ফিচার, আন্তর্জাতিক খবর, , ,

‘যুদ্ধ মৌসুমে’ ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে তালেবান যোদ্ধারা

বণিক বার্তা অনলাইন | ১৭:৩৭:০০ মিনিট, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

২২ গজের ক্রিকেট পিচ। অস্ত্র ব্যাট ও বল। যেখানে কোন রক্তপাত নেই। আছে বিজয়ীর মুকুট। আছে অবসরের আনন্দ। আর ক্রিকেটের এই আনন্দ এখন ছড়িয়ে পড়ছে আফগানস্তিনের তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যেও। প্রতি বছর বসন্তকালে ইসলামপন্থী তালেবানের হামলা বৃদ্ধি পায়। ওই সময়কে ‘যুদ্ধের মৌসুম' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যুদ্ধকালীন এই সময়ে সাময়িক আনন্দের জন্য অস্ত্র ছেড়ে ব্যাট-বল আর প্যাড নিয়ে মাঠে নেমে যান তালেবান যোদ্ধারা। যে তালেবানরা এক সময় এই ক্রিকেটকে নিষিদ্ধ করেছিল তাদের এখন বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হয়েছে এই খেলা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য মিলেছে।

দেশটিতে যুদ্ধের মৌসুমে তালেবান যোদ্ধারা তাদের কালাশনিকভ বা একে-৪৭ বন্দুক ফেলে দিয়ে হাতে তুলে নেয় ক্রিকেট ব্যাট। কখনও যুদ্ধের মধ্যেও ক্রিকেটের মাধ্যমেই তারা তাদের অবসর সময়কে উপভোগ করে থাকে। ফলে তালেবান শাসনের শুরুতে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলাকে নিষিদ্ধ করা হলেও বর্তমানে তাদের যোদ্ধাদের মধ্যে ক্রিকেট খেলা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ক্রিকেটই এখন তালেবান যোদ্ধাদের আনন্দের প্রধান মাধ্যম বলে জানান কমান্ডার মোল্লা বদরুদ্দীন। তিনি বলেন, যখন যুদ্ধ থাকে না তালেবান নিয়ন্ত্রিত গ্রামগুলো থেকে শত শত মানুষের ভিড় জমে যায় তাদের খেলা দেখার জন্য। দেশটির জাতীয় ক্রিকেট দলের উত্তরোত্তর উন্নতিতে যোদ্ধারা ক্রিকেটের ভক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

পাকিস্তানের সাথে নানগারহার সীমান্তের খোগয়ানি জেলার তালেবান কমান্ডার মোল্লা বদরুদ্দীন জানান, তিনি নিজেও ক্রিকেট ভালোবাসেন। গত শীতে সেখানে যখন তালেবান যোদ্ধারা একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করে। তখন প্রচুর জনসমাগম হয়েছিল।

এই তালেবান যোদ্ধা জানান, যখন দেশের জাতীয় দল অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে খেলা করে। তখন তারা অতি উৎসাহ নিয়ে রেডিওতে ধারাভাষ্য শোনার চেষ্টা করেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং খেলার স্কোর দেখার যেসব মাধ্যম আছে সেগুলো নিয়মিত দেখেন যোদ্ধারা।

উনবিংশ শতাব্দিতে আফগানিস্তানে ব্রিটিশরা প্রথম ক্রিকেট খেলাকে পরিচিত করে। ১৯৮০ সালে সোভিয়েত আক্রমণে ও ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের সময় প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ পালিয়ে পাকিস্তানে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। তখন থেকে তাদের মধ্যে খেলাটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সেখান থেকেই আজ আফগান ক্রিকেটের এতটা পথ পাড়ি দেওয়া। বর্তমানে আইসিসির পূর্ণ সদস্য এবং সম্প্রতি টেস্ট খেলুড়ে দেশের সম্মান অর্জন করে নিয়েছে শরনার্থী শিবিরে গড়ে উঠা সেই দলটি।

সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড় হাস্তি গুল জানান, ৮০ দশকে পাকিস্তানের পোশোয়ার শহরের বাইরে কাছাগাড়ি শরণার্থী শিবিরে তাজ মুলুক খান নামে এক ব্যক্তি আফগান ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। পরে তালেবান শাসনের সময় ৯০ দশকে সেখান থেকে কিছু খেলোয়াড় আফগানিস্তানে গিয়ে মাঝেমাঝে ক্রিকেট খেলতো এবং সেখানে এটির জনপ্রিয়তা তৈরি করতে কাজ করতো।

কিন্তু তালেবান সরকারের কঠোর আইনের শুরুর দিকে ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলা সেখানে নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ তারা মনে করতো এই খেলার মাধ্যমে সেখানকার মানুষ ইবাদাত বন্দেগী থেকে দূরে সরে যেতে পারে। হাস্তি গুলের মতে, যদিও পরবর্তীতে ক্রিকেটের প্রতি বেশ সহনশীল হয়েছিল তালেবান সরকার।

তবে পরবর্তীতে দুটি ক্রিকেট ম্যাচে ইসলামপন্থী উগ্রগোষ্ঠীদের আক্রমণের পরেও দেশটিতে এখন ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বী খেলা হলো এই ক্রিকেট।

২০১৭ সালে আফগানিস্তান আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন করে এবং সম্প্রতি তাদের প্রথম আন্তর্জাতিক পাঁচ দিনের ম্যাচে জয়লাভ করে। ক্রিকেটের ছোট ভার্সনে আফগানিস্তান বেশ শক্তিশালি হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রশিদ খান এবং মোহাম্মাদ নবীর মত বিশ্বমানের খেলোয়াড় বেরিয়ে আসছে যারা আইপিএল থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

আগামি মে থেকে শুরু হতে যাওয়া ক্রিকেট বিশ্বকাপকে ঘিরে আফগানিস্তানে দর্শকদের আশা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই শক্তিশালী দলকে হারানোর মত সামর্থ্য দেখছে আফগানিস্তানি দলের মধ্যে।

তরুণ খেলোয়াড় হজরত গুল জানান, আমাদের বেশ শক্ত সামর্থ টিম রয়েছে এবার। আমার স্বপ্ন আফগানিস্তান এবার বিশ্বকাপ ঘরে আনবে।

জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় করীম সাদিক পূর্ব আফগানিস্তানের তালেবান অধ্যুষিত অঞ্চল ভ্রমণ করে একটি ভিডিও তৈরি করেছেন। সেখানে দেখা যায় কাঁধে বন্দুকধারী তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে।

হাস্তি গুল জানান, আমরা সরকার থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পেতাম না যতদিন না তারা মনে করেছে ক্রিকেট দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনতে পারে।

তিনি বলেন, এখন আফগানিস্তানে সবাই ক্রিকেট ভালোবাসে এবং আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ক্রিকেটের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় পতাকাকে তুলে ধরতে চাই।

আফগানিস্তান একটি উদাহরণ যেখানে রক্তপাতের মধ্যেও ক্রিকেটের মাধ্যমে দেশকে অন্যভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াশ চালিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। তাদের পরিশ্রমে আজ যুদ্ধ শিবিরেও পৌঁছেছে সেই ছোঁয়া। আর তাইতো তারা আজ অস্ত্র ফেলে তুলে নিচ্ছে ক্রিকেট ব্যাট। হয়ত একদিন সেখান থেকেই বের হয়ে আসবে রশিদ খান-মোহাম্মাদ নবী ও শেহজাদ খানের মতো তারকা ক্রিকেটার। ঠিক যেমন শরনার্থী শিবির থেকে গড়ে উঠেছিল আজকের আফগানিস্তান ক্রিকেট দল।

রয়টার্স অবলম্বনে আল ফাহাদ