খেলা

রানের জন্য হাহাকার

নাজমুল হক তপন | ২১:৩৭:০০ মিনিট, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

‘মিরপুরের উইকেট টি২০-এর জন্য আদর্শ নয়। এখানে রান তুলতে সংগ্রাম করতে হয় ব্যাটসম্যানদের। এ ফরম্যাটে রান বাড়াতে হলে ভালো উইকেট তৈরিতে মনোযোগী হতে হবে’, এবারের ষষ্ঠ বিপিএল শুরুর আগে কথাগুলো বলেছিলেন রংপুর রাইডার্স অধিনায়ক মাশরাফি মর্তুজা। তারকা মেলার দিক থেকে অতীতকে ছাপিয়ে গেছে এবারের বিপিএল। দেশীয় সেরাদের সঙ্গে বিশ্বসেরা টি২০ স্পেশালিস্টদের বড় অংশই আছে এবারের আসরে। কিন্তু দর্শকদের প্রত্যাশা মিটছে না। কেননা টি২০ মানেই চার-ছক্কার প্রদর্শনী। আর মিরপুরের উইকেটে চার-ছক্কা প্রদর্শনীর বদলে উইকেটে টিকে থাকার কৌশল নিতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যাটসম্যানরা।

চলতি আসরে গত চার দিনে এখন পর্যন্ত ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে আটটি। অর্থাৎ ১৬ ইনিংস শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২০০ রানের ইনিংস দেখার সৌভাগ্য হয়নি ক্রিকেটপ্রেমীদের। একশর নিচে অলআউট হওয়ার ঘটনা ঘটেছে তিনবার। উদ্বোধনী ম্যাচে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে গতবারের চ্যাম্পিয়ন রংপুর রাইডার্স গুটিয়ে যায় মাত্র ৯৮ রানে। এত ছোট স্কোর টপকাতে গিয়েও গলদঘর্ম হতে হয় ভাইকিংসকে। ১৮.১ ওভার পর্যন্ত খেলে ৩ উইকেটে জেতে দলটি। মঙ্গলবার এবারের টুর্নামেন্টের ষষ্ঠ ম্যাচে রাইডার্সের বিপক্ষে মাত্র ৬৩ রানে অলআউট হয়েছে ব্যাটিংসমৃদ্ধ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস। অথচ দলটিতে আছেন তামিম ইকবাল, এভিন লুইস, স্টিভেন স্মিথ, শোয়েব মালিক, শহীদ আফ্রিদি, এনামুল হক বিজয়, ইমরুল কায়েসের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানরা। একই দিন এর আগের ম্যাচটিতে ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে পরে ব্যাট করতে নেমে ৮৭ রানে শেষ হয়েছে খুলনা টাইটানসের ইনিংস। ম্যাচে খুলনার হার ১০৫ রানে।

বিপিএল শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বলেছিলেন, ‘১৮০/১৯০ কিংবা ২০০ রান তাড়া করে জিতলে তখন টুর্নামেন্টের আকর্ষণ এমনিতেই অনেক বাড়ে।’ এবারের আসরে রান চেজের বিষয়টিতে একটু তাকানো যাক। এবারে এখন পর্যন্ত ১৫০ তো অনেক দূরের ব্যাপার, ১৩০ রান তাড়া করেও ম্যাচ জিততে পারেনি কোনো দল। সিলেট সিক্সার্সের ১২৭ রান টপকে রান চেজে সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস।

বিপিএল আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় টি২০ ফরম্যাটে দেশের ক্রিকেটারদের মান বাড়ানো, সে জায়গাটিতে দেখা যাচ্ছে না আশাব্যঞ্জক কিছুই। প্রথম সাত ম্যাচে হাফ সেঞ্চুরি করতে পারেননি বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানই। অষ্টম ম্যাচে এসে গতকাল খুলনার বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি পান রাজশাহী কিংস অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ (৫১ রান)। এর আগে সর্বোচ্চ ৪৫ রান ছিল সিলেট সিক্সার্সের আফিফ হোসেনের। মিরাজ ও আফিফের আগে ৪০ রানেরও নাগাল পাননি বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান। সবচেয়ে বেশি স্থানীয় তারকার সমাবেশ খুলনা টাইটানসে। বিশেষ করে দলটিতে টপ অর্ডার ব্যাটিংয়ে মূল নির্ভরতা দেশীয় তারকারা। ফল যে ভালো হয়নি, সেটা সুস্পষ্ট। প্রথম দুই ম্যাচেই হেরেছে টাইটানস।

শুধু দেশীয় তারকা ব্যাটসম্যানরাই নয়, রানের জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে ক্রিকেটের এ সংক্ষিপ্ততম ফরম্যাটে বিশ্ব মাতানো টি২০ স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানদেরও। এখন পর্যন্ত সাত ম্যাচে ১৪ ইনিংসে সেঞ্চুরির স্বাদ পাননি কোনো ব্যাটসম্যান। হাফ সেঞ্চুরি এসেছে মাত্র ছয়টি। এর দুটোই আফগান টিনএজ হযরতউল্লাহ জাজাইয়ের। বিদেশী তারকাদের মধ্যে ফিফটি পেয়েছেন এ সংখ্যা থেকে ফিফটি পাননি এ সংখ্যাটাই বড়। টি২০ ক্রিকেট মানেই অবধারিতভাবেই ক্রিস গেইল সবার উপরে। এনওসি জটিলতার কারণে প্রথম দুই ম্যাচে খেলতে পারেননি এ ক্যারিবিয়ান সুনামি। মাঠে নামেন দলের তৃতীয় ম্যাচে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের বিপক্ষে ওই ম্যাচে ৫ বল খেলে ১ রানে আউট হয়ে যান গেইল।

গোটা দুনিয়াতেই ফ্র্যাঞ্চাইজি টি২০ ক্রিকেট আর ক্যারিবীয়রা সমার্থক। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত ক্যারিবীয় ঝলকানি দেখা যাচ্ছে না। টি২০ ক্রিকেটে বিপজ্জনক বিবেচিত এভিন লুইস, আন্দ্রে রাসেল, কাইরন পোলার্ড, কার্লোস ব্রাফেটরা দুটো করে ম্যাচ খেলেও নাগাল পাননি হাফ সেঞ্চুরির। উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ফিফটির স্বাদ পেয়েছেন কেবল নিকোলাস পুরান। গতকাল চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে ৩২ বলে ৫২ রানের ইনিংস খেলে যেন ক্যারিবীয় উপস্থিতি জানান দিলেন পুরান।

বিপিএলে আলোচিত নাম ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। বিদেশীদের মধ্যে কেবল এ দুজনই আছেন অধিনায়ক হিসেবে। ব্যাট হাতে এখনো নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি এ দুজন। গতকাল নিজের ও দলের দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৯ রানের ইনিংস খেলে এ আসরে প্রথম ফিফটি পেয়েছেন ওয়ার্নার। অন্যদিকে প্রথম দুই ম্যাচ থেকে সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক স্মিথের সংগ্রহ মোটে ১৬। রাইডার্সের বিপক্ষে আগের ম্যাচে শূন্য হাতে ফিরেছেন এ অসি রান মেশিন।

ফ্র্যাঞ্চাইজি টি২০ ক্রিকেটের মূল আকর্ষণ রান। আর সে রানের দুর্ভিক্ষ মিরপুরে। বিপিএলের সিলেট, চট্টগ্রাম পর্বে রানের হাহাকার থেকে বিপিএল বেরোতে পারবে কিনা, সেটাই এখন প্রশ্ন।