খেলা

পছন্দ আক্রমণে, ব্যয় রক্ষণে

১১:৪৮:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

মাউরিসিও পচেত্তিনো আর ইয়ুর্গেন ক্লোপের কাজের দর্শনই আক্রমণাত্মক ফুটবল। আর্জেন্টাইন কোচ পচেত্তিনোর অধীনে ১৯৬৫ সালের পর এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড গড়েছে টটেনহ্যাম। জার্মান কোচ ক্লোপের অধীনেও দুরন্ত লিভারপুল। তার সময়ে ‘অল রেড’রা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে এক মৌসুমে যত গোল করেছে, অতীতে অন্য কোনো দল তা পারেনি। তাদের দলের আক্রমণের নেতৃত্বে থাকা হ্যারি কেন আর মোহাম্মদ সালাহ আবার গত মৌসুমে ছিলেন ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ের রেসে। দুজন মিলে গত ১৩ মাসে করেছেন ৮৯ গোল।

দুই কোচের কাছে আক্রমণই শেষ কথা। কিন্তু তাদের ব্যয় তো রক্ষণেই বেশি! এ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমতও নেই। এখানে বরং দুজনের মধ্যে চিন্তার মিলই বেশি ফুটে উঠছে। তারা দুজনই আক্রমণভাগের উন্নতি সাধন করেছেন, তবে তা অল্প খরচেই। সেই তুলনায় বিপরীত প্রান্তে প্রচুর অর্থ ঢেলে তারা শক্তি বাড়িয়েছেন। এই যেমন, বিশ্বরেকর্ড গড়ে রোমা থেকে গোলকিপার অ্যালিসনকে কিনে নেন ক্লোপ। যদিও অ্যালিসনের রেকর্ডটা পরবর্তী সময়ে হাতছাড়া হয় চেলসির কিপার আরিজাবালাহার কাছে।

তার আগের গ্রীষ্মে সাউদাম্পটন থেকে ডাচ ডিফেন্ডার ভার্জিল ফন ডিককে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনে লিভারপুল। আজ তিনি মুখোমুখি হতে পারেন ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড দামের ডেভিনসন সানচেজের। নিজ নিজ জায়গায় এ দুজনই অবিশ্বাস্য সংযুক্তি। লিভারপুলের আগের ব্যয়বহুল সেন্টার ব্যাকের চেয়ে ফন ডিক চারগুণ ব্যয়বহুল। আগের ব্যয়বহুল সেন্টার ব্যাক ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার দেয়ান লভরেন। এছাড়া টটেনহ্যামও আগের ব্যয়বহুল টবি অ্যাল্ডারউইরেল্ডের চার গুণ বেশি অর্থ দিয়ে কিনেছে সানচেজকে।

তাদের কেন এত বেশি অর্থে কেনা হয়েছে, এমন প্রশ্ন জাগতেই পারে। তাদের পজিশনে মানানসই খেলোয়াড় খুব বেশি খুঁজে না পেয়েই ক্লোপ আর পচেত্তিনো বাধ্য হয়েছেন। এখানে ‘সরবরাহ ও চাহিদা’ তত্ত্ব বিরাট প্রভাব ফেলেছে।

২০১৪-১৫ মৌসুমে অবনমিত দল হাল সিটির চেয়েও বেশি গোল হজম করে টটেনহ্যাম। বাধ্য হয়েই পচেত্তিনো রক্ষণে বেশি নজর দিতে থাকেন। অ্যাল্ডারউইরেল্ডের সঙ্গে যুক্ত করেন আরেক বেলজিয়ান ইয়ান ভের্তোনেনকে। ২০১৫-১৬ মৌসুমে কম গোল খাওয়া দলগুলোর তালিকায় যুগ্মভাবে এক নম্বরে থাকে স্পার্সরা। ফন ডিক আসার পর লিভারপুল যেমন উন্নতি করেছে, ঠিক তেমনই উন্নতির তাগিদ অনুভব করেন পচেত্তিনোও। ১০ মাস আগে টটেনহ্যামের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয় লিভারপুল। এরপর অল রেডরা বদলে যায়। ৩৩টি লিগ ম্যাচে হজম করে মাত্র ২৩ গোল, আর ফন ডিক খেলেছেন এমন ১৮ ম্যাচে খায় ১১ গোল।

ফন ডিক এরই মধ্যে লিভারপুলের ম্যাচে প্রভাব রেখেছেন। তিনি দলের রক্ষণভাগের নেতাও বটে। এতে লভরেন আর জো গোমেজকে স্বাধীনভাবে ও ভালো খেলতে সাহায্য করছে। ফন ডিকের সঙ্গে সানচেজের কিছুটা তফাৎ রয়েছে— ডাচ ডিফেন্ডার লিভারপুলের রক্ষণভাগে এখন ভরসার নাম, তবে সানচেজের জায়গা এখনো পাকা নয়। ২২ বছর বয়সী খেলোয়াড়কে গত সপ্তাহে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে বসিয়ে রাখা হয়। তিনি হয়তো ভবিষ্যতের তারকা, তবে আপাতত অ্যাল্ডারউইরেল্ড আর ভের্তোনেনই তার চেয়ে ভালো।

পচেত্তিনো আর ক্লোপ এমন ডিফেন্ডারদেরই পছন্দ করেন, যারা হারানো বল পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ। পাসিংকেও অগ্রাধিকার দেন তারা, যা রয়েছে ডিকের মধ্যে। উচ্চমানের ‘ডিফেন্সিভ লাইন’ তারাই তৈরি করতে পারেন, যারা কিনা ওয়ান-টু-ওয়ান রক্ষণে অভ্যস্ত এবং বেশ গতি আছে। বল পুনরুদ্ধারে দক্ষ সানচেজ।

যা-ই হোক, অনেক কোচই সেন্টার ব্যাক পজিশনকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। সেখানে ব্যতিক্রম পচেত্তিনো আর ক্লোপ। তারা দুজনই সেন্টার ব্যাকসহ গোটা ডিফেন্সকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কাজে শক্ত ভূমিকাও রেখেছেন। পচেত্তিনো বিক্রি করেছেন ফেদেরিকো ফাজিও, ভ্লাদ চিরিচেস ও ইউনেস কাবুলকে। ক্লোপের সময় অ্যানফিল্ড ছেড়েছেন র্যাগনার ক্লাভান, মামাদু সাখো, মার্টিন স্করটেল, তিয়াগো ইলোরি ও স্টিভেন কলকার।

পচেত্তিনোর আক্রমণভাগের তিন সেনানী হ্যারি কেন, ডেলে আলি আর ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের সম্মিলিত মূল্য কত জানেন? মাত্র ১৮ মিলিয়ন পাউন্ড! সেই তুলনায় লিভারপুলের আক্রমণভাগের সেরা ‘ত্রয়ী’ সালাহ, সাদিও মানে আর রবার্তো ফিরমিনোর মূল্য ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু এখন এক সালাহকে ১০০ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনাই কঠিন হতে পারে।

পচেত্তিনো আর ক্লোপের কাছে যুক্তিও আছে— আক্রমণভাগের জন্য অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে মেধাবী খেলোয়াড় খুঁজে পাওয়ায় তারা রক্ষণভাগের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল পেয়েছেন।

কৌশলে আক্রমণভাগ আর রক্ষণকে শক্তিশালী রাখার এই উপায় তারা পেয়েছেন হয়তো নিজেদের খেলোয়াড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই। পচেত্তিনো ছিলেন উচ্চমানের সেন্টার ব্যাক, আর ক্লোপ নিচু লিগে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতেন, একই সঙ্গে তিনি রক্ষণও সামলাতে পারতেন।

আসলে আধুনিক ফুটবল সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলায়। চেলসির কোচ মাউরিজিও সারি যেমন সব বিভাগ বাদ দিয়ে দুনিয়া কাঁপানো ফি দিয়ে কিনলেন গোলকিপার কিপাকে। আবার পেপ গার্দিওলার কেনা ব্যয়বহুল পাঁচ খেলোয়াড়ের চারজনই ডিফেন্ডার। উচ্চাভিলাষী স্টাইলের ফুটবল খেলতে গিয়ে যদি ডিফেন্ডারদের বেশি দামে কিনতে হয়, তবে তাতে কোনো আপত্তি নেই পচেত্তিনো আর ক্লোপের। ইএসপিএন