সম্পাদকীয়, সাক্ষাৎকার

মুনাফার জন্য সস্তা শ্রমিককে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার কাম্য নয়

ড. রিজওয়ানুল ইসলাম | ২০:৪২:০০ মিনিট, মার্চ ১৩, ২০১৮

অর্থনীতিবিদ ও আইএলওর এমপ্লয়মেন্ট সেক্টরের সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা। আইএলওর বিভিন্ন বিভাগে পরিচালক পর্যায়ে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের তত্ত্বাবধানে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় প্রধানত উন্নয়ন অর্থনীতি। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সংকটের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। বেশ কয়েকটি গ্রন্থের পাশাপাশি তার নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণামূলক সাময়িকীতে। বেকারত্ব, শিল্পায়ন, শ্রমবাজার, উৎপাদনে রোবটের প্রভাবসহ সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় বণিক বার্তার। সাক্ষার নিয়েছেন এম এম মুসা

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার স্থিতিশীল থাকলেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বেড়েছে। বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এ প্রশ্নের জবাব কয়েক ধাপে দিতে হবে। এক হচ্ছে বেকারত্বের হার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দেশের গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশ হয়েছে, তাতে দুটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। তার একটি হলো বেকারত্বের হার এবং অন্যটি অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার কয়েক বছর ধরে একই জায়গায় রয়েছে। অন্তত দুই দশকের শ্রমশক্তি জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে যে, বেকারত্বের হার খুব বেশি নয়। বেকারত্বের হার ২০১৫-১৬ সালে ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানও অনেকটা একই রকম। ২০১০ সালের তথ্য দেখলেও দেখা যাবে, সেটি এ রকমই। এর অর্থ কী? তাহলে কি বাংলাদেশে বেকারত্বের সমস্যাটি অত প্রকট নয়? উন্নত দেশগুলোর বেকারত্বের হারের দিকে তাকালে কী দেখা যাবে? উন্নত দেশ বলতে আমি ইউরোপের দেশ বা ওইসিডির দেশগুলোর কথা বলছি। এদের বেকারত্বের হার অনেক বেশি। তাহলে কি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অবস্থা ওইসব দেশ থেকে অনেক ভালো? তা তো নয় আসলে। এখানে পার্থক্যটা তাহলে কী?

বেকারত্ব যেভাবে পরিমাপ করা হয়, তাতে বাংলাদেশের মতো দেশের শ্রমবাজারের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। কারণটা কী? বেকারত্বের সংজ্ঞাটাই-বা কী? আপনি কি গত এক সপ্তাহে অন্তত ১ ঘণ্টাও কাজ করেছেন? যদি কেউ বলে, ‘না, আমি ১ ঘণ্টাও কাজ করিনি’, তখন দ্বিতীয় প্রশ্ন হবে, আপনি কি কাজ খুঁজেছেন? যদি তিনি বলেন, ‘আমি কাজ খুঁজেছি’, তাহলেই তিনি বেকার। যিনি সপ্তাহে ১ ঘণ্টাও কাজ করেননি এবং কাজ খুঁজেছেন, তিনি বেকার। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ১ ঘণ্টাও কাজ করেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কারণ কাজ ছাড়া জীবিকা নির্বাহ করাই এখানে অসম্ভব। কেউ যদি বেকার থাকেন, তবে তার জন্য বেকারত্ব ভাতা বা সামাজিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। সামাজিক সুরক্ষার কিছু উদ্যোগ রয়েছে, তবে তা বেকারত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। সুতরাং কোনো না কোনোভাবে আমাদের কাজ করতে হয় এবং আয়ের ব্যবস্থা করতে হয়। সে কারণে শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারত-থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশে বেকারত্বের হার খুবই কম। তার মানে এই নয় যে, শ্রমবাজারের অবস্থা খুব ভালো। যেভাবে বেকারত্ব পরিমাপ করা হয়, একে তার ফল বলা যায়।

আমাদের মতো দেশে বেকারত্ব পরিমাপের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনতে হবে। বর্তমান পদ্ধতিকে একেবারে ত্যাগ করার কথা বলছি না; এর সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সূচক আমাদের চিন্তা করে বের করতে হবে। যেগুলো দিয়ে আমাদের মতো দেশের শ্রমবাজারের প্রকৃত অবস্থা কিছুটা হলেও ধারণা করা যাবে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এর ওপর আমি নিজে কিছু লিখেছি। অন্যরাও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে বিশেষ কোনো অগ্রগতি আমি দেখিনি।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, দেশের শ্রমশক্তির বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক কাজ করে। এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। প্রশ্ন হলো, শ্রমশক্তির এত বিরাট অংশ কেন অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত? আমাদের তো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কর্মসংস্থান কিছুটা হলেও বাড়ছে। প্রবৃদ্ধি অনুপাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, সেটি একটি সমস্যা বটে। তবে কিছু হলেও তো কর্মসংস্থান হচ্ছে। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে এত বিরাট অংশ কেন নিয়োজিত? তার মূল কারণ হলো, যে ধরনের কর্মসংস্থান হচ্ছে বা যে ধরনের খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগই অনানুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিক খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হচ্ছে।

আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের দরকার শিল্প খাতে বেশি প্রবৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের বেশি প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি যে হয়নি তা নয়, হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারের তুলনায় শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কম। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কিছু উদাহরণের দিকে তাকানো যেতে পারে, যেসব দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে সফল হয়েছে। আমি সাধারণত উদাহরণ হিসেবে সামনে আনি দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াকে। তাদের উন্নয়নের স্তরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অন্তত দ্বিগুণ হারে উৎপাদনশীল শিল্পের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর সেসব শিল্পের বেশির ভাগই ছিল শ্রমঘন। উচ্চহারে প্রবৃদ্ধির কারণে সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থানও অনেক দ্রুত বাড়ে। ফলে অন্যান্য খাত থেকে শ্রমিক এ খাতে যেতে পারেন। অর্থাৎ যেসব খাতে উৎপাদিকা ও আয় কম, সেগুলো থেকে উৎপাদনশীল খাতে শ্রমিক স্থানান্তর হয়। আর এ খাতে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার বেশি। কিন্তু বাংলাদেশে শিল্প খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানই বেশি সৃষ্টি হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক খাত কিন্তু তার কর্মসংস্থানের প্রকৃতি হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক। এ কর্মসংস্থানের সঙ্গে বেকারত্বের ভাতা নেই, সামাজিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ছাঁটাই হলে নিয়মকানুন পরিপালন বা এককালীন কিছু অর্থ পাওয়ার যেসব নিয়ম রয়েছে, সেগুলোও নেই। তার মানে এই যে, এসব কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক ধরনের কিন্তু খাত আনুষ্ঠানিক। সার্বিকভাবে বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানই বেশি বাড়ছে। 

বাংলাদেশের শিল্পায়ন নিয়ে আপনার মন্তব্য...

বাংলাদেশে শিল্পায়ন যেভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আসলে কর্মসংস্থান বেশি যেখানে সৃষ্টি হয়, সেই ধরনের একটি শিল্পই গড়ে উঠেছে এখানে। সেটি হলো, পোশাক শিল্প। এ শিল্পের মতো আরো কয়েকটি শিল্প এখানে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল এবং সম্ভবও ছিল। সেটি হয়নি। সেটি হয়নি বলেই আমাদের শিল্প খাতের সার্বিক প্রবৃদ্ধির হারও বেশি নয়, সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হারও বেশি নয়। এটা হচ্ছে একটি মন্তব্য। দ্বিতীয় মন্তব্য হচ্ছে, পোশাক শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও গত কয়েক বছরে সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমে গেছে এবং সার্বিকভাবে মোট কর্মসংস্থানও কমেছে। যদিও বিজিএমইএর ওয়েবসাইটে দেখা যাবে অন্তত পাঁচ বছর একই পরিমাণ শ্রমিক অর্থাৎ ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমার হিসাবে এটা কমেছে। আমার হিসাব হচ্ছে, ৫০০ থেকে ৬০০ তৈরি পোশাক কারখানা এখন বন্ধ। সেটি আমি বিজিএমইএর দেয়া পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বলছি। ৫০০ থেকে ৬০০ কারখানা যদি বন্ধ থাকে এবং তাদের গড় কর্মসংস্থান ৬০০ জনও হয়, তাহলে তিন লাখ কর্মসংস্থান এখানেই কমে গেছে।

আনুষ্ঠানিক খাতে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে কি?

যেকোনো তদারকির কিছু ফাঁকফোকর থাকে। যদি এমন ব্যবস্থা করা যায়, আইনের মধ্যে থেকেও মালিকরা অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক নিয়োগ দিতে পারেন, তাহলে সবাই তো এ সুযোগ নেবেন। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যায়। একটি শিল্প-কারখানা বা সংস্থা অনেক কাজ উপচুক্তি বা সাব-কন্ট্রাক্টে দিয়ে দিতে পারে। বর্তমানে এটি খুবই চালু একটি পদ্ধতি। অনেক কাজ আমরা আউটসোর্স করতে পারি। গাড়ি ও গাড়িচালক নিয়োগ না দিয়ে একটি কোম্পানিকে বললেই তারা ড্রাইভার ও গাড়ি সরবরাহ করবে। ওই কোম্পানি আনুষ্ঠানিক শ্রমিক নিয়োগ দেয় না। পুরো জিনিসটিই আউটসোর্স করা। সুতরাং এভাবে আইনকানুনের মধ্যে থেকেই অনেক কাজ কর্তৃপক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে করিয়ে নিতে পারে। এতে ব্যয় কমবে অবশ্যই। তবে শ্রম শোষণ হয় বেশি।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে— রেস টু দ্য বটম। মুনাফা অর্জনের জন্য মালিকরা এমন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন, যেখানে মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সস্তা শ্রমিক। শ্রমিকের দাম আরো কতটা কমানো যায়, মালিকরা সেটিই শুধু চিন্তা করছেন। তার মানে এভাবে আপনি তলানির দিকে যাওয়ার এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আছেন। সেটি না করে অন্য কীভাবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো যায়, সেটি মালিক বা রাষ্ট্র চিন্তা করছে না। মুনাফা বাড়ানোর জন্য শ্রমের খরচ হ্রাস বা শ্রমিক ঠকানো একমাত্র পন্থা নয়। বর্তমান যুগে এমন নীতি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। শ্রমিক শোষণ না করে অর্থাৎ তাদের মানসম্পন্ন মজুরি ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করেও লাভ করা যায়, তার উদাহরণ আমাদের সামনে ভূরি ভূরি রয়েছে। তাহলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা কেন শ্রমিকের মজুরি কম রেখে মুনাফা অর্জনের
চিন্তা করবেন?

অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান থেকে কীভাবে বের হতে পারি আমরা?

একেবারে অসম্ভব আমি সেটি বলছি না, আবার একেবারে সহজ সেটিও বলছি না। কিন্তু এর জন্য সরকারকে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে। কীভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের মতো কিছু কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে হবে। আমি বলছি না, সরকার সেটি করবে। ব্যক্তি তথা মালিকদের সেটি করতে হবে। কিন্তু সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে আইনকানুন প্রণয়ন ও তার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে। আইনকানুন চাপিয়ে দেয়ার কথা বলছি না, সবার সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষেই এর ব্যবস্থা করতে হবে। এটি যে করা যায়, তার একটি উদাহরণ হচ্ছে ভারত। দেশটি এ রকম একটি ব্যবস্থা নিয়েছে। ভারতে অনানুষ্ঠানিক খাতের পরিবর্তে বলা হয় আন-অর্গানাইজড সেক্টর। আন-অর্গাইনাইজড সেক্টরের জন্য আইনগত বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেখানে যে খুব মসৃণভাবে সেটি হচ্ছে, আমি তা বলছি না। তবে সেখানে একটি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং সেটি দেশটির সংসদে আইন করে গৃহীত হয়েছে। সুতরাং এটি সম্ভব।

আমরা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সময়কাল পার করছি। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, কর্মসংস্থানে যুবশক্তির হার কমছে। এর ব্যাখ্যা কী?

এখানে দুটি কথা বলতে হবে। একটি হলো, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড। এর অর্থ হলো, মোট জনসংখ্যার মধ্যে কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত বেড়েছে। এটি একটা সময় পর্যন্ত বাড়ে, তারপর কমে যায়। এখন আমরা সেই অবস্থায় রয়েছি, যেখানে তরুণ জনশক্তি বেশি এবং আরো কয়েক বছর এ অবস্থা বজায় থাকবে। এটি আরো কিছুদিন বাড়তে পারে, যদিও সে বিষয়ে কথা বলার অবকাশ রয়েছে। সত্যিকারের পরিসংখ্যান কিন্তু সেটি দেখায় না। ২০১৫ সালে ২০১৩ সালের তুলনায় এ অনুপাত একটুখানি হলেও কমে গেছে। কীভাবে এটা হলো, তা গবেষণার বিষয়। অনুপাত যদি বাড়ে তাহলেও কিন্তু কর্মক্ষম সব ব্যক্তি কাজ করবেন, এমন কোনো কথা নেই। সব যুবক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ নাও করতে পারেন। তারা পড়ালেখা করতে পারেন। সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। স্কুলে ও কলেজে যাওয়ার হার বাড়ছে। তার মানে অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে। তা যদি হয়ে থাকে, তবে ১৫ থেকে ২৪ বা ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়স্ক, যাদেরকে আমরা যুবশক্তি বলছি, শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ কমতে পারেই। এটি নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বিষয়টিকে আমি কোনোভাবেই নেতিবাচক হিসেবে দেখব না। আরেকটি ধারণা আছে। যুবশক্তি শিক্ষায়ও না, প্রশিক্ষণেও না, কর্মসংস্থানেও না— কোনোখানে নেই তারা। ইংরেজিতে একে বলা হয় Not in education, employment or training. সংক্ষেপে একে NEET বলে। এ সংখ্যাটার দিকে আমাদের তাকাতে হবে। সংখ্যাটি কি বেড়ে যাচ্ছে? বেড়ে গেলে সেটি চিন্তার বিষয়। তারা তাহলে কোথায়? এরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই, কোনো প্রশিক্ষণে নেই, কোনো কর্মসংস্থানেও নেই। এ যুবশক্তির অপচয় হচ্ছে। এ যুবশক্তি কোনো কারণে কোনোখানেই নেই। এখানেও আমি দেখছি বাংলাদেশের অবস্থার একটুখানি হলেও উন্নতি হয়েছে। এ সংখ্যাটি ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে কিছুটা হলেও কমেছে। শ্রমবাজারে যুবশক্তির অংশগ্রহণ কমে গেছে বলে আমি বেশি চিন্তিত নই।

প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির কথা বলা হচ্ছে। বিষয়ে অগ্রগতি কতটুকু?

আমরা অনেক কথাই অনেক বছর ধরে বলে আসছি। কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হয় না বা নিলেও এর কার্যকারিতা দেখা যায় না। কিছুটা হয়, কিছুটা হয় না। আমাদের দেশে সমস্যা আছে, তা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। শিক্ষিত বেকার অনেক রয়েছেন। আবার নিয়োগকারীরা বলছেন, ‘আমি যে ধরনের লোক চাইছি, সে ধরনের দক্ষ জনবল পাচ্ছি না। যারা আসছেন তাদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ আমার যেটা প্রয়োজন, সে রকম নেই।’ এ অসামঞ্জস্য বড় একটি সমস্যা। এটি কমানোর জন্য কিছু কাজ হচ্ছে না, তা নয়। সরকারও এ বিষয়ে সচেতন। কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। ব্যক্তিখাতেও, যেমন ইন্ডাস্ট্রি স্কিল সেন্টার এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা আছে। সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আছে, যেটি শুরু হয়েছিল গার্মেন্ট খাত দিয়ে। পরবর্তীতে অন্যান্য খাতেও এর সম্প্রসারণের কথা ছিল। কিছু খাতে এটি সম্প্রসারণ হয়েছে বটে, তবে চাহিদার তুলনায় এটি সামান্য বলে প্রতীয়মান হচ্ছে এখন। সমস্যা হলো, এগুলো সবই ছোট পদক্ষেপ। এগুলোকে বড় আকারে নিতে হবে। এটি এক নম্বর। দ্বিতীয়ত. এগুলোর কার্যকারিতা কতটুকু বা সমস্যা সমাধানে কাজ হচ্ছে কিনা, সেটি আমরা খোঁজখবর করি না। এর বিশ্লেষণ-বিচার খুব কম হচ্ছে। এগুলো হওয়া উচিত। এর ভিত্তিতে কার্যক্রমের পরিবর্তন, উন্নতি করা উচিত কিনা, ব্যাপ্তি বাড়ানো উচিত কিনা— এসব বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জনশক্তি খাতে বিনিয়োগের রিটার্ন অনেক উঁচু হওয়া সত্ত্বেও কেন শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হচ্ছে না?

কোনো সন্দেহ নেই, শিক্ষায় বিনিয়োগের রেট অব রিটার্ন সবসময় বিনিয়োগের পক্ষে থাকে। এখানে সরকার বিনিয়োগ করতে পারে, এটি নিয়ে কোনো দ্বিধা বা সংশয়ের অবকাশ নেই। শিক্ষায় সরকারের দৃষ্টি আছে। এখানে বিনিয়োগও হচ্ছে। কিন্তু সরকারকে আরো বেশি করে এ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। যেমন— এখন প্রতি জেলায় কারিগরি শিক্ষার কথা বলা হচ্ছে। আমরা হয়তো বলব, প্রতি উপজেলায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। তবে এখন যা আছে, সেটিই অনেক বেশি করা কাজের হবে, তেমন কোনো কথা নেই। এমনকি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যেও অনেকে বেকার রয়েছেন। তাদের বেকারত্বের হার একটু কম হতে পারে কিন্তু নিয়োগকর্তারা অভিযোগ করছেন, এদেরকেও তারা কাজে লাগাতে পারছেন না। আমাদের গোড়ায় যে গলদ রয়েছে, সেটি আগে দেখতে হবে। খালি সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করলেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বিনিয়োগ করতে হবে এমন জায়গায়, যেটি আমাদের প্রয়োজন। এ প্রয়োজনটা তিন পক্ষকে বুঝতে হবে। সরকার, বিনিয়োগকারী এবং যারা প্রশিক্ষণ নেবেন— সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির পরিবর্তনের প্রভাব শ্রমবাজারে পড়ছে না কেন?

উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটে। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশের উদাহরণ টানা যেতে পারে। তাদের উন্নয়নের ধরনটা প্রায় একই রকম। তারা প্রত্যেকেই একসময় কৃষিতে নির্ভরশীল ছিল এবং পরবর্তীতে শিল্পায়ন হয়েছে। শিল্পের উৎপাদন এবং শ্রমবাজারের বিবর্তন একই সঙ্গে ঘটেছে। তবে একপর্যায়ে গিয়ে সেবা খাতের বিকাশ ঘটেছে। সবসময় সেবা খাত এগিয়েছে, তবে শিল্প প্রবৃদ্ধি ছিল বেশি। জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান কমেও গেছে একটি পর্যায়ের পরে। তারপর সেবা খাতের অংশ বেড়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে কী হয়েছে? আমাদের জিডিপিতে সেবা খাতের অবদান বেশি বেড়ে গেছে। শিল্প খাতের অবদান বাড়েনি, সেটি আমি বলছি না। কিন্তু যে অনুপাতে এবং যেভাবে বাড়া উচিত ছিল, সেভাবে বাড়েনি। মোট কর্মসংস্থানে শিল্পের অংশ সে রকম বাড়েনি। শিল্পের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কর্মসংস্থানও হয়েছে। কিন্তু আরো অধিক হারে বাড়ার প্রয়োজন ছিল। এ কারণে আমার মনে হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শ্রমবাজারের বিবর্তনটা সেভাবে ঘটেনি।

এটি কি ত্রুটিপূর্ণ নীতির প্রভাব?

উন্নয়নের রণকৌশলে কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার একটি কথা বলেন, বিশেষ করে কয়েক বছর ধরে এ বিতর্ক শুরু হয়েছে। সেটি হলো, শুধু কি শিল্পায়নের মাধ্যমেই মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সম্ভব, সেবা খাতের মাধ্যমে সম্ভব নয়? এ বিষয়ে আমার অভিমত হলো, হ্যাঁ, সব দেশই যে শিল্প গড়ে তুলতে পারবে এমন কোনো কথা নেই। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ওয়ান সাইজ ফিটস অল— আমি এর পক্ষপাতী নই। তবে বাংলাদেশের জন্য আমি অন্তত বলব, এ দেশের শিল্পায়নের সম্ভাবনা ছিল, এখনো আছে। সেই সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।

রোবটের মাধ্যমে শিল্প-কারখানা চালানোর একটি প্রচেষ্টা লক্ষণীয় সারা বিশ্বে। এতে ব্যয় সময় সাশ্রয়ের কথা বলা হচ্ছে। রোবটীকরণের কোনো প্রভাব বাংলাদেশে দ্রুত পড়ার সম্ভাবনা আছে কি?

রোবটের ব্যবহার নিয়ে কয়েক বছর ধরে সারা বিশ্বে মহা হইচই হচ্ছে এবং এ বিষয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন আমি দেখেছি। বড় বড় নামিদামি সংস্থা এটি নিয়ে কাজ করছে। গবেষকরা লিখেছেন, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকও লিখেছে। একেকজন একেক রকমের মতামত দিচ্ছেন। এ বিষয়ে যদি আমার ব্যক্তিগত মতামত চান তবে বলব, আমি পুরো বিষয়টিকে ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখি। তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে আমরা কোন দিকে যেতে পারি, তা আন্দাজ করার চেষ্টা করি। আগেই বলে রাখি, আমি ভবিষ্যত্দ্রষ্টা নই।

এক্ষেত্রে আমরা শিল্প বিপ্লবের ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারি। রোবটের আবির্ভাবকে অনেকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলছেন। প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় শিল্প বিপ্লব আমরা পার করে এসেছি। কোন শিল্প বিপ্লবের পর কর্মসংস্থান কমে গেছে? পৃথিবীতে কোনো শিল্প বিপ্লবের পর কর্মসংস্থান কমেনি। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব যখন হয়, তখন ব্রিটেনে ‘লুডাইট’ নামে একদল শ্রমিক গিয়ে তাঁতযন্ত্র ভাঙতে শুরু করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন নতুন তাঁতযন্ত্র এলে তাদের চাকরি চলে যাবে। লুডাইটের ঘটনা কি আমরা আবার ঘটাব? শিল্প বিপ্লবের পর ব্রিটেনের বস্ত্র খাতে কর্মসংস্থান বেড়েছিল। তার কারণ হলো, একসময় একজন মানুষ একটি কি দুটো পোশাক পরত। যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে উৎপাদিকা বাড়ে এবং উৎপাদনের ব্যয় কমে। তার ফলে পণ্যের দাম কমে এবং চাহিদা বাড়ে। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ে।

আমরা অনেক সময় সংকীর্ণভাবে একটি বিষয়ের দিকে দৃষ্টি দিই; সার্বিকভাবে দৃষ্টি দিই না। কুড়ি বছর আগে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত এত ধরনের কাজ তৈরি হবে, সেগুলোর কথা কি আমরা কেউ চিন্তা করেছিলাম? অথচ ওই সময় অনেক চাকরি ছিল, যেগুলো এখন আর নেই। একসময় টেলেক্স অপারেটর নামে একটি পোস্ট ছিল। স্টেনো টাইপিস্ট ছিল একসময়। আমি নিজে এসব চাকরি দেখেছি। এখন আর কোথাও তাদের অস্তিত্ব নেই। তার মানে কি আমাদের অফিসে কর্মসংস্থান কমে গেছে? তা তো নয়।

একেকটা শিল্প বিপ্লব যখন হয় বা নতুন নতুন যন্ত্র আসে, তখন পুরনো কিছু কাজ চলে যায়। কিন্তু নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি হয়। নতুন ধরনের কী কাজ তৈরি হবে, সেটি আমি এখন আন্দাজই করতে পারব না। আগামী ১০-২০ বছর পর সত্যিই সত্যিই রোবট এসে যদি আমাদের অনেক জায়গা দখল করে নেয়, তখন কী ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, সেটি আমরা আন্দাজ করতে পারব না এ সময়ে। এ-সংক্রান্ত যেসব প্রতিবেদন এখন বের হচ্ছে, সেগুলো ভালো করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তারাও কিন্তু একেবারে নিশ্চিত করে বলছে না, এটি হয়ে যাবে বা কর্মসংস্থানে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এমনকি উন্নত দেশের জন্য তারা যে ধরনের অনুমান করছে, সেটি কি ১০ না ২০ বছর পর হবে, নাকি আরো পরে হবে— এটাও কিন্তু তারা নিশ্চিত করে বলছে না। সুতরাং আমার ধারণা, পরিবর্তন তো অবশ্যই হবে। এ ধরনের পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না; ঠেকিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজও হবে না, বিশেষ করে যদি সেটি প্রয়োজন হয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা সক্ষমতা-দক্ষতার জন্য যদি প্রয়োজন হয়, তবে তাকে আমাদের অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে। তবে আমি সঙ্গে সঙ্গে এটিও বলব, বিনা প্রয়োজনে একে উৎসাহিত করার জন্য আমরা যেন ভ্রান্ত পদক্ষেপ না নিই। যেমন— এ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য যেন শুল্কের হার না কমানো হয়। অথবা বিনা শুল্কে আমদানির সুযোগ যেন না দেয়া হয়। অথবা এজন্য সরকার ভর্তুকি দিয়ে দেবে, এ নীতিমালার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। সাধারণ বাজারে যদি এর চাহিদা থাকে, তবে এটি বন্ধ করা উচিত হবে না। আমার ধারণা হলো, কাজের প্রকৃতি বদলে যাবে। এখন আমরা যে ধরনের চাকরি দেখছি, সে ধরনের অনেক চাকরি হয়তো আর থাকবে না। অন্য ধরনের চাকরি সৃষ্টি হবে। সেগুলোর জন্য অবশ্যই লেখাপড়ার দরকার হবে অনেক বেশি। শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগত দিক থেকে কী ধরনের শিক্ষা দরকার, কী ধরনের দক্ষতা দরকার, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের ব্যবহার অনেক বেশি হবে। সে কারণে বিশেষায়িত শিক্ষায় শিক্ষিত জনশক্তি বেশি দরকার হবে। সুতরাং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সেভাবে সাজাতে হবে। প্রচলিতভাবে এগোলে চলবে না। (বাকি অংশ আগামীকাল)

 

আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ