প্রথম পাতা

অর্থনীতিতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা

হাছান আদনান | ০২:৩৭:০০ মিনিট, নভেম্বর ২১, ২০১৮

২০০৮-০৯ অর্থবছরের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর পড়তে দেয়নি রেমিট্যান্সের উচ্চ অবদান। প্রবাসীদের আয় বৈশ্বিক সংকটেও দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছিল। এর পর থেকেই দেশের অর্থনীতিতে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরেও বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) রেমিট্যান্সের অবদান ছিল প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। ১০ বছরের ব্যবধানে তা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের মোট রফতানি আয়ের ৬২ শতাংশের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। গত ১০ বছরে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা প্রায় ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে আমদানি ব্যয় পরিশোধের হিসেবেও সংকুচিত হচ্ছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা।

দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ক্রমহ্রাসমান এ ভূমিকাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনীতিতে বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ বড় কোনো ধাক্কা এলে তা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুরক্ষার বর্ম হিসেবে কাজ করত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এটি ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৫ বিলিয়ন ডলারের ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করেছিল। তার পর থেকেই রেমিট্যান্সের ধারাবাহিকতা উল্টোমুখী। ২০১৭-১৮ অর্থবছর রেমিট্যান্সে ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও এখনো তিন বছর আগের পরিমাণকে ছাড়াতে পারেনি। যে হারে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, সে হারে রেমিট্যান্স বাড়ছে না। এতে রেমিট্যান্সের অবস্থান অর্থনীতিতে সংকুচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উন্নত দেশগুলোয় জাতীয়তাবাদী চেতনার পুনর্জাগরণ ও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে দেশের প্রধান শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। নতুন শ্রমবাজারও সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ জনশক্তি রফতানিরও অভাব রয়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অতিমূল্যায়ন বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে নিরুৎসাহিত করছে প্রবাসীদের। এর প্রভাব পড়ছে রেমিট্যান্সপ্রবাহে, অবদান কমছে অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ছিল ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ওই অর্থবছর বৈধ পথে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৯৬৮ কোটি ৯২ লাখ ডলার। এর পর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে। একই সময়ে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকাও ছিল কিছুটা স্থিতিশীল। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান আরো কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ১১ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।

রফতানি আয়ের হিসেবেও কমছে রেমিট্যান্সের ভূমিকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে যে রফতানি আয়, তার ৬২ দশমিক ১১ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ হার বেড়ে ৬৭ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়। তার পর থেকেই এক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে রেমিট্যান্স। ২০১০-১১ অর্থবছরে রফতানি আয়ের ৫০ দশমিক ৬৪ শতাংশের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান প্রবাসীরা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ হার নেমে আসে ৪৭ দশমিক ৭৮ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৬ দশমিক ৮৫ শতাংশে। তবে গত অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ৪০ দশমিক ৮৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশের আমদানি ব্যয়ের হিসেবে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে দেশের আমদানি ব্যয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের রেকর্ড সাড়ে ৫৪ বিলিয়ন ডলারের (এফওবি) আমদানি ব্যয় হয়েছে। বিশাল অংকের এ আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা ছিল ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। মূলত আমদানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রেমিট্যান্স আয়ে প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারার কারণেই দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা দুর্বল হচ্ছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও গবেষক ড. জায়েদ বখত। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, রফতানিতে যেমন পণ্যের গুণগত মান ও সৌন্দর্যে পরিবর্তন আনতে হয়, একইভাবে মানবসম্পদ রতফানিতেও বৈচিত্র্য আনতে হয়। কিন্তু আমরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানবসম্পদ রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে পারিনি। এখনো দক্ষ জনশক্তির তুলনায় অদক্ষরাই বিদেশে বেশি যাচ্ছেন। আমাদের চেয়ে অনেক কম জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়েও ফিলিপাইন অনেক বেশি রেমিট্যান্স আয় করছে। বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া রেমিট্যান্সের জন্য ইনসেনটিভও দিতে হবে। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য অংশ হুন্ডিসহ নানা অবৈধ মাধ্যমে প্রবেশ করছে। রেমিট্যান্সে ইনসেনটিভ দিলে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৯৬৮ কোটি ৯২ লাখ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। ওই অর্থবছরে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ দশমিক ২৮ শতাংশ। এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত রেমিট্যান্সপ্রবাহে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এসেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্সপ্রবাহ ১০ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে ২০০৯-১০ অর্থবছরে। অর্থবছরটিতে ১ হাজার ৯৮ কোটি ৭৪ লাখ ডলার দেশে পাঠান প্রবাসীরা। বাড়তে থাকা রেমিট্যান্স ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেড় শতাংশের বেশি কমে যায়। পরের অর্থবছর প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছর আবার কমে যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছর রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ।

তবে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে বর্তমানে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ওপর। হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন ও মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহে বেশ অগ্রগতি আসে। বিদায়ী অর্থবছরে প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ১৬ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছরে অক্টোবর পর্যন্ত রেমিট্যান্সপ্রবাহে প্রবৃদ্ধি এসেছে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি রেমিট্যান্স সংগ্রাহক দেশের মধ্যে বাংলাদেশ নবম। ২০১৭ সালে ৬৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স গ্রহণের মাধ্যমে এ তালিকার শীর্ষ দেশ ছিল ভারত। ৬৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে চীন রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। শীর্ষ রেমিট্যান্স সংগ্রাহক অন্য দেশগুলো হলো ফিলিপাইন (৩৩ বিলিয়ন), মেক্সিকো (৩১ বিলিয়ন), নাইজেরিয়া (২২ বিলিয়ন), মিসর (২০ বিলিয়ন), পাকিস্তান (২০ বিলিয়ন) ও ভিয়েতনাম (১৪ বিলিয়ন)। বাংলাদেশ ১৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স উপার্জনের মাধ্যমে তালিকায় নবম স্থানে রয়েছে। এ তালিকার দশম স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। ২০১৭ সালে দেশটিতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার।