সম্পাদকীয়

অবলোপনের নতুন নীতিমালা নিয়ে মুডি’সের পর্যবেক্ষণ : শিথিল নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন

০০:০০:০০ মিনিট, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৯

সম্প্রতি ব্যাংক খাতের প্রধান সমস্যা খেলাপি ঋণ কমানোর একটা সহজ পথ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবলোপনের জন্য এখন আর আগের মতো শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে না। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনে মামলা করতে হবে না। এতদিন মামলা না করে অবলোপন করা যেত ৫০ হাজার টাকা। ঋণ অবলোপন নীতিমালায় শিথিলতা এনে এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। অবলোপন নীতিমালা কার স্বার্থে, লাভবান হবে কারা—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপির ঝুঁকি আরো বাড়বে। এটি খেলাপিদের অনুকূলে এক পদক্ষেপ, এতে তারা শক্তিশালী হবে। ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কিন্তু স্থিতিপত্র দেখতে অনেকটা হূষ্টপুষ্ট থাকবে। দীর্ঘদিন অনাদায়ী বা তিন বছরের বেশি সময় খেলাপি থাকা ঋণ অবলোপনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি মুডি’স। তারা বলছে, ব্যাংকগুলোর সঞ্চিতি সংরক্ষণ নীতি, দুর্বল সম্পদ ব্যবস্থাপনা, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি ও ক্ষুদ্রঋণ অতি সামান্য হওয়ায় নতুন নীতিমালা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না। মুডি’স বলেছে, ঋণ অবলোপনের জন্য ব্যাংকগুলোকে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর চলতি মুনাফা ও মূলধনের ওপর চাপ বাড়বে। আবার ঋণ পুনর্গঠন ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের তথ্য ব্যাংকের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে পৃথকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনে আগ্রহী হবে না।

ব্যাংক ব্যবস্থায় মন্দ মানে শ্রেণীকৃত খেলাপি ঋণ স্থিতিপত্র থেকে বাদ দেয়াকে ঋণ অবলোপন বলে। যদিও এ ধরনের ঋণগ্রহীতা পুরো টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তা প্রকৃত অর্থে খেলাপি ঋণ। ২০০৩ সাল থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপন করে আসছে। ৫০ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপনের হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সুদসহ অবলোপনের এ অংক আরো অনেক বেশি হতে পারে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোয় ৯৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। অবলোপন বিবেচনায় নিলে ব্যাংক খাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। বেশির ভাগ ব্যাংক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। কাগজ-কলমে ব্যাংকের স্বাস্থ্য ভালো দেখে সাধারণ মানুষ শেয়ার কিনবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলবে। এতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খেলাপিদের অনুকূলে সহায়ক নীতিমালা তৈরিতে বেশ সৃজনশীল পদক্ষেপ নিতে পিছিয়ে থাকে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর আগে একাধিক দফায় অবলোপন নীতিমালা শিথিল করার মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো দেখানোর চেষ্টা চালানো হয়েছে। এতে সাময়িক উপকার মিললেও খেলাপি ঋণ আদায় হয়নি; বরং খেলাপি ঋণ নিয়ে লুকোচুরির খেলায় আর্থিক খাত আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঋণ অবলোপনের কারণে সরকারের কর আদায় বাধাপ্রাপ্ত হয়, কারণ ব্যাংকগুলো অবলোপনের কারণে সৃষ্ট ব্যবসায়িক ক্ষতির জন্য কর অব্যাহতি পায়। ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডাররা বঞ্চিত হন ডিভিডেন্ড থেকে, কারণ অবলোপনের প্রথম শর্তই হচ্ছে মুনাফা থেকে সরিয়ে মন্দ ঋণের বিপরীতে সংস্থান সৃষ্টি করা। এতে বার্ষিক ডিভিডেন্ডের হার কমে যায়। ব্যাংকের সুদহারের ওপরও অবলোপনের বিরূপ প্রভাব পড়ে। অনাদায়ী মন্দ ঋণের পরিমাণ বেশি হলে ব্যাংকের তহবিল খরচ (কস্ট অব ফান্ড) বেশি থাকে, ফলে আমানতের ওপর কম সুদ ও ঋণের ওপর সুদহার বাড়াতে হয়। এতে আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হন। এভাবে চলতে থাকলে ব্যাংকিং খাত আরো নাজুক হয়ে পড়বে। প্রথমত, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেয়া পরিচালনা পর্ষদকে দলনিরপেক্ষ করা দরকার। এরপর প্রয়োজন প্রতিটি কেলেঙ্কারির হোতাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া। তারপর খেলাপিদের নতুন করে ঋণদান বন্ধ করা উচিত। এ ব্যবস্থা সম্পন্ন হওয়ার পর খেলাপি ঋণ উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংক পরিচালনার নীতি অব্যাহত থাকলে ঘটে যাওয়া অনিয়মই বাড়তে থাকবে। অর্থনীতিকে ব্যাংকিং খাত পতনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে হলে তাই প্রধানত সুশাসন প্রতিষ্ঠা দরকার।