শেষ পাতা

বাস থেকে ফেলে শিক্ষার্থী হত্যা : ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ সিকৃবি শিক্ষার্থীদের

বণিক বার্তা প্রতিনিধি সিলেট | ০১:০৭:০০ মিনিট, মার্চ ২৫, ২০১৯

চলন্ত বাস থেকে ফেলে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) শিক্ষার্থী ওয়াসিম আফনানকে (২৪) হত্যার প্রতিবাদে গতকাল দিনভর সিলেটে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ থেকে ওয়াসিম হত্যার বিচারসহ নিরাপদ সড়কের দাবি জানান তারা।

এদিকে, পাঁচ দফা দাবি আদায়ে তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তিনদিন ক্লাস পরীক্ষা বর্জনেরও ঘোষণা দেন তারা। গতকালও বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস পরীক্ষা হয়নি।

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: ওয়াসিম আফনান হত্যার প্রতিবাদে গতকাল সকালে ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুপুর পর্যন্ত তারা চৌহাট্টা-জিন্দাবাজার সড়ক অবরোধ করে ওয়াসিম হত্যার বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবি জানান। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ সড়ক দিয়ে যেতে চাইলে তার গাড়িও আটকে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে তিনি গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাস দেন।

প্রশাসনের আশ্বাসে পাঁচ দফা দাবি আদায়ে তিনদিনের আলটিমেটাম জানিয়ে দুপুরে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন সিকৃবির শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে আগামী তিনদিন ক্লাস পরীক্ষা বর্জনেরও ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, ওয়াসিমের মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, হত্যা। তাই এ ঘটনায় হত্যা মামলা নিতে হবে এবং তিনদিনের মধ্যে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ঘাতক বাসচালক ও তার সহকারীর দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার কার্যকর করতে হবে। ঘাতক ‘উদার’ পরিবহন বাসের রুট পারমিট ও লাইসেন্স বাতিলেরও দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। এছাড়া নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফিটনেসবিহীন কোনো যানবাহন যাতে সড়কে না চলে, সে দাবিও তোলেন তারা।

সিকৃবির শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়ার পর বিকালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু হয়। তারা ওয়াসিম হত্যার বিচার ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি জানান।

ওয়াসিম হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। গতকাল দুপুরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে মানববন্ধন থেকে ওয়াসিম হত্যার দ্রুত বিচার দাবি করা হয়।

বাস, চালক হেলপার আটক: সিকৃবি শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় শনিবার রাতেই ঘাতক বাস, তার চালক ও সহকারীকে আটক করে পুলিশ। শনিবার রাত ৯টার দিকে ওসমানীনগরের উনিশমাইল এলাকায় উদার পরিবহনের বাসটি আটক করে হাইওয়ে পুলিশ।

রাত সাড়ে ১১টায় নগরীর দক্ষিণ সুরমার কদমতলী থেকে বাসচালক জুয়েল আহমদকে আটক করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। রাত ২টায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার শ্বশুরবাড়ি থেকে আটক করা হয় চালকের সহকারী মাসুক আলীকে। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশের কাছে ঘটনার বর্ণনা চালক সহকারীর: সিকৃবি শিক্ষার্থী ওয়াসিম আফনানকে বাসচাপায় হত্যার ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা পুলিশের কাছে দিয়েছেন উদার পরিবহনের বাসের চালক ও তার সহকারী। গতকাল দুপুরে এ তথ্য জানান মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) আনোয়ারুল হক।

চালক ও সহকারীর বরাত দিয়ে তিনি বলেন, শনিবার বিকালে নবীগঞ্জের টোল প্লাজা থেকে সিলেট যাওয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র উদার পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-১৪-১২৮০) বাসে ওঠেন। এ সময় সহকারী মাসুক মিয়া তাদের কাছে ১০০ টাকা ভাড়া দাবি করেন। ওয়াসিম ও তার বন্ধুরা ছাত্র পরিচয় দিয়ে ভাড়া কম রাখার কথা বলেন। এতে সহকারী ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের সঙ্গে বাগিবতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শেরপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নেমে যান। নামার সময় পেছন থেকে বাসের সহকারী তাদের গালি দেন। গালি শুনে ক্ষুব্ধ ওয়াসিম বাসের সিঁড়িতে উঠে হাতল ধরে কেন গালি দিলেন তা জিজ্ঞেস করেন সহকারীকে। এ সময় চালক গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। ঠিক তখনই সহকারী মাসুক মিয়া ওয়াসিমকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বাসের পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হন ওয়াসিম। পরে সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

মামলা করবে না পরিবার: ওয়াসিম আফনান হত্যার ঘটনায় কোনো মামলা না করার ঘোষণা দিয়েছেন নিহতের পরিবারের সদস্যরা। নিহতের চাচা মফিজুর রহমান গতকাল বলেন, আমাদের সবার আদরের সন্তানটি চলে গেছে। আমাদের ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না, তাই মামলা করে কী করব? আমাদের ক্ষতিপূরণেরও দরকার নেই।

মৌলভীবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুহেল আহাম্মদ বলেছেন, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তাই পরিবারকে মামলা করতে অনুরোধ করা হবে। পরিবার রাজি না হলে পুলিশই বাদী হয়ে হত্যা মামলা করবে।

গ্রামের বাড়িতে দাফন: গতকাল দুপুরে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে ওয়াসিম আফনানকে সমাহিত করা হয়। এলাকাবাসী ছাড়াও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।