শেষ পাতা

খাতুনগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার : কমিশনভিত্তিক মধ্যস্থতায় প্রতারণা বাড়ছে

আয়নাল হোসেন ও ওমর ফারুক | ০২:১৮:০০ মিনিট, মার্চ ১৪, ২০১৯

ভোগ্যপণ্যের বড় দুই বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার মৌলভীবাজার। বাজার দুটিতে বছর বছর ব্যবসায়িক প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। গত এক বছরেই বৃহৎ এ দুই বাজারের কমপক্ষে ১০ জন ব্যবসায়ী পাওনা পরিশোধ না করে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাদের কাছে বাজারের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় হাজার কোটি টাকা। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমে কমিশনের বিনিময়ে মধ্যস্থতা করছেন পাওনাদাররা। এতে প্রতারণা না কমে উল্টো বাড়ছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী প্রতারণার শিকার হয়েও আইনের আশ্রয় নিতে চান না। তাছাড়া এসব ঘটনা জানাজানি হলে প্রতারক ও প্রতারিত ব্যবসায়ীসহ পুরো বাজারের ভাবমূর্তিতে সংকট তৈরি হয়। বাজারের লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এসব ঘটনা সুরাহা করে ব্যবসায়ী সংগঠন। আইনি ব্যবস্থা না নেয়া কিংবা সমঝোতার ভিত্তিতে পাওনা বকেয়ায় ছাড় পাওয়ায় গা ঢাকা দেয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের প্রায় শতকোটি টাকা বকেয়া রেখে আত্মগোপনে গেছেন মেসার্স এসএন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী দেলোয়ার হোসেন। গত শনিবার থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তার।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গা ঢাকা দেয়া ব্যবসায়ী দেলোয়ারের কাছে বড় অংকের পাওনা আটকে গেছে খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক বিসমিল্লাহ গ্রুপের। দেলোয়ারের প্রতিষ্ঠান এসএন এন্টারপ্রাইজের কাছে সম্প্রতি বাকিতে দুই হাজার টন চিনি বিক্রি করেন বিসমিল্লাহ গ্রুপের কর্ণধার মো. জামাল হোসেন। এছাড়া খাতুনগঞ্জের মেসার্স আরএম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলমগীর পারভেজের ২০ কোটি টাকা, মেসার্স এম হোসেন ট্রেডার্সের মো. ইব্রাহিমের ৫ কোটি, মেসার্স আনিকা এন্টারপ্রাইজের ৩ কোটি ৮২ লাখ, মেসার্স হাজী মুনির আহমদ সওদাগরের ৪ কোটি ৯০ লাখ, মেসার্স এসবি চৌধুরীর ১ কোটি ২২ লাখ টাকাসহ আরো বহু ব্যবসায়ীর পাওনা আটকে গেছে।

এ ঘটনার পরও পাওনাদাররা আইনি ব্যবস্থা নেননি। কমিশনের ভিত্তিতে বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে।

ব্যবসায়ীদের পাওনা পরিশোধ না করে এক-দেড় মাস ধরে পলাতক রয়েছেন খাতুনগঞ্জের মেসার্স মাঈনুদ্দিন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মাঈনুদ্দিন। তার কাছে বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ীর ৫-৭ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ব্যবসায়ীর কাছে পাওনাদারদের মধ্যে বেশির ভাগই ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবসায়ী ও ভ্রাম্যমাণ (যেসব ব্যবসায়ীর নির্দিষ্ট কোনো কার্যালয় নেই) ব্যবসায়ী। এর মধ্যে মো. রাশেদের ৫০ লাখ, মো. আইয়ুবের ৩০ লাখ ও আব্দুর রাজ্জাকের ৪ লাখ টাকাসহ ২০-২৫ জন ব্যবসায়ীর পাওনা রয়েছে। এ ঘটনায়ও আইনের আশ্রয় নেননি পাওনাদাররা।

এর আগে গত ডিসেম্বরে ব্যবসায়ীদের প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বকেয়া রেখে উধাও হয়ে যান মৌলভীবাজার ও খাতুনগঞ্জের আরো দুই ব্যবসায়ী। এর মধ্যে একজন মৌলভীবাজারের মেসার্স এমএম ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আজাদ ও অন্যজন খাতুনগঞ্জের মেসার্স শফি ট্রেডার্সের মো. শাহ জামাল।

গত ৪ ডিসেম্বর বাজার থেকে উধাও হয়ে যান মৌলভীবাজারের আল রাফী মার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজাদ। তার কাছে খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বহু ব্যবসায়ীর প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বকেয়া আটকে আছে। এর এক সপ্তাহ পর উধাও হন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. শাহ জামাল। তার কাছে খাতুনগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ১০০ কোটি টাকা। দুজনই দীর্ঘদিন ধরে বাজারে চিনি, ভোজ্যতেল, গমসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করতেন।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার ব্যবসায়ীদের প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাওনা পরিশোধ না করে উধাও হন নিতাইগঞ্জের ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক। ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় পাওনা পরিশোধে সময় চেয়ে পরে কানাডা পালিয়ে যান এ ব্যবসায়ী।

গত বছরের মার্চে উধাও হন রাশেদুল আলম নামে খাতুনগঞ্জের আরেক ব্যবসায়ী। মাহমুদ ট্রেডিংয়ের এ স্বত্বাধিকারীর কাছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর প্রায় ৩০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে তেল, চিনি ও গমের ব্যবসা করতেন তিনি।

প্রতি বছরই ব্যবসায়ীদের পাওনা না মিটিয়ে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী স্থায়ীভাবে বিদেশে পালিয়ে যান। আবার অনেকে আপাতত গা ঢাকা দিয়ে পরে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের মধ্যস্থতায় বাজারে ফিরে আসেন। মধ্যস্থতার মাধ্যমে বাজারে ফিরে আসা ব্যবসায়ী পাওনাদারদের পাওনার চেয়ে কম টাকা দিয়ে বিষয়টি সুরাহা করতে পারেন। ফলে দেনা নিয়ে গা ঢাকা দেয়ার বিষয়টি রীতিতে পরিণত হয়েছে। 

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জামাল হোসেন বলেন, যখন কোনো প্রতারণা বা ব্যবসায়ীর উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটে, তখন পাওনাদাররা ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের দ্বারস্থ হন। ওই সময় পাওনাদার চান তার পাওনা আদায় করতে। অন্যদিকে গা ঢাকা দেয়া ব্যবসায়ী চান পাওনার চেয়ে কম টাকা দিয়ে বিষয়টি সুরাহা করতে। পরে ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতায় পাওনার বিষয়টি সুরাহা হয়। এরপর অনেক ব্যবসায়ী আবার বাজারে ফিরে আসেন।