সম্পাদকীয়

আনন্দ স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তিতে অনিয়ম

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক

১৯:১৪:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৮

বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তায় রিচিং আউট-অব-স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১২ সালে চালু হয় আনন্দ স্কুল। আট থেকে ১৪ বছর বয়সী যেসব শিশু কখনো স্কুলে যায়নি বা প্রাথমিকেই ঝরে পড়েছে, নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকেই আনন্দ স্কুলে ভর্তি করানোর কথা থাকলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুদেরও এখানে ভর্তি করা হচ্ছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শুরুতেই ভর্তি ও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। এ ধরনের অভিযোগের কারণে ক্রমে পরিধি ছোট হয়ে আসছে রস্ক প্রকল্পের। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আনন্দ স্কুলের যে অবকাঠামোগত জীর্ণ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতেই প্রতীয়মান হয় কতটা দৈন্যে নিপতিত স্কুলগুলো। প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য থেকেও বিচ্যুতি ঘটেছে। কোনো রকমে স্কুলের নাম ধারণ করে ঘরগুলো দাঁড়িয়ে আছে বটে, কিন্তু এর ভেতরে ঠাঁই পেয়েছে কারো কারো ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, কোথাও কোথাও এগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে ময়লার ভাগাড়, আবার কোথাও ঘরেরই অস্তিত্ব নেই, শিক্ষার্থী নেই। কাজেই লেখাপড়ার বালাই তো থাকার কথাই নয়। অথচ কাগজপত্রে প্রায় সব স্কুলই সচলের বর্ণনা রয়েছে। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নস্যাৎ করে আনন্দ স্কুলের সার্বিক চিত্র যারা ম্লান করে দিয়েছেন, তারা অচেনা কেউ নয়। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, উপকরণ, পোশাক, শিক্ষকের বেতন, ঘর ভাড়ার টাকা ক্ষমতাবানরা ভাগাভাগি করে নিজেদের উদরপূর্তি করেছেন। এসব স্কুল পরিচালনা কমিটিতে যারা রয়েছেন, তাদের সামাজিকভাবে খুঁটির জোর নাকি খুব শক্ত। বরাদ্দের অর্থ শিক্ষার্থীর কপালে জুটেছে— এমন সুবিধাপ্রাপ্তদের সংখ্যা নগণ্য। আর শিক্ষা উপকরণ, পোশাক ইত্যাদির তো খবরই নেই। সবই গেছে বলবানদের পকেটে।

নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান, সরকারি স্কুলে পড়া শিক্ষার্থীদের নাম আনন্দ স্কুলে ঢোকানো, আট বছরের নিচে বয়স, অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ, উপবৃত্তি লুটপাটসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন এসব স্কুলসংশ্লিষ্টরা। শুধু তা-ই নয়, অনেক স্কুলে সাইনবোর্ড আছে কিন্তু শিক্ষার্থী নেই, স্কুল বন্ধ কিন্তু শিক্ষকদের বেতন, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও উপকরণ ওঠানো হচ্ছে নিয়মিত। এসব স্কুল সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় অবদানই রাখতে পারছে না; বরং নতুন করে দুর্নীতির জন্ম দিয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ে। এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যন্ত পর্যায়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে পারত, কিন্তু স্কুলগুলোর দুর্নীতির শিকড় শহর থেকে গ্রামে টেনে নিয়ে গেছে। ফলে এ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

উপজেলা পর্যায়ে ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর (টিসি) আনন্দ স্কুলের সবকিছুর দায়িত্বে থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ চরম। শিক্ষক প্রকৃত হলেও শিক্ষার্থীরা ভুয়া হওয়ায় অধিকাংশ আনন্দ স্কুলে ক্লাসগুলো হয় গড়ের মাঠ। আনন্দের সঙ্গে এসব স্কুলে যে কয়েকজন প্রকৃত শিক্ষার্থী পড়তে আসে, তারা প্রতিনিয়ত দেখে বহু অনিয়মের দুঃখজনক চিত্র। আমরা আশা করব, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টনক নড়বে এবং আনন্দ স্কুলের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করবে।