আন্তর্জাতিক ব্যবসা

ইরান পারমাণবিক চুক্তি বাঁচাতে ইইউর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

বণিক বার্তা ডেস্ক | ২১:১২:০০ মিনিট, মে ১৭, ২০১৮

ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তিটি সুরক্ষার জন্য নয় দফা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে। খবর এএফপি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে সম্পাদিত ঐতিহাসিক চুক্তিটি থেকে নিজ দেশকে প্রত্যাহার করার পর ইরানকে এ চুক্তিতে ধরে রাখার জন্য নানা চেষ্টা করে যাচ্ছে ইইউ। এ চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ওপর শাস্তিমূলক আন্তর্জাতিক অবরোধ তুলে নেয়ার শর্তে নিজের পারমাণবিক প্রকল্প স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় তেহরান।

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ সত্ত্বেও চুক্তিটি সম্পন্নের পর ইরান যেসব অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে আসছে, ইউরোপ সেগুলো অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি না দিলে কোনো বাধা ছাড়াই ‘বড় মাত্রায়’ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ ব্রাসেলসে ইইউর বৈদেশিক নীতি বিষয়ক প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি এবং পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী তিন দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

মোঘেরিনি জানান, ইইউর বিশেষজ্ঞরা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নয় দফা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেবে। এসব দফার মধ্যে আছে ইরানকে তেল ও গ্যাসপণ্য বিক্রি করার নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়নে প্রবেশাধিকার।

বৈঠকের পর জারিফ সাংবাদিকদের বলেন, আমি বিশ্বাস করি এটি একটি ভালো সূচনা। আমরা এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত করতে না পারলেও প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরান আশা করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিশ্চয়তা-বিষয়ক অগ্রগতি হবে।

মোঘেরিনি স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, সেটা পাশ কাটিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানি এটি একটি কঠিন কাজ, তবে কাজটি করার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং সেটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে এর মধ্যেই আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি।

মোঘেরিনি জানান, এ বিষয়ে ইইউ বিশেষজ্ঞরা এর মধ্যেই যে নয়টি মূল ক্ষেত্রে  মনোযোগ দিচ্ছেন, সেসবের মধ্যে আছে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা, ইরানের তেল ও গ্যাস বিক্রির অনুমোদন অব্যাহত রাখা এবং ইইউর যেসব কোম্পানি ইরানে ব্যবসা করছে, তাদের সুরক্ষা দেয়া। এছাড়া ইরানে ব্যবসা করার জন্য বিশেষায়িত অর্থায়ন মাধ্যম কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সে ব্যাপারেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইইউ।

ইইউ দাবি করছে, ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি কার্যকর আছে। এ চুক্তিটি সুরক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধতা প্রদর্শনের জন্য আজ সোফিয়াতে শীর্ষ সম্মেলনের আগে ইইউর নেতারা একটি নৈশভোজে যোগ দেবেন বলে জানান ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড টাস্ক।

নেতাদের উদ্দেশে এক বার্তায় টাস্ক বলেন, আমি আশা করছি আমাদের আলোচনা পুনরায় কোনো সন্দেহ ছাড়াই নিশ্চিত করবে যে, যতক্ষণ ইরান চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলে, ইইউ সেটিকে শ্রদ্ধা জানাবে।

ইইউভুক্ত, বিশেষত ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিষ্ঠানগুলো ২০১৫ সালের চুক্তিটির পর ইরানে ব্যাপক আকারে বিনিয়োগ করেছে। গত বছর ইরানে জার্মান রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ইউরো, ফ্রান্সের রফতানি ২০১৫ সালের ৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ কোটি ইউরোতে উন্নীত হয় এবং তেল জায়ান্ট টোটাল গ্যাস সাউথ পারস গ্যাসক্ষেত্রে ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ইচ্ছা পোষণ করেছে।

গত সপ্তাহে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়ার সময় ট্রাম্প ছয় মাসের মধ্যে ইরানে ব্যবসা গুটিয়ে না নিলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় কঠোর শাস্তির হুমকি দেন। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে— চুক্তিটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি হ্রাসে কিছুই করছে না। চুক্তির ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে মোঘেরিনি মঙ্গলবার জানান, চুক্তিটিতে পরিবর্তন, সংস্কার বা কোনো কিছু সংযোজনের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, আমরা চুক্তিটির সংস্কার কিংবা সংযোজন নিয়ে মোটেই আলাপ করছি না, বরং চুক্তিটি সুরক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপের ব্যাপারে আলোচনা করছি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা আরেকটি দেশ কিউবার সঙ্গে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি চুক্তি করেছে ইইউ। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পেরিলার সঙ্গে বৈঠকে কমিউনিস্ট শাসিত দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ আখ্যা দেন মোঘেরিনি।

আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে কিউবার এক-চতুর্থাংশ জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রাপ্তির লক্ষ্যে দুই পক্ষ ২ কোটি ১৫ লাখ ইউরোর একটি চুক্তি করে। এছাড়া ইইউ দ্বীপদেশটির খাদ্যনিরাপত্তা প্রকল্পে ১ কোটি ৯৭ লাখ ইউরো প্রদানের পরিকল্পনা করেছে।

ইইউ কিউবাতে বৃহত্তম বিনিয়োগকারী হিসেবে মূলত পর্যটন ও অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করে। এছাড়া গত বছর কিউবা থেকে ব্লকটি ৪৭ কোটি ইউরো মূল্যমানের আমদানি এবং ২০০ কোটির বেশি মূল্যমানের পণ্য ও সেবা রফতানি করেছে।