পণ্যবাজার

বাণিজ্যযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের বড় অস্ত্র এলএনজি

অয়েলপ্রাইস ডটকম | ১৯:৫৮:০০ মিনিট, আগস্ট ১৮, ২০১৮

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বছরে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তুলনামূলক উষ্ণ ছিল। ট্রাম্পের ঐতিহাসিক বেইজিং সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত হূদ্যতা বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়েছিল। শি জিনপিংকে ‘বন্ধু’ বলেও সম্বোধন করেছিলেন ট্রাম্প। তবে বছর ঘুরতেই শি-ট্রাম্পের ‘বন্ধুত্ব’ ফিকে হয়ে এসেছে। ট্রাম্পের মেয়াদের দ্বিতীয় বছরে এসে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়েছে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতি। এক বছরের মধ্যে পরস্পরের পণ্যের ওপর দ্বিতীয়বারের মতো পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করেছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।

চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য চীনের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি দূর করা। একই সঙ্গে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসা ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ও রফতানি খাতকে আরো চাঙ্গা করতে চান। বিশেষত মার্কিন শেল খাতে (পাথুরে ভূমি থেকে উত্তোলন হওয়া জ্বালানি তেল ও গ্যাস) বিদ্যমান প্রবৃদ্ধি ট্রাম্পকে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ২০১৯-২০ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানিকারক দেশগুলোর তালিকায় কাতারের পর দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।

এমন পরিস্থিতিতে এলএনজিকে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে ওয়াশিংটনের বিপক্ষে বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র বিবেচনা করা হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ মোকাবেলা ও জলবায়ু পরিবর্তনের হার কমিয়ে আনতে তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারে ঝুঁকেছে চীন। এ কারণে দেশটিতে এলএনজির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি পণ্যটির বাড়তি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে দেশটি। চলতি বছরের মধ্যেই এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোর বৈশ্বিক তালিকায় দক্ষিণ কোরিয়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসবে চীন।

জ্বালানি পণ্যটির আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল দেশটি। বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাত হাজার কোটি ডলারের পণ্য আমদানির কথা জানিয়েছে বেইজিং। এর মধ্যে বড় একটি অংশ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে।

বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে চীন সয়াবিনসহ একাধিক মার্কিন পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করলেও ব্যতিক্রম ছিল এলএনজি। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানিতে বাড়তি শুল্ক চীনের বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম বাড়িয়ে অর্থনীতির গতি শ্লথ করতে পারে বলে মনে করছেন চীনা নীতিনির্ধারকরা। তবে বাড়তি শুল্কযুক্ত মার্কিন পণ্যের তালিকায় এলএনজির নাম বিবেচনায় রয়েছে তাদের। এ কারণেই এলএনজিকে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে সবচেয়ে বড় চীনা অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

মার্কিন এলএনজিতে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হলে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি রফতানি খাত বড় ধাক্কা খাবে। জ্বালানি পণ্যটির রফতানি কমে মজুদ বাড়তে শুরু করবে। অন্যদিকে চীনে এলএনজির সরবরাহ কমে যাবে কয়েক গুণ। এর জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামে বড় ধরনের উত্থান-পতন দেখা যেতে পারে। এর ফলে এলএনজি ব্যবহারকারী অন্য দেশগুলোর আর্থিক লোকসানের ঝুঁকি রয়ে যায়।

এদিকে চীনা বাজার সংকুচিত হয়ে এলে যুক্তরাষ্ট্র এলএনজি রফতানির নতুন বাজার খুঁজতে শুরু করবে। এক্ষেত্রে জ্বালানি পণ্যটির ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ আমদানিকারক দেশগুলোর সামনে ছাড়কৃত মূল্যে এলএনজি আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বাড়তি শুল্কের কারণে মার্কিন এলএনজির দাম বেড়ে গেলে চীনা আমদানিকারকরা এলএনজি আমদানির নতুন উেসর সন্ধান করবে। এতে কাতার, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারক দেশগুলোর সামনে নতুন বাজার বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। 

এ বিষয়ে মার্কিন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নিল অ্যাটকিনসন বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে মার্কিন এলএনজিতে বাড়তি শুল্ক আরোপের চীনা পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের জন্য বড় একটি আঘাত হিসেবে দেখা দেবে। এ পরিকল্পনা সত্য হলে তা বেইজিং-ওয়াশিংটন দুই পক্ষের জন্যই আর্থিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে এর ফলে এলএনজির অন্যান্য রফতানিকারক ও আমদানিকারক দেশের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।