সম্পাদকীয়

মুক্ত বাণিজ্যের প্রকৃত সমস্যা

জয়তী ঘোষ | ১৮:০০:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৮

‘বিশ্বায়নের’ সমালোচকের অভাব নেই। এসব সমালোচকের মধ্যে বেশির ভাগের কাছে বাণিজ্য হলো ভিলেন বা খলনায়ক। কারণ তাদের যুক্তি হলো, বৈষম্য বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের মধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ানোর জন্য দায়ী বাণিজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ট্যারিফ বৃদ্ধি শুরু করেছেন, তার পেছনে এ যুক্তি প্ররোচকের ভূমিকা পালন করছে। তাহলে কেন শ্রমিক অন্তর্ভুক্তির বার্তা যুক্তরাষ্ট্র এমনকি উন্নত অর্থনীতিগুলো ছাড়িয়ে বহু উন্নয়নশীল দেশে অনুরণিত হচ্ছে, যেগুলোকে সাধারণত বিশ্বায়নের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়?

নামেমাত্র মুক্ত বাণিজ্য— একমাত্র কিংবা মৌলিকভাবে— বিশ্বজুড়ে বৈষম্য ও অনিশ্চয়তার উৎস। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে একটি স্থায়ী সমস্যা, যা অনেক কম জনপ্রিয় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া উদ্রেক করেছে তা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে বিনিয়োগের আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে এবং ওইসব ঝুঁকি তৈরির সম্ভাবনা বৃদ্ধি করছে, যেগুলোর কারণে ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল।

এর ওপর কিছু দেশ রাজস্ব কৃচ্ছ্রসাধন চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ এ দেশগুলোর উচিত নিজেদের বাজেট সুসংহত করার প্রতি মনোযোগ বাড়ানো। বড় কোম্পানি ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের বিরাট আকারের কর ফাঁকি কিংবা এড়ানোর বিষয়টি আমলে নেয়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এটা করা যেতে পারে। অন্যদিকে শ্রম-সঞ্চয়ী উদ্ভাবন এগিয়ে যাচ্ছে এতে কিছু দলের মধ্যে ‘প্রযুক্তিগত বেকারত্ব’ সৃষ্টি হচ্ছে।

কেউ কেউ যুক্তি দেখাবেন, মুক্ত বাণিজ্য প্রভাবশালী হয়ে উঠছে শুধু এ কারণে যে, মানুষ বোঝে না নিজেদের জন্য সবচেয়ে ভালো কোনটা। তবে এটি কিন্তু একই সঙ্গে অনুগ্রাহক ও সরল। এমনকি মুক্ত বাণিজ্য শেষ পর্যন্ত বিস্তৃতভাবে উপকারী হলেও যে বিষয়টি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হলো, বাণিজ্য যতই স্বাধীনতর হয়ে উঠছে, বৈষম্য ততই বাড়ছে।

এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো, বর্তমান বৈশ্বিক নিয়মকানুনগুলো অল্প কিছু বড় কোম্পানিকে বাণিজ্য থেকে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আদায় করে নেয়ার বিষয়টি অনুমোদন করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিকভাবে ভ্যালু চেইন পদ্ধতির বিস্তার শক্তিশালী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের পণ্য ও সেবার নকশা, উৎপাদন ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ করার বিস্তর ক্ষমতা দিয়েছে। এমনকি যদিও বিভিন্ন বিভাগ বা কাজের অংশবিশেষ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ছোট কোম্পানিগুলোকে দেয়া হচ্ছে, তবে এরা চূড়ান্ত বাজার থেকে কিন্তু বহুদূরে থাকে।

এসব ফার্ম প্রায়ই মেধাস্বত্বের একচেটিয়া অধিকার থেকে লাভবান হচ্ছে, যেটিকে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলো আরো চাঙ্গা করেছে। একক মেধাস্বত্বের পদ্ধতির নকশা করা হয়েছে করপোরেট শক্তিকে শক্তিশালী করার জন্যই। এটি কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের ‘ইকোনমিক রেন্ট’ অর্জনে সহায়তা করছে, বিশেষ করে প্রি-প্রডাকশন (নকশাসহ) ও পোস্ট-প্রডাকশন (মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং) স্তরে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ভ্যালু অ্যাডেড ও মুনাফা অর্জিত হয়।

এদিকে উৎপাদন স্তরে বাড়তে থাকা তীব্র প্রতিযোগিতা পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়, তাই প্রকৃত উৎপাদকদের (তা সে নিয়োগদাতা অথবা শ্রমিক যে-ই হোক না কেন) ভ্যালু পাই চার্টে অংশ হ্রাস পায়। এ পদ্ধতির ফল হলো, অনেক উন্নয়নশীল দেশ, যাদের ভ্যালু চেইনের বিশ্বায়ন হতে সুবিধা পাওয়ার কথা, তারা নিম্ন-উৎপাদনশীলতা কার্যক্রমে এখনো আটকে রয়েছে, যে কার্যক্রম শুধু সীমিত অর্থনৈতিক মূল্য যোগ করে এবং এমনকি বিস্তৃত প্রযুক্তিগত হালনাগাদকেও উৎসাহিত করে না।

বণিক বার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।

সম্পাদক ও প্রকাশক: দেওয়ান হানিফ মাহমুদ

বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বিডিবিএল ভবন (লেভেল ১৭), ১২ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫

পিএবিএক্স: ৮১৮৯৬২২-২৩, ই-মেইল: [email protected] | বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন বিভাগ ফ্যাক্স: ৮১৮৯৬১৯