প্রথম পাতা

৯০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে গ্যাসের বরাদ্দপত্র ইস্যু হচ্ছে

সুজিত সাহা ও ইয়ামিন সাজিদ | ০০:০৬:০০ মিনিট, আগস্ট ১৮, ২০১৮

বর্তমানে শিল্পে ব্যবহৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ৭ টাকা ৭৬ পয়সা। এলএনজি আমদানির যুক্তি দেখিয়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম প্রায় ১৫ টাকা ধরে বরাদ্দপত্র (ডিমান্ড নোট) ইস্যু করছে গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো। অর্থাৎ গ্যাসের দাম বিদ্যমান হারের চেয়ে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে ধরছে তারা। একইভাবে বর্ধিত মূল্য ধরে বরাদ্দপত্র দেয়া হচ্ছে ক্যাপটিভ পাওয়ারেও।

যদিও এলএনজির কারণে গ্যাসের দাম বাড়বে— এই যুক্তিতে সব ধরনের গ্যাসের দাম ৭৫ শতাংশ বাড়াতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলো। প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হলেও নতুন মূল্যহার এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তার আগেই বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজেদের তৈরি মূল্যহারে শিল্প ও ক্যাপটিভে ডিমান্ড নোট ইস্যুকে অযৌক্তিক বলছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা সরকারকে গ্যাস সংযোগে সারা দেশে একই মূল্যহার রাখার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সেটা আমলে নেয়া হচ্ছে না। সরকারি নির্দেশনার আগে এভাবে অতিরিক্ত দাম আদায় করলে শিল্প ও দেশের অর্থনীতির জন্য তা ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সংযোগের আবেদনের বিপরীতে ৬২৮টি ডিমান্ড নোট ইস্যু করেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। যেখানে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এসব ডিমান্ড নোটের বিপরীতে এরই মধ্যে টাকাও জমা দিয়েছেন ২৭৪ জন গ্রাহক। পরীক্ষামূলকভাবে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে ডিমান্ড নোটপ্রাপ্ত সব গ্রাহকই টাকা জমা দিয়ে দেবেন বলে মনে করছে কেজিডিসিএলের বিপণন বিভাগ।

ডিমান্ড নোটপ্রাপ্ত একজন গ্রাহকের ভাষ্য, নতুন গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে কেজিডিসিএলের দেয়া ডিমান্ড নোটে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এলএনজি সরবরাহের আগেই বিতরণ কোম্পানিগুলোর গ্যাসের দাম বাড়ানোর এ প্রবণতা উৎপাদনমুখী শিল্পের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

তবে নতুন গ্রাহকদের জন্য ডিমান্ড নোটে যে দর দেয়া হচ্ছে, তা স্থায়ী নয় বলে জানান কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খায়েজ আহমেদ মজুমদার। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সরকার এলএনজি আমদানির পর শিল্পসহ সব ধরনের গ্রাহকের গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণ করবে। সরকারি ঘোষণা আসার পর নতুন-পুরনো সব গ্রাহকের জন্যই একই দর নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে পুরনো গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া জামানত থেকে নতুন দর সমন্বয় করা হবে।

বিইআরসি ঘোষিত সর্বশেষ মূল্যহার অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় ভারিত মূল্য ৭ টাকা ৩৯ পয়সা। তবে গ্রাহকের শ্রেণীভেদে গ্যাসের মূল্যহারে কম-বেশি আছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে ব্যবহূত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান মূল্য ৯ টাকা ৬২ পয়সা। এছাড়া শিল্পে ৭ টাকা ৭৬ পয়সা ও বাণিজ্যিকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের মূল্য ১৭ টাকা ৪ পয়সা।

এলএনজি আমদানির কারণে সব ধরনের গ্যাসের দাম ৭৫ শতাংশ বাড়াতে বিইআরসিতে প্রস্তাব দিয়েছে ছয় বিতরণ কোম্পানি। তাতে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ টাকা ৯৫ পয়সা। এর মধ্যে ক্যাপটিভে ৯ টাকা ৬২ পয়সার পরিবর্তে  প্রতি ইউনিটের মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে ১৬ টাকা ও শিল্পে ১৫ টাকা। জুনের মাঝামাঝি এ প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হলেও এখন পর্যন্ত নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেনি জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

বিইআরসির ঘোষণার আগেই বর্ধিত মূল্যহারে ডিমান্ড নোট ইস্যু ব্যবসায়ীদের বিপাকে ফেলবে বলে জানান চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি মাহবুব চৌধুরী। তিনি বলেন, চলতি বছরের শুরুতে এলএনজি এলেও এখন পর্যন্ত তা সরবরাহ করা যায়নি। এলএনজি সরবরাহের আগেই গ্যাসের দাম ১৪ টাকায় নিয়ে যাওয়া হলে ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়বেন।

কেজিডিসিএলের মতো অন্য বিতরণ কোম্পানিও এলএনজি আমদানিকে কেন্দ্র করে বর্ধিত মূল্যে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ডিমান্ড নোট ইস্যু করছে বলে জানা গেছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস পর্যন্ত তিতাসসহ চারটি বিতরণ কোম্পানি থেকে শিল্পে ৫০৩টি গ্যাস সংযোগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যেখানে তিতাসের গ্রাহকের সংখ্যাই বেশি।

জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন বিভাগ) প্রকৌশলী রানা আকবর হায়দারী বলেন, এখন নতুন করে কোনো সংযোগের আবেদন নেয়া হয় না। ফলে অতিরিক্ত দাম ধরে ডিমান্ড নোট ইস্যুর সুযোগ নেই।

গ্যাসের দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বিইআরসি। সংস্থাটির নির্ধারিত মূল্যেই গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস বিক্রির বাধ্যবাধকতা রয়েছে বিতরণ কোম্পানিগুলোর। বিইআরসির আইন অনুযায়ী, এর কম বা বেশি দামে গ্যাস বিক্রির সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার আদেশ ছাড়া এভাবে মূল্যবৃদ্ধি বিইআরসির আইনের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, বিইআরসির আদেশ ছাড়া বিতরণ কোম্পানিগুলো এটি করতে পারে না। এটি বিইআরসি আইনের ৪০ ও ৪২ ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। আদালতে মামলা হলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানিকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।

বিতরণ কোম্পানির এ ধরনের তত্পরতা বেআইনি বলে মত দেন বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মো. আব্দুল আজিজ খানও। তিনি বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামেই বিতরণ কোম্পানিগুলোকে গ্যাস বিতরণ করতে হবে। এর বাইরে বেশি দাম নেয়া অপরাধ।

উল্লেখ্য, গ্যাস সংকট মোকাবেলায় এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মাণ করা হয়েছে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল। এপ্রিলের ২৪ তারিখ এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশে আসে কমিশনিং জাহাজ। মে মাস থেকে ওই গ্যাস সঞ্চালন পাইপে গ্রাহক পর্যায়ে দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত তিন মাসেও গ্রাহককে গ্যাস দিতে পারেনি পেট্রোবাংলা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যোগ করার ঘোষণা দিয়েও ব্যর্থ হয় তারা।