সম্পাদকীয়

অর্থনৈতিক কোর্স নির্ধারণে বিবেচ্য

স্যামুয়েল বোলস | ২০:৪৯:০০ মিনিট, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৮

স্নাতক পর্যায়ের পাঠক্রমে ‘বহুত্ববাদের’ ঘাটতির কারণে অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই সমালোচনার শিকার হন। সমালোচকরা বলেন, কেইনস বনাম অর্থবাদী, মার্ক্স বনাম নব্য ধ্রুপদী এবং ইতিহাস ও অন্য সামাজিক বিজ্ঞানসহ চিন্তার বিপরীতধর্মী ঘরানায় অপর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়া হয়।

সমালোচকদের সমালোচনা যথার্থ। স্নাতক পর্যায়ের অর্থনীতি নির্দেশনা বা পঠন-পাঠন উভয় দিক থেকে সংকীর্ণ হচ্ছে এবং তার জন্য আমাদের শিক্ষার্থীরা খারাপ হচ্ছে। অবশ্য যখন প্রতিকারের প্রশ্ন আসে, তখন সমস্যার উদয় হয়। এক্ষেত্রে সমালোচকদের বহুত্ববাদের ধারণা বড়ই সীমাবদ্ধ, সংকীর্ণ এবং অর্থশাস্ত্রে ঘটা সাম্প্রতিক অগ্রগতি উপেক্ষা করার তাদের একটি প্রবণতা বিদ্যমান।

বহুত্ববাদের দুটি বিষয় আমাদের পৃথক করা উচিত। একটি হলো, তুলনাবিচারমূলক বহুত্ববাদ। এ ধারণা অনুযায়ী, এক ধরনের প্যারাডাইম টুর্নামেন্ট হিসেবে শিক্ষার্থীদের অর্থনীতির অধ্যয়ন বা গবেষণাকে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে নানা ভিন্নধর্মী অ্যাপ্রোচ তুলনা করা হয়। তবে ভিন্নধর্মী চিন্তার ঘরানার অন্তর্দৃষ্টি ও শিক্ষায়তনিক বিষয় একটি সাধারণ প্যারাডাইমে সন্নিবিষ্ট করেও বহুত্ববাদ এগোতে পারে। এটিকে বলা হয় সমন্বিত বহুত্ববাদ (প্লুরালিজম বাই ইন্টিগ্রেশন)।

আলোচ্য দুই ধরনের বহুত্ববাদের যেকোনোটিরই ঘাটতি অধিকাংশ অর্থনীতি শিক্ষায় ব্যবহূত বেঞ্চমার্ক মডেলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যদি প্যারাডাইম কেস পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বেচাকেনার মতো স্বার্থপর ‘হোমো ইকোনমিকাস’ হয়— যেখানে সরবরাহ সবসময় চাহিদার সমান— তাহলে অন্য একাডেমিক বিষয়ের অন্তর্দৃষ্টি ও চিন্তার ঘরানাগুলো কী অবদান রাখে, সেটি দেখা কঠিন হবে। কিন্তু এ বেঞ্চমার্ক অর্থনীতিতে ব্যবহূত গবেষণা ও নীতি পরামর্শে অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে। 

আরো আধুনিক বেঞ্চমার্ক ব্যবহার করে সমন্বিত বহুত্ববাদকে যুক্ত করতে অর্থনীতিতে নতুন একটি শাখা উন্নয়নের উদ্দেশ্যে গত পাঁচ বছরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকরা যৌথভাবে কাজ, পারস্পরিক সহযোগিতা করেছে। নতুন বেঞ্চমার্ক কেন ম্যাটার করে, সেটি দেখতে কোম্পানি ও শ্রমবাজারকে কোর প্রজেক্ট কীভাবে ট্রিট করে, সেটি বিবেচনায় নেয়া জরুরি। এটি একটি ফ্যাক্টসহ শুরু হয় যে, চাকরিদাতা ও কর্মীদের কাজের সম্প্রসারিত প্রচেষ্টা সম্পর্কে সংঘাতমূলক স্বার্থ আছে। একজন কঠোর পরিশ্রম বা ভালো করা কর্মীকে শ্রম চুক্তি নিশ্চয়তা দিতে না পারার ধারণা আধুনিক ব্যষ্টিক অর্থনীতির অসম্পূর্ণ চুক্তির প্রধান বিষয়। তবে এটি সরাসরি এসেছে কার্ল মার্ক্স থেকে। চুক্তি অসম্পূর্ণ হওয়ার যে কারণটি শিক্ষার্থীরা আবিষ্কার করেছে সেটি হলো, তথ্য স্থানীয় ও বিক্ষিপ্ত। এ অন্তর্দৃষ্টি ফ্রেডরিখ হায়েকের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

এরপর কোর প্রজেক্টের শিক্ষার্থীরা শিকাগো অর্থনীতিতে রোনাল্ড কোস থেকে শিখেছে, ‘প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র চিহ্ন হলো দাম প্রক্রিয়ার চাপাচাপি। মজুরি ও কাজের পরিমাণ নির্ধারিত হয় চাকরিদাতা ও কর্মীদের কাজের নৈতিকতা দ্বারা, কেবল বাজার প্রতিযোগিতা দ্বারা নয়।’

এ মডেল কীভাবে কাজ করে, তার জন্য সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষার্থীরা জানে যে হার্বাট সাইমন, যার ডিগ্রি ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে, অর্ধশতকের বেশি সময় আগে এ প্রক্রিয়ার একটি আংকিক মডেল দিয়েছেন।  

এ অ্যাপ্রোচের একটি ফল (আধুনিক অর্থনীতিতেও এ ফল সাধারণ) হলো, শ্রম চুক্তির অসম্পূর্ণতার ধরনের কারণে সৃষ্ট বেকারত্ব। কোস, হায়েক, মার্ক্স, সাইমন ও সাম্প্রতিক গবেষণা সমন্বয় করলে তা একটি মডেল দেয়; যা শিক্ষার্থীরা গিগ অর্থনীতি, নিম্ন মজুরি বা বিভিন্ন শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক নৈপুণ্যের প্রভাব ব্যাখ্যায় ব্যবহার করতে পারে।

এখন কল্পনা করুন স্ট্যান্ডার্ড টেক্সটবুক বেঞ্চমার্ক মডেলে বর্ণিত শ্রমবাজার এবং কোম্পানির পরিবর্তে। সেখানে মনে করা হয়, কর্মীদের কাছ থেকে যে উপায়ে কাজ কেনা হয়, তার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কিলোওয়াট বিদ্যুৎ কেনার কোনো ভিন্নতা নেই। বেকারত্ব না থাকলে কাজসংক্রান্ত স্বার্থের সংঘাত থাকে না, থাকে না মালিক কর্তৃক শ্রমিকের ওপর ক্ষমতাচর্চা বা থাকে না কোনো সামাজিক রীতির ভূমিকা।

এ কাল্পনিক বিশ্বে কোস, হায়েক, মার্ক্স, সাইমন ও অন্য একাডেমিক বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিক নয়। কোর প্রজেক্টের তুলনা বিচারমূলক বহুত্ববাদ এমন উপকারী অন্তর্দৃষ্টি দেখিয়েছে, যেগুলো অনেক উৎস থেকে আসতে পারে এবং আজকের দিনের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।

 

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের সান্তা ফে ইনস্টিটিউটের রিসার্চ প্রফেসর

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে ভাষান্তর হুমায়ুন কবির