সম্পাদকীয়

ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি বাড়ছে : নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়

২১:১১:০০ মিনিট, নভেম্বর ২১, ২০১৮

একদিকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার উজ্জ্বল ইতিহাস হারিয়েছে, বিপরীতভাবেই দেশে গড়ে উঠেছে অবৈধ কিছু প্রতিষ্ঠান; যারা একের পর এক ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করছে। কারিকুলাম, ক্লাস, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা কোনো ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে এ প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে ভুয়া এসব ডিগ্রি, যা শিক্ষা ও ডিগ্রিধারীদের গুণগত মানের কোনো পরিবর্তন করছে না, কেবল ডিগ্রির সংখ্যাই বাড়িয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে এমন প্রতারণা ও দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য শুধু অস্বস্তিকরই নয়, দুঃসংবাদও বটে।

গতকাল দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুসারে, অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের অবৈধ পিএইচডি সনদ দিয়ে চাকরিতে সুবিধা নিচ্ছে অসংখ্য সরকারি কর্মকর্তা। ভুয়া সনদ তাদের চাকরি ও পদায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। অথচ বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এদিকে ভুয়া এসব সনদ বন্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের কথা আমরা শুনি না। তাছাড়া দেশের আইন অনুসারে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের এখতিয়ার নেই। তাই কোনো ধরনের নিয়ম না মেনে যেসব প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন এমন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার নামে এ ধরনের প্রতারণা কাম্য নয়। বিশেষ টাস্কফোর্সও গঠনের মাধ্যমে ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় নিতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে যেন ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালাতে না পারে। ভুয়া ও মানহীন পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। আশার কথা— বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ভুয়া ও মানহীন পিএইচডি দেয়ায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। তবে অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা জরুরি। ভুয়া সনদ ব্যবসায়ী ও জালিয়াত চক্রকে রুখতে মন্ত্রণালয়ের কঠোর অবস্থানের বিকল্প নেই। তাছাড়া মানসম্মত ও প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অনুমোদিত কারিকুলাম অনুসারে পাঠদান পরিচালনা করছে কিনা, সে সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি আবশ্যক। জ্ঞান বিতরণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান বিকাশ ও সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আক্ষেপের কথা, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ দুটি বিষয়কে কোনো রকম জোড়াতালি দিয়ে পার করছে। কয়েক বছর ধরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই নতুন কোনো গবেষণা। ফলে দেশে তৈরি হচ্ছে না নতুন কোনো গবেষক। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাইয়ের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েও পিছিয়ে পড়ছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রকাশিত সংবাদ অনুসারে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫টি গবেষণাকেন্দ্রের মধ্যে ২৮-৩০টিতে কয়েক বছর ধরে মৌলিক কোনো গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় না। অথচ আজ থেকে দুই কিংবা তিন দশক আগে মৌলিক গবেষণার উজ্জ্বল সংস্কৃতি ছিল এ প্রতিষ্ঠানের। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও একই দশা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে গবেষণার পেছনে যেখানে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়, প্রচুর পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে, সেখানে আমাদের দেশে কেন বিপরীত দৃশ্য বিদ্যমান তা বোধগম্য নয়। মনে রাখা জরুরি, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি ক্রমে লুপ্ত হতে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার গুণগতমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা আমাদের শিক্ষার জন্য অশনিসংকেত। একই সঙ্গে এটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। মনে রাখতে হবে, গবেষণাধর্মী কাজের জন্য যেমন সংশ্লিষ্টদের উৎসাহিত করতে হবে, তেমনই ভুয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ শিক্ষার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে পুঁজি করে ভুয়া ডিগ্রি প্রদানের বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।