টকিজ

কানে বাংলাদেশ, সাফল্য হতাশাজনক!

রুবেল পারভেজ | ২০:১৩:০০ মিনিট, মে ১৫, ২০১৮

চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জৌলুসময় মিলনমেলা হলো কান চলচ্চিত্র উৎসব। সাত দশকের বেশি সময় ধরে কান উৎসব তার সহজাত ক্রিয়াকলাপ দিয়ে সারা বিশ্বের চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক ও পরিবেশকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশ্বচলচ্চিত্রের সেরা পরিচালক, সেরা ছবি এ উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়।

অস্কার, চলচ্চিত্রের আরেক বিরাট আসর। কিন্তু কান অস্কারের চেয়ে আলাদা তার বৈশিষ্ট্যের কারণে। অস্কার অনেক বেশি বাণিজ্যিক, মানে হলিউড ছবিকেন্দ্রিক, কান তা নয়। কান উৎসব অনেক বেশি বৈশ্বিক। এখানে বাণিজ্যিক ছবির চেয়ে শৈল্পিক, ধ্রুপদ নির্মাণের স্বীকৃতি বেশি। ফলে বাণিজ্যিক ছবির ডামাডোল বাঁচিয়ে যেসব চলচ্চিত্র নির্মাতা ছবি নির্মাণ করে, কান তাদের উৎসব। ফলে কান সারা বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মিলনমেলা। সঙ্গত কারণেই এ উৎসবের প্রতি বাংলাদেশী চলচ্চিত্র নির্মাতা-বোদ্ধাদেরও দৃষ্টি রয়েছে। এবং ধীরে হলেও বাংলাদেশের সিনেমার সঙ্গে কানের একটা যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। ২০০২ সালে কানের ডিরেক্টরস ফোর্টনাইটের উদ্বোধনী ছবি হিসেবে মনোনীত হয়েছিল বাংলাদেশের নির্মাতা তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবিটি। এ পর্যন্ত কানে প্রদর্শিত এটিই কোনো বাংলাদেশী ছবির সেরা অর্জন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তারেকের এ অর্জনের পর ১৬ বছর পার হয়ে গেছে। কানের সম্মানজনক প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতামূলক কোনো বিভাগেই বাংলাদেশের আর কোনো ছবি ঢুকতে পারেনি। কান শুধু চলচ্চিত্রের প্রতিযোগিতার উৎসবই নয়, এটা ছবি বিকিনির জায়গাও। দেরিতে হলেও বাংলাদেশের প্রযোজক-নির্মাতারা এ সত্যটি উপলব্ধি করেছেন। এর সপক্ষে সর্বসাম্প্রতিক একটি উদাহরণই হাজির করি: কানের চলতি আসরে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়াকে বেশ উদ্যোগী মনে হয়েছে। এ বছর প্রতিষ্ঠানটির প্রধান আবদুল আজিজ তার প্রযোজিত নতুন ছবি ‘পোড়ামন ২’কে নিয়ে হাজির হয়েছেন উৎসবের বাণিজ্যিক শাখা ‘মার্শে দু ফিল্ম’ বিভাগে। যেখানে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ছবি দেখানো যায় উৎসবে আগত বিশ্বক্রেতাদের। প্রযোজকরা উৎসবের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে অর্থের বিনিময়ে নাম নিবন্ধন করে এবং প্রদর্শনীস্থল ভাড়া নিয়ে এ বিভাগে নিজেদের ছবি দেখাতে পারেন। নাম নিবন্ধনের জন্য প্রত্যেক প্রযোজককে গুনতে হয় ২৮২ দশমিক ৫০ ইউরো। আর প্রডিউচার্স নেটওয়ার্কের ব্যাজ পেতে হলে দিতে হয় ৩৩৯ ইউরো করে।

দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিকভাবে ছবি পৌঁছে দেয়া নিয়ে আবদুল আজিজ বলেছেন, ‘আমরা আমাদের ছবি পোড়ামন ২ নিয়ে কানের সেলস মার্কেটে এসেছি এ বছর। এখানে ছবিটির টিজার, পোস্টার, ট্রেইলার ও সিনেমা দেখানো হচ্ছে। আগত প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শকরা এসব পর্যবেক্ষণ করে খোঁজখবর নিচ্ছে। এখন তারা যদি এটি কিনতে ও প্রদর্শনী করতে আগ্রহী হয়, তাহলে নেবে।’ একই সঙ্গে আজিজ তার প্রতিষ্ঠানের সামনের কিছু পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাজের প্রযোজিত ছবি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাগৃহে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মুক্তি দিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে। এত দিন যেখানে বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে দেশীয় ছবি দেখানো হতো, সেখানে সেসব দেশের সমগ্র অডিয়েন্সের কথা বিবেচনা করে, বাণিজ্যিকভাবে প্রেক্ষাগৃহে সপ্তাহ ধরে যাতে ছবি চালানো যায়, সে উদ্যোগও নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, আগামী বছর থেকে জাজ মাল্টিমিডিয়া তাদের নিজস্ব প্যাভিলিয়ন নিয়ে কান উৎসবে হাজির থাকবে। যেখানে তাদের প্রযোজিত এ-যাবত্কালের সব ছবি থাকবে।

কান উৎসবের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দু ফিল্ম বিভাগ। সহজভাবে উদাহরণ দিয়ে বলা যেতে পারে, এ বিভাগটি একটি হাটবাজারের মতো। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় সারা বিশ্ব থেকে প্রযোজক, পরিচালকরা এ বাজারে তাদের ছবি নিয়ে আসেন এবং পণ্য বিক্রয়ের যত কৌশল আছে, তা প্রয়োগ করে আগত সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে ছবিটির নানা বিষয় তুলে ধরেন। তারপর সেটি যদি ক্রেতার পছন্দ হয়, তাহলে তিনি কিনে নিতে পারবেন কিংবা বাণিজ্যিকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুক্তি দিতে পারবেন। এ বিভাগে পৃথিবীর খ্যাতনামা সিনেমা ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।

কিন্তু এখানে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের কোনোই সাফল্য নেই এ পর্যন্ত।

২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো অনন্ত জলিল তার ছবি ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ নিয়ে এ বিভাগে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ও তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ‘অজ্ঞাতনামা’ ছবিটিও সেখানে অংশ নেয়। একই বছর ‘আয়নাবাজি নিয়ে কানের এ বিভাগে যোগ দেন প্রযোজক জিয়াউদ্দিন আদিল, গাউসুল আলম শাওন ও এর নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। এখানে অংশ নেয়া প্রত্যেকটি ছবিই প্রদর্শিত হয়েছে সারা বিশ্ব থেকে আগত প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শক, পরিচালকদের সামনে। কিন্তু কোনো সাফল্য নেই।

নির্মাতা অমিতাভ রেজাকে টকিজ প্রশ্ন করেছিল। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কানের মার্শে দু ফিল্ম বিভাগে অংশ নিয়ে আয়নাবাজির অর্জন কী? অমিতাভ রেজা বলেন, ‘না, তেমন কিছুই করতে পারেনি আয়নাবাজি।’

এই না পারার কারণ কী?

‘যেকোনো বাজারে কোনো পণ্য বিক্রি করতে গেলে সেই বাজারের ধরন, মার্কেটিং সিস্টেম, চরিত্র এবং অন্য বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। যেহেতু প্রথমবারের মতো গিয়েছিলাম, সেহেতু আমরা মার্কেট স্ট্র্যাটেজি বুঝতে পারিনি। ওখানে কীভাবে মার্কেটিং করতে হয়, তারও সুনির্দিষ্ট একটা সমীকরণ বা নীতিমালা আছে এবং সেই সমীকরণের জায়গা থেকে আমাদের একটিমাত্র ছবি নিয়ে লাভবান হওয়ার সুযোগ কম ছিল। কিন্তু জাজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব। কারণ তাদের কাছে নানা ধরনের ছবি আছে। তারা পুরো বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝে একটু কৌশলী হলেই এখান থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব’ —বলেন অমিতাভ।

অবশ্য প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ছবি বিক্রি করতে হবে, লাভবান হতে হবে— এমনটা মনে করেন না অমিতাভ রেজা, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও রুবাইয়াত হোসেনের মতো নির্মাতারা। বিষয়টি নিয়ে এ তিনজনেরই বক্তব্য প্রায় একই রকম। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ছবি বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা বড় কথা নয়। এ মুহূর্তে কানের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলোতে ছবি নিয়ে যাওয়া, সেখানে আগতদের তা দেখানো এবং কোন কোন উপায়ে ছবি বিক্রি করা যেতে পারে, সেটা রপ্ত করা জরুরি। এভাবে একদিন নিজেদের অবস্থান তৈরি হবে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সর্বশেষ মোস্তফা সরয়ার ফারুকী কিছু বিষয় যোগ করলেন এভাবে: ‘কানের মার্কেটে স্ক্রিনিং বা শর্ট ফিল্ম কর্নারের মতো অনলাইন লাইব্রেরিতে ছবি রাখার সুযোগ নিয়ে ডেলিগেট পাস পেয়ে চলচ্চিত্রের অন্য মানুষদের ছবি দেখা, তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎসহ নানাবিধ জ্ঞান অর্জন করতে পারে এ দেশের তরুণ নির্মাতারা। এ সুযোগ সবাইকে নেয়াও উচিত। কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকা উচিত, কানে যাচ্ছে বাংলাদেশ কিংবা কানের অফিশিয়াল সিলেকশন পেয়েছে, এ রকম কথা প্রচার যেন করা না হয়। কারণ এখন পর্যন্ত কান বিজয়ের দাবি করতে পারেন একমাত্র তারেক মাসুদ। তার মাটির ময়নার বাইরে বাংলাদেশের আর কোনো ছবি কানে অফিশিয়ালি আমন্ত্রণ পায়নি। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের তরুণ নির্মাতারা অসাধারণসব ছবি বানাবে এবং কানে প্রতিযোগিতা করবে একদিন।’