প্রথম পাতা

অর্থপ্রাপ্তির পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংক

হাছান আদনান | ০১:১৬:০০ মিনিট, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৮

অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত বেসিক ব্যাংকে গত চার বছরে ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে সরকার। এর পরও গত পাঁচ বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি নিট লোকসান দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকটি প্রায় ১২০ কোটি টাকা পরিচালন লোকসানে আছে। দুই দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে, যোগ্যতা শিথিল করেও ব্যাংকটির জন্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পাওয়া যাচ্ছে না। এমডিশূন্য ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একজন মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) নেতৃত্বে।

বিপর্যস্ত নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংককে উদ্ধারে এরই মধ্যে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন দিয়েছে সরকারি চার ব্যাংক ও এক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বন্ড কেনার নামে আরো ৫০০ কোটি টাকা মূলধন দেয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। তার পরও বিপর্যয় কাটাতে পারছে না বেসরকারি ব্যাংকটি। এখনো আমানত ফেরত পাওয়ার আশায় ব্যাংকটির শাখায় শাখায় ঘুরছেন গ্রাহকরা। আমানত ফেরত পায়নি পরিবেশ মন্ত্রণালয়, জীবন বীমা করপোরেশন, চট্টগ্রাম বন্দরসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। গত বছর ৫১ কোটি টাকা নিট লোকসান দেয়া ফারমার্স ব্যাংকের লোকসানের পাল্লা চলতি বছরে আরো ভারী হচ্ছে। এরই মধ্যে ব্যাংকটির প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক দুটি থেকে ঋণের নামে বের করে নেয়া হাজার হাজার কোটি টাকা উদ্ধার করা যাচ্ছে না। এ কারণে বড় অংকের অর্থ জোগান দিয়েও ব্যাংক দুটিকে টেনে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।

অনিয়ম-দুর্নীতির পর বেসিক ব্যাংককে টেনে তুলতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয় আলাউদ্দিন এ মাজিদকে। ব্যাংকটির একসময়কার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) তিনি। বেসিক ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ব্যাংকটিকে টেনে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলাফল সুখকর নয়। বেসিক ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে, সরকারের দেয়া মূলধন তার তুলনায় অনেক কম। এখন পর্যন্ত সরকার ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে। বেসিক ব্যাংকে যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আরো সময় লাগবে।

আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে লুটপাটের শিকার বেসিক ব্যাংক গত পাঁচ বছরে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ১২০ কোটি টাকা পরিচালন লোকসান হয়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে গত আগস্টে বেসিক ব্যাংকের এমডি মুহাম্মদ আউয়াল খান পদত্যাগ করেন। তারপর নতুন এমডি নিয়োগ দেয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ব্যাংকটি। কিন্তু শর্ত শিথিল করেও ওই দফায় যোগ্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর আবারো এমডি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বেসিক ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব পালন করছেন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আহমেদ হোসেন।

বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৯ হাজার কোটি টাকাই নাম লিখিয়েছে খেলাপির খাতায়। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৬০ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার সঞ্চিতি ঘাটতিতে রয়েছে বেসিক ব্যাংক।

ঋণ কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত ফারমার্স ব্যাংককে উদ্ধারে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। এ অর্থের বড় অংশই খরচ হয়ে গেছে ভবনের ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে বকেয়া পরিশোধে। এছাড়া আগে থেকেই মেয়াদি আমানত ও কলমানি হিসেবে ফারমার্সকে ধার দেয়া প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা আটকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের। যদিও এখন পর্যন্ত লুণ্ঠনের শিকার ফারমার্স ব্যাংকে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। পরে ফারমার্স ব্যাংকে ৫০০ কোটি টাকা ঢালার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক ও আইসিবি। ফারমার্স ব্যাংকের বন্ড কেনার মাধ্যমে এ অর্থ দেয়া হবে।

ফারমার্স ব্যাংকের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ ব্যাংকটির সঙ্গে সম্পৃক্তরাও। জুন পর্যন্ত ফারমার্স ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৩০ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। ফারমার্স ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা বের করা হয়েছে মূলত মতিঝিল ও গুলশান শাখার মাধ্যমে। এর মধ্যে মতিঝিল শাখার ঋণ প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ও গুলশান শাখার ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

ফারমার্স ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে যাত্রার পর ব্যাংকটি নিট মুনাফা করেছিল প্রায় ৪ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে মুনাফা হয় ৩ কোটি, ২০১৫ সালে ২১ কোটি ও ২০১৬ সালে ২৩ কোটি টাকা। এরপর ২০১৭ সালে এসে লোকসান হয় ৫৩ কোটি টাকা।

চরম আর্থিক সংকটে পড়ে গেলে গত বছরের ২৭ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক মাহাবুবুল হক চিশতীকেও পদ ছাড়তে হয়। এরপর ১৯ ডিসেম্বর দায়িত্বে অবহেলা ও ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থতার দায়ে ব্যাংকের এমডি একেএম শামীমকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির এমডির দায়িত্ব পালন করছেন এহসান খসরু। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের অবস্থা কিছুটা খারাপ হওয়ায় আমাদেরও কষ্ট হচ্ছে। তবে শিগগিরই গ্রাহকদের ভালো কিছু সংবাদ দিতে পারব। সরকারি ব্যাংক থেকে এখন পর্যন্ত মূলধনের ৭১৫ কোটি টাকা পেয়েছি। বন্ড বিক্রির যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা চলমান রয়েছে। তবে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্রে বেশ সাড়া পাচ্ছি। আমাদের নতুন পণ্য সুপার বেনিফিট স্কিম ও কোটিপতি স্কিমে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। গত মাস পর্যন্ত আমাদের ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকার আমানত হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে।

এখনো ঋণ বিতরণ হচ্ছে না জানিয়ে এহসান খসরু বলেন, আমরা এখন শুধু ঋণ পুনরুদ্ধারে মনোযোগী। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ৫৬১ কোটি টাকার ঋণ পুনরুদ্ধার হয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত গ্রাহকদের ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করেছি। তবে এফডিআরের বিপরীতে কিছু ঋণ দেয়া হচ্ছে। আমানত সংকট কাটিয়ে ২০১৯ সালের জুন থেকে ঋণ বিতরণ শুরু করতে পারব বলে আমরা আশা করছি। তবে ব্যাংকের মুনাফা পেতে কিছুটা সময় লাগবে।