পণ্যবাজার

জ্বালানি তেল : ভারতে রফতানি স্থগিত করছে ভেনিজুয়েলা?

বণিক বার্তা ডেস্ক | ১৯:৫৯:০০ মিনিট, মার্চ ২১, ২০১৯

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা থেকে রফতানি হওয়া অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ভারত। চলমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটি ভারতের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি অব্যাহত রেখেছে। তবে আগামী দিনগুলোয় ভারতের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি স্থগিত করতে পারে দেশটি। ভেনিজুয়েলার তেলমন্ত্রী ম্যানুয়েল কুয়েভেদোর সঙ্গে বৈঠক শেষে এমন আভাস দিয়েছেন আজারবাইজানের শিল্প ও জ্বালানিমন্ত্রী পারভিজ শাহবাজোভ। চলমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সমর্থন জুগিয়ে চলায় ভেনিজুয়েলা ভারতের বদলে চীন-রাশিয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ কারণে দেশটি ভারতের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির রফতানি স্থগিত করতে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর রয়টার্স, অয়েলপ্রাইসডটকম ও সিএনএন।

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে বৈঠকে মিলিত হন ম্যানুয়েল কুয়েভেদো ও পারভিজ শাহবাজোভ। বৈঠক শেষে আজারবাইজানের জ্বালানিমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, ভেনিজুয়েলা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি খাতে বড় ধরনের সংস্কার এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে বলে তাকে জানিয়েছেন ম্যানুয়েল কুয়েভেদো। এর অংশ হিসেবে আগামী দিনগুলোয় ভারতের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি স্থগিত করতে পারে ভেনিজুয়েলা। এর বদলে দেশটি চীন ও রাশিয়ায় জ্বালানি পণ্যটির রফতানি বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট শুরুর আগে ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি হতো। তালিকায় এর পরই ছিল ভারতের অবস্থান। সংকট শুরুর পর ওয়াশিংটন ভেনিজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। দেশটির জ্বালানি তেল শিল্পের ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করা হয়। এমনকি ভেনিজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধে ভারতসহ মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করে ট্রাম্প প্রশাসন। এর পরও ভেনিজুয়েলা থেকে নগদ অর্থে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছিল নয়াদিল্লি।

এমন পরিস্থিতিতে ভারতের বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি স্থগিতে ভেনিজুয়েলা সরকারের পরিকল্পনার কথা শোনা গেল। তবে এ বিষয়ে ভেনিজুয়েলার পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এর আগে দেশটির ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর জন বোল্টন ভেনিজুয়েলা থেকে জ্বালানি তেল আমদানির বিষয়ে ভারতসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক করে দেন। ভেনিজুয়েলাবিষয়ক মার্কিন দূত এলিয়ট আব্রামস বলেন, ‘নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সখ্য বজায় রাখা, তাকে সহায়তা করা কোনো দেশের পক্ষেই উচিত নয়। আপনাকে অবশ্যই কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে হবে।’ এর পরই ভেনিজুয়েলার জ্বালানিমন্ত্রী দিল্লি সফর করেন। এ সময় ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন তিনি।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেশটির অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকরা এর পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, ভেনিজুয়েলার উত্তোলন খাতে ধারাবাহিক পতন বজায় রয়েছে। দেশটিতে জ্বালানি পণ্যটির দৈনিক গড় উত্তোলন কমতে কমতে ১২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে। ওপেকের আওতায় উত্তোলন হ্রাসের বাধ্যবাধকতার কারণে সামনে দেশটিতে জ্বালানি তেলের উত্তোলন আরো কমতে পারে। এর মধ্যেই দেশটিতে দেখা দিয়েছে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকট। ফলে উত্তোলন করা জ্বালানি তেল রফতানির বদলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগাতে পারে দেশটি।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সংকটে চীন ও রাশিয়া প্রেসিডেন্ট মাদুরোর পাশে দাঁড়িয়েছে। ভারত মাদুরোর সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখলেও রাজনৈতিক প্রশ্নে নীরবতা পালন করছে। বিপরীতে সংকট নিরসনে মাদুরোকে বড় অংকের ঋণ দিয়েছে মস্কো ও বেইজিং। এখন সহজে ঋণ পরিশোধের উপায় হিসেবে দেশ দুটিতে জ্বালানি তেল রফতানি আগের তুলনায় বাড়াতে চাইছে ভেনিজুয়েলা। এ কারণে দেশটি ভারতের বদলে চীন-রাশিয়ার বাজারের প্রতি ঝুঁকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে আগামী সপ্তাহেই মস্কো সফরে যাবেন ভেনিজুয়েলার জ্বালানিমন্ত্রী। মস্কোতে ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির দপ্তর স্থাপনের ব্যাপারে আলোচনা করবেন তিনি।