দেশের খবর, নাটোর

রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদ

স্থাপত্যশৈলীর বিকৃত অংশ ভেঙে আবার বিকৃতি

বণিক বার্তা প্রতিনিধি নাটোর | ২১:৩৭:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৮

নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে সংস্কারকাজ করার ফলে সম্প্রতি নাটোরের রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের কিছু অংশে স্থাপত্যশৈলীর বিকৃতি ঘটেছিল। সেই বিকৃতি সারাতে গিয়ে আবারো বিকৃতি ঘটিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

গত ২ সেপ্টেম্বর বণিক বার্তায় ‘নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে সংস্কার: রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের স্থাপত্যশৈলীর বিকৃতি’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর পর থেকেই নড়েচড়ে বসেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের ছোট তরফে স্থাপত্যশৈলীর বিকৃত অংশ ভেঙে ফেলে তা পুনরায় সংস্কারের জন্য পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকে কামাল হোসেন নামের এক নির্মাণ শ্রমিককে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু বিকৃত অংশ সংস্কার করতে গিয়ে পুনরায় স্থাপত্যশৈলীর বিকৃতি ঘটিয়েছেন এ নির্মাণ শ্রমিক। নাটোরের ঐতিহ্য এ রাজবাড়ির স্থাপত্যশৈলীর এমন বিকৃতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয়রা। এ অবস্থায় রাজবাড়ি পরিদর্শন করে বিকৃত অংশের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন।

এদিকে স্থাপত্যশৈলীর একই স্থানে দ্বিতীয়বার বিকৃতির ঘটনা ঘটলেও ওই নির্মাণ শ্রমিকের দাবি তিনি সঠিক আকৃতি দিয়ে তা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারবেন। গতকাল দুপুরে রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদে গিয়ে কথা হয় নির্মাণ শ্রমিক কামাল হোসেনের সঙ্গে। এ সময় তিনি রাজবাড়ির ছোট তরফের বিকৃত ভাস্কর্য মেরামত করছিলেন।

কামাল হোসেন বলেন, আমি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে কাজ করছি। পেশায় একজন সাধারণ নির্মাণ শ্রমিক হলেও এই অধিদপ্তরের অধীন বিভিন্ন সংস্কারকাজে অংশ নিয়েছি। এ কাজে আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন অংশের বিকৃতির বিষয়ে তিনি বলেন, আগের মিস্ত্রি (নির্মাণ শ্রমিক) ভাস্কর্য না অন্য কিছু বানিয়েছেন সেটা বলা কঠিন। কারণ সবগুলো কাজের বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। তার একটা কাজও ঠিকমতো হয়নি। আশা করছি ভাস্কর্যের কাজ করে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারব।

এদিকে চারুশিল্পীরা বলছেন, সাধারণত ঐতিহাসিক স্থাপনার কাজ করতে গেলে মোল্ড বা ছাঁচের মাধ্যমে নির্মাণ করতে হয়। কিন্তু তা না করে দেখে দেখে নির্মাণ করা হচ্ছে। তাও আবার অনভিজ্ঞ নির্মাণ শ্রমিক দিয়ে। এতে করে পুনরায় বিকৃতি ঘটছে স্থাপত্যশৈলীতে।

এ বিষয়ে শিল্পী সৈয়দ মাসুম রেজা বলেন, নাটোর রাজবাড়িতে চুন, সুরকি দিয়ে গ্রিক শিল্পরীতি ধাঁচের ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য সংস্কার করার আগে পুরনো ভাস্কর্য থেকে মোল্ড বা ছাঁচ ব্যবহার করে রেপ্লিকা তৈরি করে নিতে হয়। এরপর সংস্কার করলে হুবহু মিলে যাবে। কিন্তু এখানে সংস্কারকাজে সেসব কিছুই করা হচ্ছে না। একজন অনভিজ্ঞ নির্মাণ শ্রমিক দেখে দেখে ভাস্কর্য তৈরি করছেন। যার কারণে বিকৃতি ঘটছে।

এর আগে ২০০৩ সালে নাটোর রাজবাড়ি সংস্কার করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। সে সময়ও বিকৃতি ঘটানো হয় রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদের বড় তরফ ও ছোট তরফের স্থাপত্যশৈলীতে। এর দেড় দশক পর আবারো ঐতিহাসিক এ স্থাপনায় বিকৃতির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সচেতন নাটোরবাসী।

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য পরিতোষ অধিকারী বলেন, রানী ভবানীর রাজবাড়ি নাটোরের ইতিহাসের একটি অংশ, একটি ঐতিহ্য। কিন্তু সংস্কারের নামে এই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে নষ্ট করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। আগামী প্রজন্ম এই ভুল জিনিসগুলো দেখে বড় হোক, এটা আমরা চাই না। আমরা চাই অভিজ্ঞ শিল্পী দিয়ে রাজবাড়িটি সংস্কার করা হোক।

এদিকে গণমাধ্যমে স্থাপত্যশৈলী বিকৃতির সংবাদ দেখে গত সোমবার সকালে রানী ভবানীর রাজপ্রাসাদ পরিদর্শন করেন নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন। তার সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ড. রাজ্জাকুল ইসলাম ও চিত্রশিল্পী সৈয়দ মাসুম রেজা। জেলা প্রশাসক রাজপ্রাসাদটির বিকৃত অংশ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

এ সময় তিনি বলেন, এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িকে সংস্কারের নামে যাচ্ছেতাই করা হচ্ছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। আমি সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি। তাছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিষয়টি ফোনে জানাব।