সম্পাদকীয়

সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকাশে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন

২১:২৭:০০ মিনিট, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

লেখক, প্রাবন্ধিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। যুক্তরাজ্যের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। শিক্ষাজীবন কেটেছে রাজশাহী, কলকাতা, ঢাকা ও যুক্তরাজ্যের লিডস ও লেস্টারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। অবসর নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। এছাড়া পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, লেখক সংঘ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। প্রায় ১০০টি বই লিখেছেন তিনি। নতুন দিগন্ত নামে একটি সাময়িকীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। বণিক বার্তাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন শিক্ষা পরিস্থিতি, রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা, অর্থ পাচার, ডাকসু নির্বাচন, তরুণ সমাজ, বাংলা ভাষার চর্চা প্রসঙ্গে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ সরকার

বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। অথচ এটি প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। ডাকসু নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে একটি স্বাভাবিক ঘটনা। তাই এটি নিয়মিত ঘটনা হওয়া উচিত। কিন্তু এখন যেহেতু ২৮ বছর পরে ঘটতে যাচ্ছে, তাই কৌতূহল ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এবারের ডাকসু নির্বাচন কেমন হবে তা জানি না। তবে এটি শেষ নির্বাচন হওয়া উচিত হবে না। আশা করব, প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে থাকবে। এ নির্বাচনে কী ফলাফল হবে অর্থাৎ কারা জিতবে, সেটা অন্য কথা। তবে বিশ্ববিদ্যালয়কে তার স্বাভাবিক জীবনে উত্তরণের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসবে। এখন একটি নির্জীব পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে কোনো সাংস্কৃতিক তত্পরতা নেই, সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, খেলাধুলা নেই, হাজার হাজার শিক্ষার্থী উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হলকেন্দ্রিক। কিন্তু এখন হলগুলোর কোনো সাংস্কৃতিক জীবন নেই। হলগুলোয় যথাযথ পরিবেশ নেই। হতাশাগ্রস্ত, অত্যন্ত বিষণ্ন, ক্লান্ত একটি চিত্র দেখতে পাই, যেটি আগে আমরা কখনো দেখিনি। যখন আমি স্কুলের ছাত্র, আজিমপুর সরকারি কলোনিতে থাকতাম, তখন আমরা ডাকসু নির্বাচন হতে দেখেছি। সে সময় নির্বাচনটাকে আমাদের কাছে উৎসবের মতো মনে হতো। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছি বায়ান্ন সালে, ভাষা আন্দোলনের বছরে। আমি প্রথম বছরেই সলিমুল্লাহ হলের নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, অনাবাসিক ছাত্র হিসেবে। এটা আমার জীবনে একটি আনন্দের অভিজ্ঞতা। হলের বিতর্ক, নাটক, পত্রিকায় আমরা অংশ নিতাম। পত্রিকা সম্পাদনাও করেছি ছাত্রজীবনে। ওই জীবনটা ছিল একটি পরাধীন দেশে। সে সময় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমরা সংগ্রাম করছি, কিন্তু তার মধ্যেও একটি সাংস্কৃতিক বিকাশ ছিল, এখন যেটা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর বক্রাঘাত। ডাকসু নির্বাচন থেমে গেল, যখন কথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেশে এল। এরশাদের পতনের পরে যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এল, তার পরে আর নির্বাচন হলো না। আশা করছি ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে এ গুমটভাব কেটে যাবে এবং নতুন জীবনের তত্পরতা শুরু হবে এবং যারা নির্বাচিত হবে তারা পরবর্তীতেও যাতে নির্বাচিত হতে পারে সেজন্য চেষ্টা করবে বা তাদের দল যাতে আসতে পারে, সেজন্যও চেষ্টা করবে। এভাবে একটি বিকাশের সুযোগ হবে। সাংস্কৃতিক বিকাশ, রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে। শুধু রাজনীতিতে নয়, সর্বক্ষেত্রেই নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ছাত্রদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা বাড়াবে। পরীক্ষার ফলের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা নয়, আরো বড় একটি প্রতিযোগিতা হচ্ছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। কে খেলাধুলায় ভালো, কে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভালো, কে লেখে, ভালো নাটক করে, কে ভালো অভিনয় করে, গান গায়— এসব বিষয়ের চর্চা হবে। আমি আশা করব প্রতি বছর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, নির্দিষ্ট সময়ে হবে এবং স্বাভাবিকভাবে হবে।

ডাকসু নির্বাচন কি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে?

অবশ্যই এর প্রভাব পড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আমরা আশা করব সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও ছাত্র সংসদ দরকার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লিখে দেয়— ‘এখানে রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত’। রাজনীতি ও ধূমপান এক জিনিস নয়। ছাত্র সংসদ কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। ছাত্র সংসদ সাংস্কৃতিক অনুশীলনের একটি ক্ষেত্র। বিশ্ববিদ্যালয় কারিগর তৈরির কারখানা নয়, একজন ছাত্রের সর্বাঙ্গীণ যে বিকাশ, সে বিকাশ একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের দান। তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তো বটেই, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও ছাত্র সংসদ দরকার।

উন্নতি করার বদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে যাচ্ছে। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

এ অবস্থার জন্য যে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় একা দায়ী তা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় সমাজেরই অংশ। সমাজে যে হতাশা বিরাজ করছে, সে হতাশাই এখানে এসেছে। আজকে এই যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আত্মহত্যা করছে, সেটি এরই প্রতিফলন। গত কয়েক মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনার পেছনে হতাশা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কিন্তু একজন সুযোগপ্রাপ্ত ব্যক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা একটি সুযোগ। অনেক প্রতিযোগিতা পার হয়ে, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অভিভাবকদের অনেক আশা ধারণ করে শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছে। এরপর যদি সে আত্মহত্যা করে, তবে বুঝতে হবে তার মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। এ হতাশার কারণটা কী? হতাশার কারণ হচ্ছে বাইরে তার জন্য কোনো আশা নেই, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলে তার সামনে কোনো কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই। আমাদের দেশে যে উন্নতি হচ্ছে, তা ফাঁপা উন্নতি। দেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। আমাদের দেশের উন্নতি মেহনতি মানুষের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের কৃষক, শ্রমিক, বিদেশে যারা কাজ করেন, তাদের শ্রমের ওপর ভর করে এ উন্নতি ঘটছে। কিন্তু এ উন্নতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বিনিয়োগ করছে না, উৎপাদন বাড়াচ্ছে না। বেকারত্ব হতাশা তৈরি করছে। হতাশার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে বিচ্ছিন্নতা, এখন প্রত্যেকে নিজের কথা ভাবে। ছাত্র সংসদের কার্যক্রম এ বিচ্ছিন্নতা দূর করার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ। কাজেই একদিকে হতাশা, আরেকদিকে বিচ্ছিন্নতা, এ দুটোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রয়েছে। ফলে ছাত্রদের পড়াশোনার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের জন্য বাইরে কাজ নেই, ভেতরে তারা একা একা, তাদের কোনো সঙ্গী নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির কথা আমরা আগে কখনো শুনতাম না। এখন সেটাও হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বিপুলসংখ্যক মেয়ে পড়াশোনা করে। আমাদের ইংরেজি বিভাগে প্রথম বর্ষে ১০ জন ছাত্র ছিলাম, একজন মেয়ে, নয়টা ছেলে। এখন তো অনুপাত ৫০-৫০ চলে এসেছে। কিন্তু মেয়েরা নিরাপদে নেই, তারা হয়রানির শিকার হয়। এ পরিবেশ তাদেরকে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে না। এটি ছাত্রদের দিক। আর শিক্ষকদের দিক হচ্ছে, তারা যে প্রমোশনগুলো পান, সেটা তারা গবেষণা না করেই পান। গবেষণা না করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন কখনই সম্ভব হবে না এবং সে গবেষণা হতে হবে সৃষ্টিশীল। কিন্তু সে ধরনের গবেষণা এখন হচ্ছে না। প্রকাশনারও দরকার, কিন্তু সে প্রকাশনা তো হচ্ছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলি। এখানে প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে, কিন্তু তেমন একটা প্রকাশনা নেই। প্রকাশনা হচ্ছে খুব সামান্য। আমাদের এখানে অনুবাদের জন্য প্রতি বছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে, কিন্তু কোনো অনুবাদ হয় না। মানোন্নয়নের জন্য আমাদের গবেষণা করতে হবে এবং অনুবাদ করতে হবে। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান হচ্ছে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা কখনই উচ্চমানের হবে না, গভীর হবে না, সৃষ্টিশীল হবে না, যদি সেটি মাতৃভাষার মাধ্যমে না হয়। এ চ্যালেঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণ করার কথা ছিল, কিন্তু করেনি। এজন্য আমাদের বাংলায় লিখতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের অনুবাদ করতে হবে। বিভিন্ন ভাষায় যে জ্ঞানের বই, সাহিত্যের বই, বিজ্ঞানের বই লেখা হয়েছে, তা অনুবাদ করতে হবে। সেগুলো আমরা করছি না। কাজেই এ শিক্ষাটা অনেকটা কৃত্রিম শিক্ষা এবং কৃত্রিম জিনিস তো বেশি উচ্চতায় উড়তে পারে না। মৌলিক বইও তেমন লেখা হচ্ছে না, অনুবাদও হচ্ছে না। এজন্য আমরা এগোতে পারছি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়মিত উঠছে। অনেক শিক্ষক বিভিন্ন জায়গা থেকে কপি-পেস্ট করে গবেষণাপত্র তৈরি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় বা যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ভর করে শিক্ষকের ওপর। শিক্ষক ছাড়া তো শিক্ষার মান নেই। কিন্তু একজন শিক্ষকের যোগ্যতা কী? প্রথম যোগ্যতা ডিগ্রি থাকবে, দ্বিতীয় তার মানসিকতা দেখতে হবে। বিচ্ছিন্ন, অহংকারী, আত্মকেন্দ্রিক কিনা, তা দেখতে হবে। শিক্ষক হতে হলে ছাত্রের ব্যাপারে আগ্রহ থাকতে হবে, শিক্ষাদানের ব্যাপারে আগ্রহ থাকতে হবে। অর্থাৎ মেধা ও আগ্রহ দুটোই থাকতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা আসবেই না, দলীয় বিবেচনা একেবারে আগ্রাহ্য। রাজনৈতিক মনোনয়ন দেয়ার কথা আমরা আগে কখনো শুনতাম না। আমাদের সময় এটি একেবারেই ছিল না। আমাদের সময় যেটি আপত্তিকর ছিল তা হলো, পুলিশের রিপোর্ট। এখন শুধু পুলিশের রিপোর্ট নয়, প্রার্থী বা পরিবারের অন্য সদস্যরা কে কী করেছেন, তাও বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু এগুলো আনা একেবারেই উচিত নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনো বিশ্ববিদ্যালয় হবে না, যদি মেধা ও আগ্রহের ভিত্তিতে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া হয়। অন্য চাকরি পায়নি বলে শিক্ষকতা করতে আসা, এটা হবে না। যিনি শিক্ষকই হতে চান, তাকেই নির্বাচন করতে হবে। শিক্ষক হওয়ার জন্য ভেতরে আগ্রহ থাকতে হবে এবং সামাজিক মানুষ হতে হবে, শিক্ষক কোনো বিচ্ছিন্ন মানুষ নন। সব পেশারই নির্দিষ্ট চরিত্র থাকে, শিক্ষকতারও রয়েছে।

শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও অন্যান্য বিষয়ে জানতে চায়। শিক্ষার্থীদের চাহিদা নতুন শিক্ষকরা কতটা পূরণ করতে পারছেন?

নতুন শিক্ষকরা এসেছেন একটি বিশেষ পরিবেশ থেকে। তারা তো ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এসেছেন, যেখানে ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন হয়নি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মেলামেশার জায়গাটা শুধু ক্লাসরুমে নয়, মেলামেশার জায়গাটা হচ্ছে ক্লাসরুমের বাইরেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল। একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক মানে হলো শুধু ক্লাসরুমে আবাসিক নয়, হলগুলোয়ও সাংস্কৃতিক জীবন থাকবে, পাঠাগার থাকবে, মিলনায়তন থাকবে, যেখানে অনুশীলন হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষক কোনো না কোনো হলের সঙ্গে সংযুক্ত। কেউ কেউ আবাসিক শিক্ষক, অন্যরাও হলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। হলের সাংস্কৃতিক জীবনে তাদের অংশগ্রহণ করা উচিত। তারা সেটা করছেন না। ছাত্র সংসদ না থাকায় মেলামেশার কোনো সুযোগ নেই। এক বিভাগের শিক্ষককে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা চেনে না। শিক্ষকরা কে কী নিয়ে কাজ করছেন, তা জানেন না।

বিশ্ববিদ্যালয় তো কোনো বিভাগকেন্দ্রিক নয়। আবাসিকতার সঙ্গে দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য যুক্ত ছিল তা হলো, টিউটোরিয়াল সিস্টেম। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউটোরিয়াল সিস্টেম ছিল একটি আকর্ষণীয় বিষয়। যেখানে ক্লাসে যা পড়ানো হয়, তা ছাত্ররা কতটা বুঝল, সেটার পরীক্ষা হয় এবং তাদের জানা যদি অসম্পূর্ণ থাকে, তবে তারা সে অনুশীলনের মধ্য দিয়ে জানতে পারে। এখন এটা নেই। আগে অনার্স কোর্স ছিল তিন বছরের। দ্বিতীয় বছরে গিয়ে সাবসিডিয়ারি দেয়া, তৃতীয় বছরে গিয়ে অনার্স দেয়া— এই ছিল নিয়ম। পরে কোর্স সিস্টেম করা হয়। এটি করা হয় ছাত্রদের ব্যস্ত রাখার জন্য, জ্ঞান দেয়ার জন্য নয়। জিয়াউর রহমানের সময় এটা করা হয়েছিল যেন ছাত্ররা রাজনীতিতে জড়িয়ে না পড়ে, তারা যেন সবসময় পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তিন বছরের কোর্সকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে। আমাদের সময় তৃতীয় বর্ষে যখন গেছি, তখন প্রথম বর্ষে যে বইটি পড়েছি, তা নতুন করে পড়তাম, যেহেতু পরীক্ষা দিতে হবে এবং নতুন করে বুঝতাম। এখন প্রথম বছরের জ্ঞান নিয়েই শিক্ষার্থীরা চলে যাচ্ছে, তাদের জ্ঞানের বিকাশ হচ্ছে না। প্রথম সেমিস্টারের বইপত্র ছাত্ররা ফেলে দিচ্ছে, বিক্রি করে দিচ্ছে। কোর্সের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক থাকছে না। সাবসিডিয়ারি ক্লাসে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হতো, অন্য বিভাগের শিক্ষকরা সেখানে পড়াতেন। আমি ইংরেজি বিভাগে পড়ছি, কিন্তু আমি আবার অর্থনীতির ক্লাসও করেছি। অর্থনীতির শিক্ষকের সঙ্গে আমার জানাশোনা হচ্ছে, আবার ওইখানে পলিটিক্যাল সায়েন্সের যে ছাত্র পড়ে, তার সঙ্গেও আমার দেখা হচ্ছে। ওটা ভেঙে দিয়ে একটা বিভাগের মধ্যেই যে সাবসিডিয়ারি নিয়ে আসা হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের গণ্ডিটা একেবারেই সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষকদের আগ্রহ বেশি, তারা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বেশি সময় দিতে চান না, এমন অভিযোগও নতুন নয়।

এটা দুর্ভাগ্যজনক। আগে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম, তখন অন্য কথা ভাবতামই না, প্রাইভেট টিউশনের কথা তো অকল্পনীয় ছিল। অন্য একটি চাকরি করব, তাও অকল্পনীয় ছিল। এখন আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি, যা পুঁজিবাদী; যে সমাজ টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না, মুনাফা ছাড়া তার কোনো মূল্যবোধ নেই। মুনাফা করার জন্য সবাই ব্যস্ত। শিক্ষকরাও এ আদর্শে দীক্ষিত। তারাও মনে করেন, তাদের যে মর্যাদা সেটা জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে না, শিক্ষার্থীদের উপকারের ওপর নির্ভর করে না, মর্যাদা অর্থ উপার্জনের ওপর নির্ভর করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কারণে এটা তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে একজন শিক্ষকের এর বাইরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। পরিবেশটাই হচ্ছে মুনাফালোভী, মুনাফালোলুপতার কারণে শিক্ষকরাও এর পেছনে ছুটছেন। শিক্ষকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে নগদ টাকা পাচ্ছেন, কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি আছে বলেই। এটা না থাকলে ওখানে তাদের দাম থাকত না। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটেছে সমাজে, সেজন্য ক্লাসরুমের চেয়ে কোচিং সেন্টার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিকীকরণের একটি প্রতিফলন ঘটে যখন শিক্ষকদের অনেকেরই আনুগত্য দেখা যায় যেখানে তিনি চাকরি করেন সেখানে নয়, বরং যেখানে তিনি আরেকটি কাজ করতে পারেন, যেটা অনেকটা প্রাইভেট টিউশনির মতো, সেখানে। এটা স্কুলেও হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পড়ানোর চেয়ে কোচিংয়ে পড়ানোতে বেশি আগ্রহী। ওই ঘটনাটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গায় নিয়ে এলে দেখা যাবে শিক্ষকের ক্লাসরুমে পড়ানোর চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ানোয় বেশি আগ্রহ।

ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের চেয়ে চাকরির বইয়ের প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

এটা খুবই মারাত্মক ব্যাপার। শিক্ষা শেষে চাকরি করবে, কিন্তু চাকরির জন্য তো শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেনি। এর পেছনে প্রধান কারণ কর্মের সংস্থান নেই। সেজন্য শিক্ষার্থীরা চাকরির বাইরে অন্য কোনো কিছু ভাবতে পারে না। ব্রিটিশ আমলে একবার এক চ্যান্সেলর, যিনি গভর্নর ছিলেন, এক কনভোকেশনে বক্তব্যে বলেন, ‘আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসা করি, লেখাপড়া শেষে তুমি কী করবে? উত্তর পাই, সার্ভিস। সার্ভিস মানে সেবা নয় কিন্তু, সার্ভিস মানে হচ্ছে চাকরি। তিনি ঠাট্টা করেই বলছেন, সে চাকর হতে চায়, সে কোনো বড় জায়গায় যেতে চায় না।’ ওই মানসিকতাটাই রয়ে গেছে। আমরা চাকরি ছাড়া অন্য কোনো কিছু ভাবতে পারি না। কর্মের অন্য ক্ষেত্র তেমন বিকশিত হয়নি, কর্মের সুযোগ সেভাবে তৈরি হয়নি বা উদ্যোগ যে নেবে একজন তরুণ, সে পরিবেশও নেই। গোটা ব্যবস্থাই মুনাফাকেন্দ্রিক। আমরা পড়াশোনা করছি চাকরি পাওয়ার জন্য, তাই পড়াশোনার আগ্রহ শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক। কিন্তু বিসিএস বা সরকারি চাকরি কতজন পাবে, বিপুলসংখ্যক তো বেকার থেকেই যাচ্ছে।

তরুণদের মধ্যে এভাবে হতাশা তৈরি হলে সমাজে কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কিন্তু কর্মসংস্থান তো রাষ্ট্র করতে পারছে না। আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল জায়গা কী? সেটি হচ্ছে শ্রম। শ্রমের ওপর ভিত্তি করে উন্নতি হচ্ছে। এত দ্রুত ধনী হওয়া অন্য দেশে সম্ভব নয়। এত বেশিসংখ্যক ধনী হওয়াও অন্য দেশে সম্ভব নয়। দ্রুত ধনী হচ্ছে, বেশিসংখ্যক ধনী হচ্ছে, কিন্তু দেশের জনসংখ্যার তুলনায় এরা খুবই নগণ্য। বাকিরা তো বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি বাদ দিয়ে কোনো জীবন ভাবা যায় না। অল্প কয়েকজনের উন্নতিতে বৈষম্য বাড়ছে। আমাদের সম্পদ যুগে যুগে পাচার হয়েছে। আমাদের সম্পদ মোগলরা নিয়ে গেছে দিল্লিতে, ইংরেজরা নিয়ে গেছে লন্ডনে, এখন বাংলাদেশী ধনীরা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পাচার করছে, সেখানে তারা বসবাস করছে, সেখানে তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। বাংলাদেশে তাদের অবস্থান হচ্ছে পাচারকারীর। পাকিস্তান যুগেও আমাদের সম্পদ রাওয়ালপিন্ডিতে চলে গেছে। অর্থাৎ সম্পদ পাচার হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। এ দেশের কোনো ভবিষ্যৎ আমরা দেখতে পাচ্ছি না এ অর্থে যে, একটা পরিবর্তন না ঘটলে এ ব্যবস্থা চলতেই থাকবে এবং এ ব্যবস্থার শিকার আমরা সবাই হব।

তরুণদের হতাশা, আত্মহত্যার প্রবণতার জন্য সমাজ কতটা দায়ী?

অনেক তরুণই আত্মহত্যা করছে না, কিন্তু তারাও আত্মহত্যার প্রান্তে পৌঁছে গেছে। গোটা সমাজে যে উন্নতি হচ্ছে, সে উন্নতি মানুষকে কোনো আশা দিচ্ছে না। অল্প মানুষের উন্নতি হচ্ছে, এটা সম্পদ পাচারের উন্নতি। যেকোনোভাবে টাকা-পয়সা উপার্জন করে বিদেশে পাচার করে দেয়া হচ্ছে। এই যে ব্যাংকের ঋণখেলাপি, রিজার্ভ চুরি, শেয়ারবাজার থেকে টাকা লুণ্ঠন হলো, এগুলো সব বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। এখানে তো শোষণ চলছে, এ শোষণ হচ্ছে পুঁজিবাদী শোষণ, এখানকার সম্পদ বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং অপচয় হচ্ছে ভোগবিলাসে। সমাজ এখন ভোগলিপ্সু, যার চরম প্রমাণ ধর্ষণ। গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ, বাসে ধর্ষণ, ঘরে ঢুকে ধর্ষণ—কোনোটাই বাদ নেই। (চলবে)