সবকিছুই কিন্তু পৃথক পৃথক মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন। যদিও আলোচনা হবে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যদি উৎসাহের সঙ্গে এগিয়ে না আসে তাহলে বাংলাদেশই তো দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না। 

পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পটি আরেকটু গভীরভাবে দেখি। এ বিষয়ে প্রথমত পানি মন্ত্রণালয়ের বিরাট একটি ভূমিকা প্রয়োজন। অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় তারা অগ্রণী ভূমিকা নেবে বলে আশা করি। দ্বিতীয়ত, নৌ-মন্ত্রণালয়ের একটি বড় ভূমিকা আশা করি। কারণ এতে ভুটানকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে জলপথে নৌ-ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করা সম্ভব। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার বিষয়। অবশ্যই বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় সঞ্চালন লাইন থেকে শুরু করে যেটুকু বিদ্যুৎ বাংলাদেশের গ্রিডে আসবে, সেটা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করবে। চতুর্থত, অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের বিরাট ভূমিকা থাকতে হবে। বাংলাদেশ এই যে প্রকল্পে কতটা বিনিয়োগ করবে এবং কতটা সুফল পাবে অর্থাৎ কতটা বিদ্যুৎ বাংলাদেশ পাবে এবং নৌ-চলাচলে সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ পাবে, কতটা বিদ্যুৎ কিনবে—সব বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকা থাকা দরকার। অবশ্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যথাযোগ্য ভূমিকা থাকবে।

যেহেতু অনেক বিষয় একসঙ্গে আলোচিত হবে অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধার আদান-প্রদান, কে কোথায় কতটা ছাড় দেবে, কে কতটা সুযোগ সৃষ্টি করবে—এর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এটি আমি মনে করছি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত। এর সঙ্গে প্রয়োজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের ভূমিকা। প্রধানমন্ত্রীর অন্তত দুজন উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান এবং ড. গওহর রিজভীর বড় ভূমিকা আমরা দেখতে চাই। শুধু পানি ব্যবস্থাপনার জন্য এবং জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা পানি মন্ত্রণালয়, নৌ-চলাচল মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় উপদেষ্টাদের ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছি। আমরা একটি কথা শুনে শঙ্কিত। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বিদ্যুৎ কেনায় আগ্রহী, বিদ্যুতের ব্যাপারে বিনিয়োগে আগ্রহী নয়। কিন্তু আমাদের জন্য আনন্দের বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সঠিক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এ অঞ্চলে অভিন্ন পানি ব্যবস্থাপনা অর্জনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করতে রাজি আছেন। অর্থাৎ অর্থ মন্ত্রণালয় যে অর্থ বরাদ্দ করবে, সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। এখন প্রয়োজন এ বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের কতটুকু প্রস্তুতি আছে, তা এখনো আমরা জানতে পারিনি। অবশ্যই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাটা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মাধ্যমেই কথাবার্তা হয়ে থাকে। ভুটানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশে ভুটানের রাষ্ট্রদূত স্বাভাবিকভাবেই সহায়ক ভূমিকা পালন করবেন বলে আমরা আশা করি। কিন্তু তারা তো কারিগরি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কারিগরিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। আমি এ বিষয়ে বাংলাদেশে যে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, সেখানে স্বচ্ছতাও কামনা করি। জনমত তৈরি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। আমরা যেসব বিষয়ে সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে জানতে পেরেছি, তার মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্ট, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, পর্যটন উন্নয়ন, স্বাস্থ্য খাত, কৃষি খাত ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর ধারাগুলো বা বিষয়বস্তু নিয়ে জটিলতা থাকতে পারে, কাজেই চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই এ সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা প্রত্যাশা করি।

যেহেতু এ অঞ্চলে আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা দ্রুত এগোচ্ছে, সেহেতু আমাদের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোকে নতুন করে যাচাই করার সময় এসেছে। একটি উদাহরণ দিই। আমরা যদি সৈয়দপুর কিংবা ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দরকে প্রসারিত করতে পারি, ভিসা ব্যবস্থা সহজ করতে পারি, তাহলে ভুটান কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে, আসাম বা সিকিম থেকে যেসব যাত্রী বিদেশে যাবে, তারা সহজেই সৈয়দপুর হয়ে ঢাকা এসে ঢাকা বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। একইভাবে সিলেট বিমানবন্দরকে সম্প্রসারণ করে ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়া যেতে পারে। কিছুদিন আগে গোয়াহাটি গিয়েছিলাম। সেখানে অনেক ক’জনের কাছেই শুনেছি যে গোয়াহাটি থেকে ঢাকায় বিমানপথে আসতে আধা ঘণ্টার বেশি লাগে না। তারা ঢাকাকে ট্রানজিটের পয়েন্ট হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশ বিমান হোক অথবা ঢাকায় যেসব বিদেশী বিমান ল্যান্ড করে, তার মাধ্যমে বহির্বিশ্বে সহজেই চলে যেতে পারেন। ভুটানকে আমরা এ সুযোগ-সুবিধা নেয়ার আহ্বান জানাতে পারি। সবশেষে আমি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোতে শেরিংকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাচ্ছি। বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন সফল রাজনীতিবিদ অবশ্যই চাইবেন সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত করতে। ভুটান উপকৃত হবে, বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রয়োজন সবকিছু নতুন করে ভাবার এবং একটি হলিস্টিক অ্যাপ্রোচে এগিয়ে যাওয়ার। দেশের মধ্যেই যদি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত অ্যাপ্রোচের অভাব থাকে, তাহলে সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার বিলম্বিত হতে পারে।

 

লেখক: পানিবিজ্ঞানী

পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ