প্রথম পাতা

ঢাকার বাতাসের মান আরো খারাপ হয়েছে

তাওছিয়া তাজমিম | ০১:১৯:০০ মিনিট, জানুয়ারি ১১, ২০১৯

কয়েক বছর ধরেই ঢাকার বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার উপস্থিতি সহনীয় মাত্রার উপরে রয়েছে। ক্ষতিকর বস্তুকণার এ উপস্থিতি না কমে উল্টো বাড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মাত্রা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের উপস্থিতিও।

বায়ুর মান পরীক্ষায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (সিএএসই) প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালের আটটি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশন (সিএএমএস) স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে তিনটি রয়েছে ঢাকায়। স্টেশনগুলো থেকে পাঠানো তথ্য সংরক্ষিত হয় রাজধানীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় সার্ভারে। তার ভিত্তিতে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে অধিদপ্তর। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের শেষ কয়েক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দূষণের মাত্রা বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাতাসে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ২.৫। ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের অতিক্ষুদ্র এসব বস্তুকণার সহনীয় মাত্রা প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। যদিও ঢাকার বাতাসে পাওয়া গেছে এর চেয়ে বেশি মাত্রায়।

সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে বছরের শেষদিকে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। দূষণের মাত্রা জানতে তাই পরিবেশ অধিদপ্তরের গত দুই বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ১১৭, ১১০ ও ১১৩ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের অক্টোবরে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা রেকর্ড করা হয় প্রতি ঘনমিটারে সর্বোচ্চ ১৫১ দশমিক ৮১ ও ১১৭ দশমিক ৬৭ মাইক্রোগ্রাম। গড় হিসাবে যার পরিমাণ যথাক্রমে ৭৫ দশমিক ৩৮ ও ৮৪ দশমিক ২৭ মাইক্রোগ্রাম।

২০১৭ ও ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ঢাকার বাতাসে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৯২ দশমিক ৮, ২১১ ও ২৬৬ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের একই সময়ে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকার বাতাসে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ বস্তুকণার সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া যায় প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২০৪ ও ২২৬ মাইক্রোগ্রাম। তথ্য না থাকায় মাসটিতে সংসদ ভবন এলাকার বাতাসে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা জানা যায়নি। তবে এ দুই এলাকার বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণার যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সহনীয় মাত্রার চেয়ে তো বটেই, ২০১৭ সালের চেয়েও অনেক বেশি।

বাতাসে সহনীয় মাত্রার অতিরিক্ত অতিসূক্ষ্ম এ বস্তুকণা স্বল্প মেয়াদে মাথাব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ নানা ব্যাধির জন্য দায়ী বলে জানান চিকিৎসকরা। এর প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস ক্যান্সার, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে মনে করেন তারা।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি শ্বাসতন্ত্রের রোগ হয়। হাঁপানি রোগী হলে তাদের হাঁপানি বেড়ে যায়। আবার অনেকে নতুন করে হাঁপানি, শ্বাসতন্ত্রের অ্যালার্জি, হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত হয়। যক্ষ্মার মতো রোগগুলো বায়ুদূষণের কারণে বেড়ে যায়। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বেড়ে যায় নবজাতক ও শিশুদেরও। ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী বায়ুদূষণ।

বাতাসে ১০ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম ব্যাসের বস্তুকণাকে বলা হয় পিএম ১০। পিএম ২.৫-এর মতো ঢাকার বাতাসে পিএম ১০-এর মাত্রাও আগের চেয়ে বেড়েছে। জাতীয়ভাবে বাতাসে পিএম ১০-এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ধরা হয় প্রতি ঘনমিটারে ১৫০ মাইক্রোগ্রাম। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবরে ঢাকার ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় এসব বস্তুকণার সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ১৯০ ও ২১০ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে ২০১৮ সালের অক্টোবরে উভয় এলাকায়ই বাতাসে পিএম ১০-এর উপস্থিতি বেড়েছে। এ সময় ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় পিপিএমের সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২৫৫ দশমিক ৯০ ও ২৩৪ দশমিক ৫২ মাইক্রোগ্রাম। ২০১৭ সালের অক্টোবরে সংসদ ভবন এলাকায় পিএম ১০-এর উপস্থিতিসংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে গত বছরের একই সময় এখানে এর সর্বোচ্চ উপস্থিতি পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটারে ১১৮ দশমিক ৮০ মাইক্রোগ্রাম।

এ দুই বছরের নভেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বরে ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় পিএম ১০-এর সর্বোচ্চ উপস্থিতি ছিল প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ২৮৬ ও ৪৩৯ মাইক্রোগ্রাম। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে যথাক্রমে ৩১৭ ও ৫১৩ মাইক্রোগ্রাম। এক্ষেত্রে সংসদ ভবন এলাকায় ২০১৭ সালের তথ্য না পাওয়া গেলেও ২০১৮ সালের নভেম্বরে সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ১০-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে ১৭৬ মাইক্রোগ্রাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণের জন্য মূলত দায়ী ইটভাটা ও নির্মাণকাজ। ঢাকা মহানগরীর আশপাশে অনেক এলাকায় ইটভাটা রয়েছে। ইটভাটার কারণে বাতাসে সূক্ষ্ম নানা ধরনের ধূলিকণা মিশে যায়। নির্মাণকাজের সময় নিয়ম না মেনে মাটি, বালুসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী দীর্ঘদিন যত্রতত্র ফেলে রাখা, রাস্তার দু’পাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা সর্বোপরি যানবাহনের কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে তোলে। ফলে বাড়ছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা।

এ দূষণে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় পড়ছে শিশুরা। ঢাকা শহরের ছয়টি বিদ্যালয়ের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা নিয়ে ২০১৬ সালে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির আরবান ল্যাব। ফলাফলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলোর ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুস পূর্ণমাত্রায় কাজ করছে না। তাদের ফুসফুস ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ করছে।

গবেষক দলের সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হাবিব। জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রাজধানীর ফার্মগেট এলাকার ছয়টি বিদ্যালয়ের চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। ভয়ংকর বিষয় হলো, ২৫ শতাংশ শিশুর ফুসফুসের কার্যকারিতা শতভাগ নেই। কারো ফুসফুসের কার্যকারিতা ৬৫, কারো ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এ শহরের শিশুরা তাদের ফুসফুসের পূর্ণ কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে। মূলত বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা ফুসফুসের কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি ঢাকা মহানগরীর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেস্ক (একিউআই) ৩৬২, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। একিউআই ০-৫০ হলে তাকে ভালো ধরা হয়। ৫১-১০০ সহনীয়, ১০১-১৫০ সতর্কতামূলক, ১৫১-২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১-৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০১-৫০০ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।

গত বছর নির্মাণকাজ বেশি হওয়ায় এর আগের বছরের তুলনায় ঢাকার বাতাসে দূষণের মাত্রা বেড়েছে বলে ধারণা করছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ইটভাটা ও নির্মাণকাজের কারণে মূলত ধূলিকণা বেশি বাতাসে ছড়ায়। সনাতন পদ্ধতির ইটভাটাকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরির বিকল্প হিসেবে অপোড়ানো পদ্ধতি ব্লকের দিকে যাওয়া। ইট প্রস্তুত আইন ২০১৩ গত নভেম্বরে সংশোধন করা হয়েছে। ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক পদ্ধতিকে যাতে প্রমোট করা হয়, আইনের বিভিন্ন ধারায় তা সংযোজন করা হয়েছে। বড় চিন্তার জায়গা হলো নির্মাণকাজ। যে যেভাবে পারছে নির্মাণকাজ করছে। এজন্য একটা নীতিমালা তৈরির চেষ্টা চলছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নির্মাণকাজ কীভাবে চলবে, সেজন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। নীতিমালা যাতে সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় সে ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।