কলের গাড়ি

হাঁটুর ব্যথায় করণীয়

১৯:২২:০০ মিনিট, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

হাঁটু হলো আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় জয়েন্টগুলোর মধ্যে একটি। হাঁটু শুধু আমাদের শরীরের ভার বহন করে না, আমাদেরকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে, দৌড়াতে ও বসতে সাহায্য করে। খেলাধুলা বা দৌড়াদৌড়ি করার সময় আমাদের হাঁটু অনেক ধকল সহ্য করে।

হাঁটুর জয়েন্ট তৈরি হয় মূলত তিনটি হাড় দিয়ে, ফিমার বা উরুর হাড়, প্যাটিলা বা মালাই চাকির মতো হাঁটুর সামনের দিকের হাড় ও টিবিয়া বা শিন বোন দিয়ে।

হাঁটুর সমগ্র জয়েন্টের ভেতরটি সায়নোভিয়াল মেমব্রেন বা ঝিল্লি দিয়ে ঢাকা থাকে। এই সায়নোভিয়াল মেমব্রেন সায়নোভিয়াল ফ্লুইড তৈরি করে, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোটরগাড়ির ইঞ্জিন অয়েল যেমন ঘর্ষণজনিত ক্ষয় রোধ করে, তেমনি সায়নোভিয়াল ফ্লুইড হাঁটুর ঘর্ষণজনিত ক্ষয় রোধ করে। হাঁটুর জয়েন্টের চারপাশে থাকে সূক্ষ্ম নার্ভের জালিকা, যা হাঁটুতে তৈরি হওয়া ব্যথার অনুভূতি ব্রেইনে পাঠিয়ে দেয় এবং আমরা হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করি।

বিভিন্ন কারণে হাঁটুর ব্যথা হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আঘাত একটি বড় কারণ। যেমন ফুটবল খেলতে গিয়ে অনেকেরই আঘাতজনিত কারণে লিগামেন্ট বা মাংসপেশি ছিঁড়ে যায়, কখনো কখনো হাড় সরে যায় বা ভেঙে যায়।

আবার কিছু আর্থ্রাইটিস রয়েছে, যার ফলে জয়েন্টে প্রদাহ হয় এবং ব্যথার সৃষ্টি হয়। কখনো কখনো হাঁটু ফুলে যায়। সাধারণত লোকে আর্থ্রাইটিসকে বাত বলে মনে করে।

বেশি বয়সের (৪০ বছর বয়সের বেশি) হাঁটু ব্যথার সবচেয়ে বড় কারণ অস্টিও আর্থাইটিস বা হাঁটুর ক্ষয় বাত।

হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিসের কারণ কী?

হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিস বয়সজনিত ক্ষয় রোগ হিসেবে পরিচিত।  যদিও বয়স ছাড়াও বিভিন্ন কারণে হাঁটুর এ রোগ হতে পারে। যেমন—

ওজন বেশি হলে হাঁটুর ওপর চাপ পড়ে। হাঁটুর জয়েন্টে আঘাত লাগলে হাঁটুর ক্ষতি হতে পারে। ভারী জিনিস তোলা, হাঁটু ভাঁজ করা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করার কারণে হাঁটুর ওপর ধকল হয়।

এছাড়া কার্টিলেজোর ক্ষয়ের জন্য বংশগত কারণও থাকে।

হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ ও উপসর্গ: হাঁটুর অস্টিও আথ্রাইটিসের প্রধান লক্ষণ হলো হাঁটুর ব্যথা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করা বা পরিশ্রমের পর হাঁটুর ব্যথা বেড়ে যাওয়া। বিশেষ করে হাঁটু ভাঁজ করে নামাজ পড়ার সময় অনেকেই ব্যথা বোধ করেন। হাঁটু ভাজ করার সময় ব্যথা হয়। হাঁটুর জয়েন্ট আড়ষ্ট হয়ে যায়। বসে থাকা অবস্থাতেও ব্যথার অনুভূতি হয়।

হাঁটুর ব্যথা চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হাঁটুর যত্ন নিন

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: হাঁটু যেহেতু শরীরের ওজন বহন করে, তাই অতিরিক্ত ওজন হওয়ার ফলে হাঁটুর ওপর চাপ পড়ে। এক্ষেত্রে অ্যারোবিক ব্যায়াম ওজন কমাতে ও শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এগুলোর সঙ্গে সঙ্গে খাবার-দাবারও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শরীরের ওজন না কমাতে পারলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া খুব কঠিন।

খাদ্যাভ্যাস: ভাজাপোড়া খাবার, কেক, বিস্কুট প্রভৃতি শর্করা ধরনের খাবার কম খাওয়া। এগুলো ওজন বাড়িয়ে দেয়।

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (আখরোট বা তিসি বীজ), ভিটামিন সি (পেয়ারা, আনারস, পেঁপে, টমেটো), ভিটামিন-ই (সূর্যমুখীর তেল, আমন্ড, পালংশাক, ব্রোকলি), ভিটামিন ডি (সালমন, সার্ডাইন, চিংড়ি প্রভৃতি মাছ ও ডিম),  বিটা-ক্যারোটেনযুক্ত (গাজর, টমেটো, ক্যাপসিকাম, পালংশাক, পুদিনা পাতা, রাঙা আলু) খাবার বেশি খাওয়া।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন: হাঁটুর অস্টিও আর্থ্রাইটিস সাধারণত উরুর পেশিকে দুর্বল করে দেয়। তাই উরুর পেশি মজবুত করা প্রয়োজন, কারণ এই পেশি হাঁটুর জয়েন্টে কিছুটা চাপ নেয় এবং হাঁটুকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়।  পেশি মজবুত করার জন্য কিছু ব্যায়াম অবশ্যই করতে হবে। মনে রাখতে হবে বেশির ভাগ বেল্ট বা হাঁটুর সাপোর্ট মাংশপেশিকে দুর্বল করে এবং হাঁটুর ক্ষতি করে। এগুলো ব্যবহার না করাই উচিত।

নিম্নলিখিত ব্যায়ামগুলো রোজ করতে থাকুন:

সোজা হয়ে পা সোজা করে বসুন। তারপর একটি তোয়ালে রোল করে হাঁটুর নিচে রেখে হাঁটু দিয়ে তোয়ালেতে চাপ দিন। এভাবে ১০ সেকেন্ড থাকুন। শরীরের অন্যান্য অংশ স্বাভাবিক রাখুন এবং স্বাভাবিকভাবেই শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। এভাবে অন্য পায়ে করুন। এ রকম ১০ বার করুন।

প্রথমে সোজা হয়ে বসুন। পা দুটি অর্ধেক ভাঁজ করুন। এবার একটি পায়ের গোড়ালি দিয়ে মেঝেতে চাপ দিন। এভাবে ১০ সেকেন্ড থাকুন। এরপর অন্য পায়ে করুন। এটি ১০ বার করুন।

প্রথমে একটি চেয়ারে বসুন। এরপর ধীরে ধীরে একটি পা সোজা করে ওপরে তুলতে থাকুন। পা সোজা অবস্থায় এলে ১০ সেকেন্ড ধরে থাকুন। এরপর পা নিচে নামিয়ে দিন ও অন্য পায়ে করুন। এভাবে ১০ বার করুন।

 

উম্মে শায়লা রুমকী

প্রধান ফিজিওথেরাপি কনসালট্যান্ট

ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার (পিটিআরসি)