ফিচার

ড্রাগনের চোখ যখন ওশেনিয়ার দ্বীপে

বণিক বার্তা ডেস্ক | ১৮:০৭:০০ মিনিট, মার্চ ২৭, ২০১৯

দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর একটি দ্বীপ দেশ পাপুয়া নিউগিনি। অবস্থানগত কারণে প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপ। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় যেক’টি দ্বীপ ভরকেন্দ্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাপুয়া নিউগিনি তার মধ্যে অন্যতম।
এই দ্বীপে পশ্চিমা তথা যুক্তরাষ্ট্র ও তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি যেমন স্পষ্ট তেমনি স্পষ্ট চীনের উপস্থিতিও। তবে সম্প্রতি চীনের প্রভাববলয় যেভাবে পরিধি বিস্তার করে চলেছে তাতে শিগগিরই এই অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার শংকায় পড়েছে পশ্চিমা শক্তি।

চীনের সঙ্গে বন্ধত্বের ঘনিষ্ঠতার কথা বিশেষ করে ২০১৮ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে অনেকটা স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দেয় পাপুয়া নিউগিনির সরকার। ওই সময় সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন করে দেয়ার পশ্চিমা প্রস্তাব সরাসরি ফিরিয়ে দেয় দেশটি। চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ের প্রস্তাবের বিপরীতে তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় কাজটি পাওয়ার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হুয়াওয়েই জিতে যায়। ৩ হাজার ৩৯০ মাইলের অভ্যন্তরীণ সংযোগের কাজ এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য চীনা এক্সিম ব্যাংক থেকে ১৯৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে পাপুয়া নিউগিনি। অথচ অস্ট্রেলিয়া সিডনি ব্রডব্যান্ড হাব থেকে মাত্র ১০১ মিলিয়ন ডলারে কাজটি করে দিতে চেয়েছিল।

এটা সম্ভব হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং ২০০৯ সাল থেকে হুয়াওয়ের ব্যবসা সম্প্রসারণের ফল। এসব মূলত চীনের সঙ্গে পাপুয়া নিউগিনির কূটনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক সম্পর্ক গাঢ় হওয়ারই লক্ষণ। আর স্বভাবতই ওশেনিয়াতে চীনের এই সরব উপস্থিতি ওয়াশিংটন ও টোকিওর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবশ্য চীনের সঙ্গে পাপুয়া নিউগিনি এই সম্পর্ক কখনো গোপন রাখেনি। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে দক্ষিণ চীন সাগরে সীমানা বিরোধ নিয়ে হেগের আন্তর্জাতিক আদালত ফিলিপাইনের মামলায় রায় দেয়ার আগমুহূর্তে চীনের অবস্থানের পক্ষেই সাফাই গেয়েছে পাপুয়াপ নিউগিনি। এই অঞ্চলের আরেকটি দ্বীপ রাষ্ট্র ভানুয়াতুও একই অবস্থান নিয়েছিল। ২০১৮ সালের মে মাসে চীনের চাপে পাপুয়া নিউগিনিতে তাইওয়ানের মিশনের নাম থেকে রিপাবলিক অব চায়না বাদ দিতে বাধ্য করে নিউগিনি সরকার। ২০১৮ সালে চীনা গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাত্কারে নিউগিনির প্রধানমন্ত্রী পিটার ও’নিল স্বীকার করেন, ২০১১ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি ১২বার চীন সফর করেছেন। বিপরীতে জাপান সফর করেছেন মাত্র চারবার।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রথম কোনো দ্বীপ দেশ হিসেবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে পাপুয়া নিউগিনি। সেই সঙ্গে এশিয়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্ট ব্যাংকের সদস্যও হয়ে যায়। ঠিক এরপরই চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী ও’নিল। ২০১৮ সালে পাপুয়া নিউগিনি এপেক সম্মেলন আয়োজনের স্বাগতিক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রথম সমর্থন আসে চীনের পক্ষ থেকে। এই সম্মেলন আয়োজনে নিরাপত্তা ইস্যুতে খুব ঘনিষ্ঠভাবে পাপুয়া নিউগিনিকে সহায়তা করে চীন।
চীনের সঙ্গে পাপুয়া নিউগিনির সম্পর্কের গভীরতা মাপা ও দেশটিতে চীনের প্রভাব বুঝতে পারার জন্য ২০১৮ সালের এপেক সম্মেলনটি ছিল পশ্চিমাদের জন্য দারুণ সুযোগ। সম্মেলনের সমাপণী বিবৃতিতে ‘সব ধরনের অসম বাণিজ্যসহ সংরক্ষণবাদিতার বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে সম্মত হয়েছি’ এমন একটি অনুচ্ছেদ চীনা অবস্থানেরই প্রতিধ্বনি করেছে। এপেক সম্মেলনের সাইডলাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এবং পাপুয়া নিউগিনির প্রধানমন্ত্রী ও’নিল বৈঠকও করেন।

২০১৪ সালে কৌশলগত অংশীদারিত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হয় দুই দেশ। এরপর ২০১৮ সালের জুলাই মাসে তারা সামরিক সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তবে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক বর্তমানে কোন পর্যায়ে আছে সেটি বলা মুশকিল।

তবে ২০১৭ সালে কিছু চীনা সামরিক যান হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে পাপুয়া নিউগিনির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফ্যাবিয়ান পোক প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে চীনা সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তাছাড়া ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য দুই জন করে কর্মকর্তা নেয়া হলেও ২০০৪ সালে তা বছরে পাঁচ জনে দাঁড়ায়।

এর মাধ্যমে এই অঞ্চলে চীনের অববস্থান পাকাপোক্ত করার কৌশলেরই বাস্তবায়ন ঘটছে। একুশ শতকের সামুদ্রিক সিল্করোড প্রতিষ্ঠার জন্য নিউগিনির পাশাপাশি সামোয়া, ফিজি এবং ভানুয়াতু হতে পারে চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভরকেন্দ্র। দ্বীপগুলোর সামরিক গুরুত্বও কম নয়।

তবে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাববলয় সম্পর্কে মোটেই নির্লিপ্ত নয় প্রতিদ্বন্দ্বীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকুউরিটি রিভিউ কমিশন এরই মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোতে চীনের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ২০১৮ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারা বলে, এই অঞ্চলে চীন অন্যতম শক্তি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। চীনের এই অগ্রগতিকে তারা ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা বলেই বিবেচনা করছে। ২০১৮ সালের নভেম্বরেই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ঘোষণা দেন, পাপুয়া নিউগিনির লমব্রাম নৌঘাঁটিটি তারা অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেবেন। জাপান সেখানে শিক্ষা, অবকাঠামো ও অগ্নিনিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। সেই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়নেও সহযোগিতা করতে চায় দেশটি।

কগনিটাশিয়া অবলম্বনে