প্রথম পাতা

বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা ছাড়াই বাজারজাত

খরচ বাড়বে, তাই ওষুধের মানের সঙ্গে আপস

আয়নাল হোসেন | ০১:৪৪:০০ মিনিট, মার্চ ১৫, ২০১৯

জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনের পর মান ঠিক আছে কিনা সেজন্য বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করে অধিকাংশ দেশ। বাংলাদেশেও রফতানিযোগ্য ওষুধের ক্ষেত্রে বিদেশে নিয়ে এ পরীক্ষা করছে কোম্পানিগুলো। তবে স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য উৎপাদিত ওষুধের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। মানের সঙ্গে আপস করছে কোম্পানিগুলো। খরচ বেড়ে যাবে, তাই বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা ছাড়াই স্থানীয় বাজারে ওষুধ বিক্রি করছে তারা।

বাংলাদেশে যেসব ওষুধ তৈরি হচ্ছে, তার সবই জেনেরিক। এ ওষুধ বাজারজাত করার আগে মূল অর্থাৎ রিসার্চ ওষুধের মতো সেগুলো কাজ করছে কিনা তা নির্ণয়ের জন্যই বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ যে ওষুধটি সেবন করা হলো, সেটি শরীরে যথাযথভাবে কাজ করছে কিনা বা অন্য কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করছে কিনা, এ পরীক্ষার মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়। যদিও দেশের কোম্পানিগুলোকে এ পরীক্ষা ছাড়াই স্থানীয় বাজারে ওষুধ বাজারজাতের অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করার মতো অবকাঠামোও তৈরি হয়নি দেশে।

বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা না করায় ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মীর মিসবাহউদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, যেকোনো কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধের গুণ-মান ঠিক আছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে অবশ্যই বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা দরকার। কোম্পানিগুলো যখন ওষুধ রফতানি করে, তখন বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করেই পাঠানো হয়। এমনকি আফ্রিকার কোনো দেশে ওষুধ পাঠালেও বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করতে হয়। তাহলে বাংলাদেশে যেসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে, তার বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা কেন হবে না, সে প্রশ্ন করেন তিনি।

বিশ্বের অনেক দেশই স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য ওষুধেরও বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধের বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে দেশটির ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। ইউরোপীয় দেশগুলোতেও ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (ইএমএ) এ পরীক্ষার পরই জেনেরিক ওষুধের ছাড়পত্র দেয়। এছাড়া জেনেরিক ওষুধের বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা দিয়েছে চীনের স্টেট ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়া।

বাংলাদেশে স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য উৎপাদিত ওষুধের ক্ষেত্রে এ পরীক্ষা কেন করা হচ্ছে না জানতে চাইলে ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এসএম শফিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, রফতানির ক্ষেত্রে আমাদের ওষুধের বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করাতে হয়। বিদেশেই এ পরীক্ষা করছে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করাতে হলে স্বাভাবিকভাবেই ওষুধের দাম বেড়ে যাবে। সব ক্ষেত্রে না হলেও দামি ওষুধগুলোর জন্য এ পরীক্ষা করা যেতে পারে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নির্দেশনা দিলে প্রতিষ্ঠানগুলো তা বাস্তবায়ন করবে। তবে রাতারাতি এটি হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার কারণে ওষুধের দাম বেড়ে গেলেও মানসম্পন্ন ওষুধপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। সেক্ষেত্রে বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করা হয়েছে, এমন ওষুধের আলাদা গ্রেডিং করা যেতে পারে। এ ধরনের ওষুধ তুলনামূলক বেশি দামে কিনলেও মানের বিষয়ে ক্রেতারা নিশ্চিত থাকতে পারবে। এ পরীক্ষা না করা হলে ওষুধটি সাবস্ট্যান্ডার্ড বা নিম্নমানের হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, জেনেরিক ওষুধ তৈরির পর যদি বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করা না হয়, তাহলে উৎপাদিত ওষুধটি নিম্নমানের হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া উৎপাদিত ওষুধ সঠিকভাবে রোগ নিরাময়ে কাজ করছে কিনা সে সন্দেহ দূর করতেও বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করা দরকার। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার বিষয়ে কোনো আইন বা বিধিমালা নেই। এ কারণে কোম্পানিগুলো পরীক্ষাটি এড়িয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষাটি করতে বড় অংকের অর্থ ব্যয় হয়। পাশাপাশি এ পরীক্ষার জন্য দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে।

তার পরও ভবিষ্যতে এ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক রুহুল আমিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যয়বহুল এ পরীক্ষার সুবিধা এখনো গড়ে ওঠেনি দেশে। তবে দেশীয় যেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ওষুধ রফতানি করছে, তাদের বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশে এ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হবে।

ওষুধের কাঁচামাল যেখানে তৈরি হচ্ছে, তা নিরাপদ প্রমাণ হওয়ার পরই বাজারজাত করার সুযোগ পায় এপিআই কোম্পানিগুলো। দেশে ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে জেনেরিক নামেই আমদানি করা হয়। দেশে আনার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নিজস্ব ব্র্যান্ডে বা নামে ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করে। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ওষুধের গুণগত মান সঠিক থাকছে কিনা তা পরীক্ষা না হওয়ায় নিম্নমানের ওষুধও বাজারজাত হচ্ছে। গুণগত মান ঠিক না থাকায় বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ার নজিরও আছে।

পরীক্ষাটির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই উদ্যোগ নিতে হবে বলে মনে করেন রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার। তিনি বলেন, যেকোনো ওষুধেরই বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষা প্রয়োজন। তবে এজন্য দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পেলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ পরীক্ষার উদ্যোগ নেবে।