আন্তর্জাতিক খবর

হামলার আগেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে ইশতেহার পাঠিয়েছিলেন ব্রেন্টন

বণিক বার্তা অনলাইন | ১৬:৫৭:০০ মিনিট, মার্চ ১৬, ২০১৯

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে হামলার আগে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ৭৩ পৃষ্টার ইশতেহার পাঠিয়েছিল ট্যারান্ট ব্রেন্টন। হামলার ১০ মিনিট আগেই ওই ইশগেহারের কপি গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর অফিস। আজ শনিবার ব্রেন্টনের পাঠানো ইশতেহার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর অফিস। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের এক প্রতিবেদনে এই খবর জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ঠিকানায় আরও ৭০ জনের পাঠানো মেইলের সাথে ব্রেন্টনের ওই ইশতেহারটি ছিল। যাদের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে স্পিকারের পাঠানো মেইলও ছিল।

প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের ঠিকানায় পাঠানো এসব নথির মধ্যে বেশিরভাগ ছিল দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমের। তবে হেরাল্ড সেই তালিকা এখনও সংগ্রহ করতে পারেনি।

তবে ব্রেন্টনের ইশতেহার পেলেও হামলার আগে পর্যন্ত এটি খুলে দেখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, মেইল এমন সময় নিয়ে করা হয়েছিল যেন হামলাটা কোনোভাবেই ধামানো না যায়।

ব্রেন্টনের ইশতেহারের মেইলটি প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ মেইলে পাঠানো হয়েছিল। যেটি প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেন না। প্রধানমন্ত্রীর অফিস এটি নিয়ন্ত্রণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর অফিসের এক কর্মকর্তা নিয়ম অনুযায়ী ব্রেন্টনের মেইলটি খুলেছিলেন এবং পরে সেটি পার্লামেন্টারি নিরাপত্তা বিভাগে পাঠিয়ে দেন। পরে পার্লামেন্টারি নিরাপত্তা বিভাগ সেটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

হামলার আগেই টুইটারে দেয়া ৭৩ পৃষ্টার একটি ইশতেহারে সন্ত্রাসী হামলার আভাস দিয়েছিলেন কট্টর ডানপন্থি ব্রেন্টন। যেখানে তিনি দুই বছর আগে থেকে হামলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। আর ক্রাইস্টচার্চে হামলার সিদ্ধান্ত তিন মাস আগে নিয়েছেন বলে জানান।

২৮ বছর বয়সী ব্রেন্টন লিখেছেন, তিনি একটি মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন এবং তিনি তার দেশের মানুষের জন্য একটি মানসম্মত ভবিষৎ নিশ্চিত করে যেতে চান বলে উল্লেখ করেন তার ইশতেহারে।

এ হত্যাকাণ্ডের পূর্বাভাস দিয়ে ৭৩ পাতার ইশতেহারে তিনি লিখেছেন, তিনি মুসলমান এবং ধর্মত্যাগীদের ঘৃণা করেন। ধর্মত্যাগকারীদের তিনি রক্তের সঙ্গে প্রতারণাকারী হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, আমি ২০১১ সালে নরওয়ের ওসলোতে ৭৭ জনকে হত্যাকারী অ্যান্ডারর্স ব্রেইভিকসহ অন্যান্য বন্দুকহামলাকারীদের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছি। ডায়লান রুফসহ আরও অনেকের লেখা আমি পড়েছি। তবে সত্যিকার অর্থে তিনি নাইট জাস্টিসিয়ার ব্রেইভিকের কাছ থেকেই হামলার উৎসাহ পেয়েছেন।

গণহত্যার বিস্তারিত পরিকল্পনায় তিনি বলেন, অধিকাংশই দেখেন যে আমাদের ভূখণ্ডকে কখনোই অনুপ্রবেশকারীদের ভূখণ্ড হবে না। আমাদের মাতৃভূমি আমাদের এবং যতক্ষণ পর্যন্ত শেতাঙ্গরা জীবিত থাকবে, ততদিন তারা আমাদের ভূখণ্ড বিজয় করতে পারবে না। তারা কখনোই আমাদের লোকদের জায়গা দখল করতে পারবেন না।

তিনি বলেন, সংজ্ঞায়িত করলে এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা। কিন্তু দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এটি একটি পক্ষপাতমূলক হামলা বলেই আমি মনে করি। এ হামলার ঘটনায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্র সমর্থক ক্যানডিস ওউনসের কাছ থেকে অনুপ্রারিত হওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

ইশতেহারে যুবক বলেন, সার্বিকভাবে যিনি আমাকে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তিনি হচ্ছেন ক্যানডিস ওউনস। যখনই তিনি কথা বলেন, আমি বিমোহিত হয়ে যাই।

ব্রেন্টন বলেন, নিউজিল্যান্ডে হামলা করা তার পরিকল্পনায় ছিল না। কিন্তু তিনি মনে করেন এটাই সবার দৃষ্টি আকর্ষণের ভালো জায়গা বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, আমি মনে করি এখানে হামলা হলে সভ্যতার ওপর সত্যিকার হামলার বিষয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ হবে। সবাই জানবে বিশ্বের কোথাও নিরাপদ নয়। অনেক দূরবর্তী কোনো এলাকাও না। সবখানে আক্রমণকারীরা আছে। এমন কোনো জায়গা বাকি নেই যেখানে নিরাপত্তা আছে আর অভিবাসী মুক্ত পরিবেশ আছে।

লাখ লাখ ইউরোপীয় এবং দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন উল্লেখ করে ব্রেন্টন বলেন, আমরা আমাদের দেশের মানুষের অস্তিত্ব নিশ্চিত করতে কাজ করবো। আমরা আমাদের শ্বেতাঙ্গ শিশুদের ভবিষাৎ নিশ্চিত করতে কাজ করবো।

ক্রাইস্টচার্চের হামলাকে একটি প্রতিশোধের হামলা উল্লেখ করে ব্রেন্টন বলেছেন, প্রথাগতভাবে বিদেশীদের আক্রমণে লাখ লাখ ইউরোপীয় নাগরিক নিজ দেশে মারা যাচ্ছে। ইউরোপীয়দের ভূমি মুসলিম দেশ থেকে আসা অভিবাসী দখল করে নিয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাসী হামলায় হাজার ইউরোপীয় লোক প্রাণ হারিয়েছে।

এই হামলা ২০১৭ সালের স্টকহোমের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ হিসেবেও উল্লেখ করেন ব্রেন্টন। তিনি জানান, ওই হামলায় ১২ বছর বয়সী এব্বা আকারলান্ড নামের একটি মেয়ে নিহত হয়েছির। উজবিকিস্তান থেকে আসা এক শরণার্থী এই হামলা চালিয়েছিল। আর এব্বার মৃত্যু তাকেই হামলা করতে প্রথম উৎসাহ দিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এর আগে গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দেড়টার দিকে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বন্দুক নিয়ে হামলা করেন ব্রেন্টন। ভয়াবহ এই সন্ত্রাসী হামলায় তিন বাংলাদেশিসহ ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৮জন। তবে এই ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ।