প্রথম পাতা

বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার

অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ গ্রাহকের, কর্তৃপক্ষের নাকচ

ইয়ামিন সাজিদ | ০১:০৩:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮

রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসিন্দা তারেক হোসেন। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) এ গ্রাহক ছয় মাস ধরে প্রি-পেইড মিটারে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করে আসছেন। একটি ফ্ল্যাট বাসার বিদ্যুৎ বিল হিসেবে আগে যেখানে মাসে ৬০০ টাকা পরিশোধ করতেন, এখন সেখানে মাসে ১ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে তাকে।

একই অভিযোগ করেছেন শান্তিনগরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান। তিনি জানান, প্রি-পেইড মিটারে গতকাল ১ হাজার টাকা রিচার্জ করেছেন। ১৮-২০ দিন পর আবারো রিচার্জ করতে হতে পারে। আগে পুরো মাসেই বিদ্যুৎ বিল আসত প্রায় ১ হাজার টাকা। প্রি-পেইড মিটার চালুর পর থেকে বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসে দেড় হাজার টাকার মতো ব্যয় হয় তার।

শুধু তারেক হোসেন বা হাফিজুর রহমান নন, প্রি-পেইড মিটার চালুর পর থেকে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রায় সবক’টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে। তবে বিতরণ কোম্পানিগুলো এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, প্রি-পেইড মিটারের গ্রাহক যতটুকু বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, ট্যারিফ অনুযায়ী ঠিক ততটুকুর বিলই পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রি-পেইড মিটারের কারণে অতিরিক্ত বিল নেয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, প্রি-পেইড মিটারের যে বিল গ্রাহক পেয়ে থাকেন, সেটা রিয়েল টাইম ক্যালকুলেশন। এর মধ্যে কোনো ধরনের জালিয়াতির সুযোগ নেই। যারা আগে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করতেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী ছিলেন না, তাদের কাছে প্রি-পেইড মিটারের বিল বেশি মনে হতে পারে।

কেবল অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ উঠছে তা নয়, প্রি-পেইড মিটারের কারণে আর্থিক সাশ্রয় হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অনেকে। প্রি-পেইড মিটার নেয়ার পর আগের চেয়ে এখন বিদ্যুৎ বিল কম আসে বলে জানিয়েছেন চামেলীবাগের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন তপু। তিনি বলেন, আগে মিটার রিডারদের ভুলের কারণে অনেক সময় বেশি বিল দিতে হয়েছে। কোনো কোনো মাসে ৫ হাজার টাকাও পরিশোধ করতে হয়েছে। তবে এখন মাসে ৩ হাজার টাকা রিচার্জ করলেই যথেষ্ট।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ছয়টি বিতরণ কোম্পানির আওতায় সারা দেশে বর্তমানে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০টি প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে বিপিডিবি কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও সিলেট জোনে নিজেদের ২৬ লাখ গ্রাহকের মধ্যে মোট ১০ লাখ গ্রাহককে কি-প্যাড প্রি-পেইড মিটার দিয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) ৮০টি সমিতির আওতায় ২ কোটি ৩১ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ৬২ হাজার ৫০০ গ্রাহককে একই ধরনের প্রি-পেইড মিটার দিয়েছে।

এছাড়া ডিপিডিসি নিজেদের মোট ১১ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৫০ জনকে প্রি-পেইড মিটার ও স্মার্ট কার্ড বিতরণ করেছে। ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) তাদের ৮ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ১১ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ৭০ হাজার গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার ও স্মার্ট কার্ড দিয়েছে। পাশাপাশি রাজশাহী ও রংপুরে ৩০ হাজার কি-প্যাড প্রি-পেইড মিটারভুক্ত গ্রাহক রয়েছেন নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) আওতায়।

গতকাল মালিবাগে ডিপিডিসির এনওসি অফিস থেকে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার অনুমোদন রয়েছে, এমন একজন গ্রাহক ১ হাজার টাকা রিচার্জ করেন। এই ১ হাজার টাকা থেকে মিটার চার্জ, ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জ বাবদ ১৩৯ টাকা কেটে নেয়া হয়। আর বিদ্যুৎ বিল বাবদ দেয়া হয় ৮৬১ টাকা।

ওই গ্রাহক জানান, ২০-২২ দিন পর হয়তো তাকে আবারো রিচার্জ করতে হবে। তবে টাকা শেষ হওয়ার আগে কয়েকবার মিটার সিগন্যাল দেবে। আর যেদিন টাকা শেষ হবে, ওইদিন যদি সাপ্তাহিক বন্ধ কিংবা সরকারি ছুটির দিন হয়, তবে পরবর্তী কার্যদিবস পর্যন্ত অগ্রিম বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যাবে, যা অফিস খোলার দিন রিচার্জের সময় কেটে রাখা হবে।

এদিকে প্রি-পেইড মিটার সঠিকভাবে কাজ করে কিনা, তা নিয়ে অনেক গ্রাহক প্রশ্ন তুলেছেন। গ্রাহকের কাছে বিতরণের আগে মিটারগুলো পরীক্ষা করে দেয়া হয় কিনা, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন কেউ কেউ। ডিপিডিসির গুলবাগ এনওসিতে প্রি-পেইড মিটার অভিযোগ কেন্দ্রে কর্মরত মোহাম্মদ সুমন জানান, মিটারকেন্দ্রিক নানা অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। অনেক সময় স্মার্ট কার্ড সমস্যা নিয়েও আসেন অনেকে। তবে যাদের ওয়্যারিং সিস্টেম পুরনো, তাদের বিদ্যুৎ খরচ একটু বেশি হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির চেয়ারম্যান বলেন, খুবই দক্ষ কয়েকটি চীনা কোম্পানি এসব মিটার তৈরি করছে। কোনো মিটারই পরীক্ষা ছাড়া গ্রাহকের কাছে পাঠানো হয় না।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের শুরুর দিকে মিটার চার্জ যোগ হওয়ার কারণে খরচ কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে ধীরে ধীরে মিটারের চার্জ পরিশোধ হলে খরচও কমে যাবে।

এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তামিম বলেন, অতিরিক্ত বিলের পেছনে দুটো কারণ থাকতে পারে। একটি হচ্ছে, কিছু মিটারে কারিগরি ত্রুটি থাকতে পারে, যে কারণে বেশি বিল আসছে হয়তো। আর অন্যটি হচ্ছে, তারা আগে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কম বিল দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেটা পারছেন না।