আন্তর্জাতিক ব্যবসা

জৌলুস হারাচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার তেল ও গ্যাস শিল্প

বণিক বার্তা ডেস্ক | ২১:৫৭:০০ মিনিট, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

একসময় ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে তেল ও গ্যাস শিল্প। কিন্তু  খাতটি এখন নিজের জৌলুস হারিয়েছে। দেশটিতে জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি সত্ত্বেও ঝিমিয়ে পড়েছে তেল ও গ্যাস শিল্প। খবর ব্লুমবার্গ।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতন, নীতিমালায় পরিবর্তন, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধিতে ইন্দোনেশিয়ার তেল ও গ্যাস শিল্প সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোর কাছে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে রীতিমতো পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের। এ অবস্থায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি একদিকে যেমন তেল রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে জ্বালানি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে।

পাঁচ বছর আগেও ইন্দোনেশিয়ার জিডিপিতে প্রায় ৬ শতাংশ অবদান রেখেছে তেল ও গ্যাস শিল্প। গত বছর যা মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক হারে বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

সিঙ্গাপুরের তেল ও গ্যাস বাজারের বিশেষজ্ঞ টনি রেগান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনার অভাব দেখতে পাচ্ছি আমরা। ইন্দোনেশিয়ার অবস্থা বিচারে মনে হচ্ছে, তেল উত্পাদন পুনরায় চাঙ্গা করে তোলার পরিবর্তে এর ঝিমিয়ে পড়াটাই মেনে নেয়া হয়েছে।

সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ২০১৬ সালে দেশটিতে বিনিয়োগ কমে ১০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০১২ সালে যা ছিল ১৩০ কোটি ডলার। উড ম্যাকেনজি লিমিটেডের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেলবাজার-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জোহান ওতামা বলেন, খননের পরও খনিজ না পাওয়া ও বিভিন্ন বাণিজ্যিকীকরণ ইস্যুর কারণে তেল-গ্যাস শিল্পে ইন্দোনেশিয়া ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে আসছে সময়গুলোয় এ খাতে বিনিয়োগ আরো কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৯৯৭ সালে অর্গানাইজেশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ইন্দোনেশিয়া। সে সময় দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করা হতো দেশটিতে। গত আট বছর এ জোটে না থাকা দেশটি আবারো সদস্য হওয়ার আবেদন করেছে। তেল ব্যবসায়ী ও নির্বাহী কর্মকর্তারা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করছিলেন ইন্দোনেশিয়ায় উত্তোলনকাজ দুরূহ হয়ে ওঠার পাশাপাশি বিনিয়োগও স্থবির হয়ে পড়েছে। ২০১১ সালের সর্বোচ্চ অবস্থা থেকে ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে তেলের দামে আকস্মিক বড় পতনের পেছনে এটিও একটি কারণ ছিল। ২০১১ সালে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছিল, ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে তা অর্ধেকে নেমে আসে। তেলের বাজারে এ অবস্থায় পুরো বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা অর্থ লগ্নির সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তে নিচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ইন্দোনেশিয়ার তেল রফতানিকারকরা।

উড ম্যাকিঞ্জির দেয়া তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দরপতনের দুই বছর পার হয়েছে। দরপতনের সে ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো। সে অনুযায়ী চলতি বছর তেল উত্তোলন ও উত্পাদনে বিশ্বজুড়ে ৩ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে ব্রুনাই, ভারত, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। চলতি বছরের তুলনায় মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ ২০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। বিপরীত চিত্র লক্ষ করা গেছে ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটিতে চলতি বছরের প্রথমার্ধে চারটি অফশোর রিগ কার্যকর রয়েছে। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যা ছিল ১৯টি। এ সবকিছুই উত্পাদন কমার চিত্র প্রকাশ করছে।

এদিকে তেল উত্পাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে ইন্দোনেশিয়ার কোষাগারেও। উত্পাদন কমে যাওয়াতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তেল ও গ্যাস শিল্পের অবদান কমেছে। এক দশক আগে এ খাত থেকে সরকার এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারত। গত বছর এ হার ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

দেশটির জ্বালানি ও খনিজ-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী দশকের মধ্যে জ্বালানি খাতে ২০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। শুল্কমুক্তভাবে ড্রিলিং যন্ত্রাংশ আমদানি ও খরচ হ্রাসের মতো সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কর কাঠামো পরিবর্তনেরও চেষ্টা চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু কিছু সংস্কারের ফলে তেল উত্তোলনে বিনিয়োগ আরো আকর্ষণ হারাবে।