টকিজ

টুটুলের শেষ স্মৃতিকথা

২২:০৩:০০ মিনিট, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮

কীর্তিমান মানুষের প্রস্থানের পর চিরাচরিত নিয়মে তার কথাগুলো অমূল্য হয়ে দাঁড়ায়, আলোচনার টেবিল স্তূপ হয়ে যায় শ্রদ্ধার অর্ঘ্যে। সদ্য বিদায় নেয়া প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সম্পাদক ও নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল সেই মানুষদের একজন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘ঘুড্ডি’, ‘দহন’, ‘দীপু নাম্বার টু’ ও ‘দুখাই’-এর মতো চলচ্চিত্র সম্পাদনা করে নীরবে নিজেই নিজেকে অমর করে তুলেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে। আজ থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ৫ ডিসেম্বর প্রখ্যাত আলোকচিত্র শিল্পী ও সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনের প্রয়াণ উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছিলেন টুটুল। সম্ভবত এটাই ছিল তার জীবনের শেষ বক্তৃতা। টকিজের পাঠকদের জন্য আজ টুটুলের সে স্মৃতিকথা তুলে ধরা হলো:

আজকের এ মনঃকষ্টদায়ক স্মরণসভার মাননীয় সভাপতি লিয়াকত আলী লাকী এবং আজকের সন্ধ্যার সুধীবৃন্দ— আনোয়ার আমার জীবনের একটা বেশ ভালো অংশ জুড়ে ছিল। আমরা যখন ইন্টারভিউ দিই পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়বার জন্য, তখন আনোয়ার আমাদের সাথেই ছিল। সেই দিন থেকেই শুরু হয় ওর সঙ্গে চমত্কার এক বন্ধুত্ব। আনোয়ার আমার চেয়ে দুই-তিন বছরের জ্যেষ্ঠ ছিলেন, কিন্তু ও তুই তুই করে যখন শুরুতেই সম্বোধন করেছিল, তখন আন্তরিকভাবে আমরা দুজন-দুজনার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা একটা বছর একটা রুমেই থাকতাম। আমার রুমমেট ছিল আনোয়ার। পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে র্যাগিং হতো, আমরা দুজন সেই র্যাগিংয়ের শিকার হয়েছিলাম। এর ফলে আমরা দুজনই প্রচণ্ডভাবে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। এরপর আমরা দুজন একসাথেই প্রতিষ্ঠানটির সে সময়ের পরিচালকের সঙ্গে দেখা করে আমাদের অভিযোগ উত্থাপন করেছিলাম। আমার এখনো মনে আছে আনোয়ার তখন বলেছিল, ‘স্যার আমি আর সময় দিতে পারব না। আমি সরাসরি ডিজির কাছেই যাব। আমি ডিজিকে কালচারাল মিনিস্ট্রিতে নিয়ে কথা বলব যে, র্যাগিংয়ের অর্থ এত বাজে, যা শারীরিক পর্যায়ে চলে যায়। আমি বললেও তো আমি থাকতে পারছি না। কারণ আমি কখনো এ রকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাইনি। বরঞ্চ আপনি আমাকে আমার দেশে পাঠিয়ে দেন।’ আমাদের অভিযোগের পরদিনই ডিরেক্টর নিয়ম জারি করলেন, তখন বোধহয় ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা) চলছিল ইন্দিরা গান্ধীর সময়। এবং তারই কোনো ধারা হিসেবে উনি একটি নোটিস জারি করলেন যে, এরপর থেকে আর কোনো র্যাগিং হবে না। যথারীতি সিনিয়ররা ক্ষেপে গেল। এবং দুজনকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হলো, যারা আমাদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছিল। তাদের একজনকে ছয়দিনের জন্য ইনস্টিটিউট থেকে বের করে দেয়া হয়, আরেকজনকে আর্থিক জরিমানা করা হয়। এরপর র্যাগিংটা বন্ধ হয়ে যায়।

ওই সময় থেকেই আনোয়ার আর আমার মধ্যে চমত্কার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেটা হচ্ছে: আমাদের কোনো রকম সমস্যা হলে আমরা দুজন-দুজনার সাথে আলাপ করতাম। যদিও আমাদের সিনিয়র ছিলেন বাদল রহমান ও সালাহউদ্দীন জাকী। তারপরও আমরা দুজন একসাথে এভাবে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতাম। সন্ধ্যাবেলা এসে আমরা আলোচনা করতাম, কী পড়লাম, কী পড়া যাবে, কী করতে হবে, কী করা যাবে না।

যাহোক, আমরা দুজন তো দুই মাধ্যমে ছিলাম, আমি সম্পাদনা বিভাগে আর আনোয়ার ফটোগ্রাফিতে। দুজন ভিন্ন পথের হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যে আমাদের সমস্ত পাঠ্যক্রম, কার্যক্রম ভিন্ন হয়ে গেল। এরপর একসময় আনোয়ারকে আমি আবিষ্কার করি অন্যভাবে। আনোয়ার ওখানে ফটোগ্রাফি শিখতে গেছে, কিন্তু বড় শিক্ষাই তো পেয়ে গেছে— যখন ও আর্কিটেকচার বিষয়ে পড়ত। ওর এ শিক্ষা আমাদের ছিল না। কারণ আমরা সাধারণ গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রির জন্য পড়েছি।

ফটোগ্রাফি বিষয়ে আনোয়ারের একটা নেশা ছিল, তার সাথে গ্রামার, কম্পোজিশন— এসব বিষয়ের ধারণাগুলোয় ও এত বেশি এগিয়ে ছিল যে, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে একই ক্লাসের ছাত্রদের সাথে ওর অনেক দূরত্ব বেড়ে যায়। তখন দেখতাম, আনোয়ার ক্লাসে কেন নেই, ক্লাসে কেন আসে না— ওসব নিয়ে স্যারেরা কোনো কথা বলতেন না। কারণ তারা জানতেন আনোয়ার ঠিকই ক্লাসে ভালো করবেন। এদিকে আনোয়ার আনোয়ারের মতো ঘুরে বেড়াত। একদিকে কোথায় ক্লাস হচ্ছে তো আরেক দিকে আনোয়ার চলে যেত পুনে, রাজস্থান, দিল্লি, অমুক অমুক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে।

একবার ১০ দিনের একটা ছুটি পেয়ে আনোয়ারের সাথে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম আমি। আমরা তখন সেই সময়কারের দিল্লির সম্ভ্রান্ত এক শপিং এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছি, আড্ডা দিচ্ছি, আমাদের অন্য বন্ধুরাও ছিল। হঠাৎ দেখি আমাদের ভেতর থেকে আনোয়ার ছুটে গেল। কয়েকটা বিশাল আকারের গরু রাজপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে, আনোয়ার খুব ক্লিক (ছবি তোলা) করা শুরু করল। আর কি অভূতপূর্বভাবে গরুগুলো তত্ক্ষণাৎ থেমে গিয়ে একসাথে আনোয়ারের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, আনোয়ার ওরা তো পোজ দিচ্ছে। আনোয়ার বলল, ‘দিতে থাকুক, আমি তুলতে থাকি।’ কী আশ্চর্য, দেখেন, আনোয়ার কি গরুর ছবি তুলতে গিয়েছিল? প্রশ্নটা আমার এখানে। আনোয়ার কিন্তু গরুর ছবি তুলতে যায়নি। ওর ভেতর অবাক বিস্ময় লেগেছিল যে, এমন একটা শহরের সম্ভ্রান্ত শপিং এলাকায় এতগুলো গরু একসাথে! কি কন্ট্রাস্ট (বৈপরত্য)! যেখানে খুব দামি গাড়ি আসবে, ভদ্রমহিলা, ভদ্রলোক শপিং করবে, ঠিক তার মধ্যে কতগুলো গরু। এত কন্ট্রাস্ট জীবনকে ও ছবিতে তুলে ধরেছে। আমি সত্যিকার অর্থে ওইখানেই বুঝলাম, শিল্প আসলে অন্য জিনিস।

আনোয়ার কম্পোজিশন বুঝত, লাইট বুঝত, সব ভালো। ঠিক আছে, তা যে কেউই বুঝতে পারে। কিন্তু ওই ছবি তোলার ভেতর যে অর্থ, শিল্পবোধ এবং ভেতরের গল্প, কথা তা তো অন্য রকম। ছবিগুলো হয়তো আমরা বিশ্লেষণ করে দেখব গরু আর বিশাল এক শপিং এরিয়া। কিন্তু এর বাইরের যে কথাগুলো আছে আনোয়ার তা তুলে এনেছেন। আনোয়ারের যত ছবি ছিল, তার সবগুলোর ভেতর কোনো না কোনোভাবে শিল্পের ছোঁয়া থাকত, কোনো না কোনো অর্থ আমরা খুঁজে পেতাম। এখানেই আনোয়ারের সার্থকতা।

যখন আমরা ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ করি, তখনই আনোয়ার বুঝে নিত, ক্যামেরাটা এই ভাবে প্যান হবে, এই ভাবে চরিত্ররা আসবে। এবং যথারীতি সে ঠিক সেভাবেই কম্পোজ করে একটা অর্থ দাঁড় করিয়ে ফেলত যে, ঠিক কোন জায়গা শট নিতে হবে, কোন জায়গায় ফ্রেমে দিয়ে শুরু হবে, কোন ফ্রেমে গিয়ে শেষ হবে। ছবির শেষ ফ্রেমটাও যে দেখবার মতো ফ্রেম, এটা আনোয়ার হোসেন তার মুভিং ফটোগ্রাফিতে করে গেছে। এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ ও স্টিল ফটোগ্রাফি করত অনেক কম বয়স থেকে। যে কারণে ওর ফটোগ্রাফি কম্পোজিশনগুলো আমাদের কাছে দারুণ অর্থবহ হয়ে উঠত।

আনোয়ারের সঙ্গে আমার জীবনের অনেক মজার ঘটনাগুলো ঘটে গেছে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে পড়তে গিয়ে। খাওয়া-দাওয়া সবকিছুতে মজা করতাম। ও যে এত মজা করতে পারত, তা এই আনোয়ার হোসেনকে যারা দেখেছেন তারা জানেন না।

আলোকচিত্র শিল্পী শফিকুল ইসলাম স্বপনের রুমে ঢুকে বুদ্ধি করে ওর আঙুর নিয়ে জানালার ওপর বসে বসে খেয়েছিল একবার আনোয়ার। আর আমাকে বলত, ‘টুটুল ছবিটা তুলে রাখ না।’ তখন খুব মন খারাপ করে স্বপন বলেছিল, ‘আমার সমস্ত আঙুরগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ তো আনোয়ার কত রকমভাবেই না দুষ্টুমি করতে পারত।

যাহোক, আমি ওর মজার মজার স্মৃতি নিয়ে আনন্দে থাকতে চাই, হাসিতে থাকতে চাই, আমি কষ্ট পেতে চাই না। কারণ ওকে যে হারাব এত কম সময়ের মধ্যে, এটা কখনই ভাবতে পারিনি। আর শাকের ভাই (একই স্মরণসভায় বক্তব্য দিয়েছিলেন সূর্য দীঘল বাড়ীর নির্মাতা মসীহউদ্দিন শাকের) শেষ দিকে এসে যে কথাগুলো বলে গেছেন, সেটা যেন আমাদের জন্য আরো গভীর মর্মবেদনার কারণ হয়ে গেছে। আমি চাই শাকের ভাই আরো দীর্ঘ জীবন লাভ করুন। তার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু পাওয়ার আছে। আনোয়ারকে আমরা আরো দীর্ঘদিন চেয়েছিলাম। জানি না, কী কারণে ও চলে গেছে। হাসেম সুফী ভাই বলেছিলেন ওগুলো আনোয়ারের চলে যাওয়ার ইঙ্গিত। ফেসবুকে আনোয়ার স্ট্যাটাস দিয়েছিল যে, ‘আমি এসেছি এবার সবার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ এ কথার অর্থ কী? আনোয়ার ছবি তুলত, তার ভেতরও একটা অর্থ থাকত, স্ট্যাটাস দেয় তার ভেতরও একটা না একটা গভীর বেদনা যেন রয়ে গেছে। আনোয়ার জানি কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। হয়তো সেটা বলা হয়নি। আমি আনোয়ারের স্মৃতিগুলো নিয়ে আনন্দে থাকতে চাই, আমি কষ্ট পেতে চাই না। সবাইকে ধন্যবাদ।

 

অনুলিখন: রুবেল পারভেজ