খবর

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল

আট বছরেও চালু হয়নি দাঁতের ক্যাপ তৈরির মেশিন

আয়নাল হোসেন | ১১:১৫:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

রাজধানীর ভাসানটেক এলাকার সরকারি চাকরিজীবী রাশিদুল ইসলাম সম্প্রতি দাঁতে তীব্র ব্যথা নিয়ে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের দন্ত সংরক্ষণ বিভাগে যান। চিকিৎসকরা তার দাঁতের অবস্থা দেখে তাকে অর্থোডন্টিক বিভাগে পাঠান। কিন্তু এ বিভাগের দাঁতের ক্যাপ তৈরির পোরসেলিন মেশিনটি চালু না থাকায় তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখানে তার চিকিৎসা ব্যয় হয় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে এ চিকিৎসাসেবা করানো গেলে তার ব্যয় হতো সর্বোচ্চ ১ থেকে দেড় হাজার টাকা। শুধু রাশেদুল ইসলামই নন, তার মতো অনেকে রোগী সরকারি হাসপাতালের এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সূত্র জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করে দাঁতের ক্যাপ তৈরির পোরসেলিন মেশিনটি কেনা হয়। মেশিনটি দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য তখন সাতজন চিকিৎসককে জাপান থেকে সাতদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয়। কিন্তু দীর্ঘ আট বছরেও মেশিনটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসকদের অর্থ বাণিজ্য কমে যাওয়ার আশঙ্কায় মেশিনটি চালু করা হয়নি।

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের দন্ত সংরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন এ বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসে গড়ে ১৪০-১৫০ জনের মতো রোগী। তাদের মধ্যে ২৫-৩০ জনের রুট ক্যানাল করার প্রয়োজন হয়। পোরসেলিন মেশিনটি চালু না হওয়ায় এখানে আসা রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। এতে গরিব ও হতদরিদ্র রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর-১৪-তে অবস্থিত ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা বিভিন্ন রোগী ও  তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোরসেলিন মেশিনটি চালু না হওয়ায় এ হাসপাতালে রুট ক্যানাল করানোর পর ক্যাপ বসানো সম্ভব হচ্ছে না। এ সুযোগে হাসপাতালের আশপাশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। হাসপাতাল থেকে ফোন করার পর ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এসে দাঁতে ক্যাপ বসিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। এর বিনিময়ে তারা রোগীদের কাছ থেকে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা আদায় করছেন। অথচ সরকারি হাসপাতালে ক্যাপ তৈরি করা সম্ভব হলে রোগীরা নামমাত্র মূল্যে সেবাটি গ্রহণ করতে পারত।

দন্ত বিশেষজ্ঞরা জানান, দাঁতের চারটি অংশ রয়েছে। এর মধ্যে দাঁতের অ্যানামেল ও ডেন্টিন অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলে দাঁতে তীব্র ব্যথা অনুভব হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে দাঁতে রুট ক্যানাল করতে হয়। রুট ক্যানাল করার পর সংশ্লিষ্ট দাঁতের মধ্যে একটি ক্যাপ বসানো হয়। এতে ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতটি হুবহু আসল দাঁতের মতো দেখায়। আর এটি করতে হলে রোগীর দাঁতের সঠিক মাপ দিয়ে ক্যাপ তৈরি করতে হয়। এ ক্যাপ তৈরিতে পোরসেলিন মেশিনের প্রয়োজন হয়।

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের একজন টেকনিশিয়ান জানান, পোরসেলিন মেশিনটি চালু ও ক্যাপ তৈরিতে মূল ভূমিকায় রয়েছেন টেকনিশিয়ানরা। এছাড়া মেডিকেল টেকনোলজিস্টরাও এ ক্যাপ বসানোর কাজে ভূমিকা পালন করে থাকেন। কিন্তু পোরসেলিন মেশিনটি কেনার পর তাদের পরিবর্তে চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ গিয়ে পরিবার নিয়ে ঘুরে এসেছেন। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

গত সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতাল ভবনের দোতলার পশ্চিম পাশে বেশকিছু ডেন্টাল চেয়ার ও অন্যান্য মালামাল স্তূপ রাখা হয়েছে। তৃতীয় তলার পশ্চিম পাশেও পুরনো ডেন্টাল চেয়ার স্তূপ করে রাখা হয়েছে। আর হাসপাতালের চতুর্থ তলায় অবস্থিত পোরসেলিন মেশিনটি একটি কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে। ওই কক্ষ তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। তবে ভেতরে তিন-চারটি বৈদ্যুতিক ফ্যান ঘুরতে দেখা গেছে। এছাড়া হাসপাতালের এ ফ্লোরে অনেক টাকা ব্যয়ে একটি ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু লোকবলের অভাবে সেটিও চালু করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের তৃতীয় তলায় পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ব্যক্তিগত কাজে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত রয়েছেন বলে জানা গেছে। হাসপাতালের উপপরিচালকের পদটিও প্রায় দুই মাস ধরে শূন্য রয়েছে। আর সহকারী পরিচালক সরকারি কাজে মালয়েশিয়া সফরে রয়েছেন। অর্থাৎ পুরো হাসপাতালটি অভিভাবকবিহীন অবস্থায় চলছে। 

পোরসেলিন মেশিন চালু না হওয়া প্রসঙ্গে হাসপাতালের অর্থোডন্টিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. বোরহান উদ্দিন হাওলাদার বণিক বার্তাকে  বলেন, পোরসেলিন মেশিনটি ঠিক আছে। কিন্তু কিছু সমস্যার কারণে বর্তমানে মেশিনটি চালু করা যাচ্ছে না। তবে মেশিনটি শিগগিরই পাশের ভবনের ল্যাবে স্থাপন করা হবে। তখন এখান থেকে চিকিৎসাসেবা পাবে রোগীরা।