শেষ পাতা

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ : কর অবকাশ ও রেয়াতগ্রহীতাদের রিটার্ন খতিয়ে দেখতে কমিটি

আব্বাস উদ্দিন নয়ন | ০২:০৪:০০ মিনিট, জানুয়ারি ০৯, ২০১৯

কর অবকাশ, রেয়াত কিংবা কর অব্যাহতির সুবিধা নিতে প্রকৃত আয় লুকিয়ে কোম্পানি ও ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এজন্য সুবিধা নেয়া ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক করদাতাদের আয় ও রিটার্ন খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। এ লক্ষ্যে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত দলও গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, কর অবকাশ ও রেয়াত নেয়া করদাতাদের কয়েক বছরের আয়-ব্যয় ও রেয়াত নেয়া অর্থের পরিমাণ যাচাই করবে এনবিআরের কমিটি। এনবিআরের সদস্য (কর আপিল ও অব্যাহতি) রওশন আরা আক্তারকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটিতে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সংস্থাটির কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চলের কমিশনার আসাদুজ্জামানসহ প্রথম ও দ্বিতীয় সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রণোদনার আওতায় অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ, ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে কর অবকাশ সুবিধা দিচ্ছে সরকার। ব্যক্তিশ্রেণীর ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারসহ বেশকিছু খাতে বিনিয়োগে কর অবকাশ ও রেয়াতের সুযোগ রয়েছে। অনেক করদাতাই এসব সুবিধার অপব্যবহার করছেন বলে এনবিআরের কাছে অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানিগুলো কর অবকাশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে অন্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। একই মালিকানার অধীন কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে আয় বেশি দেখানো হলেও করযোগ্য প্রতিষ্ঠানের আয় কম দেখানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখিয়ে কর ফাঁকি দেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা শেয়ারবাজার, ডিবেঞ্চারসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ দেখিয়ে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। এসবের সত্যতা যাচাই করতেই কমিটি গঠন করা হয়েছে। সব করদাতার রিটার্ন যাচাইয়ের মাধ্যমে এ ফাঁকি উদ্ঘাটন করবে এনবিআর।

এনবিআরের সদস্য রওশন আরা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, এনবিআর মূলত কর অবকাশ ও কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত করদাতাদের রিটার্ন যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে করদাতার প্রকৃত আয় যাচাইয়ের পাশাপাশি কর অবকাশের যথার্থতাও জানা যাবে। এনবিআর প্রতি বছর কী পরিমাণ কর অব্যাহতি দিচ্ছে তারও একটি হিসাব পাওয়া যাবে। তবে এ যাচাই-বাছাইয়ে করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি মাথায় রাখা হবে।

সূত্র জানায়, সাত সদস্যের কমিটি বিভিন্ন কোম্পানির আয়কর রিটার্ন যাচাই করে প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন, বিক্রি, অবকাশ নেয়া করের পরিমাণ ও কর অবকাশ সুবিধা নেয়ার যৌক্তিকতা খতিয়ে দেখবে। যেসব প্রতিষ্ঠান কর অবকাশ সুবিধা নেয়ার পর অস্বাভাবিক মুনাফা করছে তাদেরও তালিকা করা হবে। আবার একই মালিকানায় থাকা একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য খতিয়ে দেখে জানার চেষ্টা চলবে কর অবকাশ সুবিধা অপব্যবহারের জন্য অন্যত্র অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে কিনা। বিভিন্ন প্রকল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর অবকাশ সুবিধার বরাতে প্রাপ্ত অধিক মুনাফার অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার, সঞ্চয়পত্র, ডিবেঞ্চারসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে রেয়াত নেয়ার প্রকৃত হার খুঁজে বের করা হবে।

বর্তমানে ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, বায়োটেকনোলজি, বায়োফার্টিলাইজার, কীটনাশক প্রস্তুতসহ ৩৬টি খাতে শতভাগ কর অবকাশ সুবিধা দেয়া আছে। প্রথমে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা দেয়া হলেও খাতসংশ্লিষ্টদের দাবির মুখে প্রতি বছরই সুবিধার মেয়াদ বাড়ানো হয়। সর্বশেষ অর্থবছরের বাজেটে এ সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকার বাইরে উৎপাদনমুখী শিল্প স্থাপনে ১০-২০ শতাংশ হারে কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হয়েছে। কর অবকাশ সুবিধা রয়েছে পরিবেশবান্ধব ইটভাটা নির্মাণেও। কারখানা স্থাপনের পর ১০ বছর কর অবকাশ সুবিধা পাবে এসব খাত। দেশের যেকোনো অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনে বিভিন্ন রেয়াতি হারে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা আছে। এর বাইরে সরকারের ফাস্টট্র্যাক প্রকল্প, বিদ্যুৎ কোম্পানি, সরকারি প্রকল্পে বিদেশী কর্মকর্তাদের আয়ের ওপর কর অবকাশ সুবিধা দিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে ১৫ বছরের জন্য শতভাগ কর অবকাশ সুবিধা।

ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের ক্ষেত্রে কর রেয়াত নেয়ার সুযোগ রয়েছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ, মিউচুয়াল ফান্ড অথবা ডিবেঞ্চার ক্রয়, সরকারের ট্রেজারি বন্ড ক্রয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডিপিএস, জীবন বীমা প্রিমিয়াম (বার্ষিক মোট বীমাকৃত অংকের সর্বোচ্চ ১০%), রাজস্ব বোর্ডের সেভিংস সার্টিফিকেট ক্রয় ও প্রভিডেন্ট ফান্ডে অর্থ জমার বিপরীতে। এর বাইরে দাতব্য চিকিৎসালয়, সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের অনুমোদিত কোনো কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, জাকাত ফান্ডসহ বেশ কয়েকটি খাতে অনুদানের বিপরীতেও কর রেয়াতের সুবিধা রয়েছে। আয়কর আইনে বিনিয়োগ ও অনুদানের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে রেয়াতের হার নির্ধারণ করে দেয়া থাকলেও হিসাব কমবেশি দেখিয়ে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতারা আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন বলে মনে করছে এনবিআর।