আন্তর্জাতিক ব্যবসা

চাঙ্গা বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও রাশিয়া নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অস্বস্তি

বণিক বার্তা ডেস্ক | ২০:২১:০০ মিনিট, আগস্ট ১৩, ২০১৭

সপ্তাহ খানেক আগে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সদ্য মন্দা পার হওয়া দেশটির ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে স্থানীয় কোম্পানি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চাঙ্গা হয়ে ওঠার খবর তাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। খবর এএফপি, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিনহুয়া।

রাশিয়ার জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর রোসস্ট্যাট জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি আড়াই শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে— যা প্রথম প্রান্তিকের দশমিক ৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, সরকারের দেয়া ২ দশমিক ৭ শতাংশ পূর্বাভাসের চেয়েও তা কিছুটা কম। চলতি বছর সামগ্রিকভাবে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে রুশ সরকার।

তেলের মূল্যপতন ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ধাক্কায় দুই বছর মন্দার মধ্যে ছিল রাশিয়া। প্রসঙ্গত, ক্রাইমিয়াকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার কারণে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। তবে গত বছরের শেষের দিকে মন্দা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয় রুশ অর্থনীতি। যার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের শেষ প্রান্তিকে অর্থনীতিতে দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির দেখা পায় দেশটি।

দীর্ঘদিন পতনের মধ্যে থাকার পর ভোক্তাব্যয় আবার বেড়ে যাওয়ার কারণেই অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। গত জুনে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার দশমিক ২৫ শতাংশীয় পয়েন্ট হ্রাস করে। মূলত অর্থনীতি সম্প্রসারণের মধ্যে থাকার কারণেই সুদের হার কমানো হয় বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।  

অর্থনীতির পাশাপাশি চীনের সঙ্গে রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্কও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। রুশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব লক্ষ্য অনুযায়ী চলতি বছর দুই দেশের মধ্যে মোট ৮ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য সম্পন্ন হবে। কার্নেগি মস্কো সেন্টারের এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার গাবুইয়েভ বলেন, গত মাসে ধাতব পণ্যের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি আমলে নিয়ে বলতে পারি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৮ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য সম্পন্ন হওয়া সম্ভব।

চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত চীন-রাশিয়ার মধ্যে আমদানি এবং রফতানির টার্নওভার ছিল ৪ হাজার ৬৮২ কোটি ডলার। বার্ষিক হিসেবে তুলনা করলে এই বৃদ্ধি ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

চীনে তেল ছাড়াও অন্যান্য রুশ পণ্য রফতানি বাড়ছে। সস্তা রুবলের পাশাপাশি শুল্ক প্রতিবন্ধকতা হ্রাসে উভয় দেশের প্রচেষ্টা, অবকাঠামো উন্নয়ন এর পেছনে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে।

রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টারের (আরইসি) ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড প্রমোশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিখাইল মামনভ এ প্রসঙ্গে বলেন, রাশিয়া থেকে চীনে খাদ্যপণ্য রফতানি বাড়ছে। এছাড়া কাঠ, কাঠের তৈরি পণ্য, মেকানিক্যাল ইকুইপমেন্ট রফতানিও সম্প্রসারিত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যে ক্রমোন্নয়ন এক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। রাশিয়ান-এশিয়ান ইউনিয়ন অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট ভিতালি মঙ্কেভিচও চলতি বছর দুই দেশের বাণিজ্যলক্ষ্য পূরণে আশাবাদী। তবে ২০২০ সালের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছানো একটি জটিল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী কাজ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণ করা ছাড়াও চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্প বাস্তবায়ন ও কৃষিপণ্য রফতানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে অর্থনীতি সম্প্রসারণ ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির পরেও যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ অর্থনীতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের অস্বস্তি কাটছে না। তাদের ভয় মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাশিয়ার একটি কোম্পানির জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, অর্থনীতি সম্প্রসারণে এখানে স্বস্তির বাতাস বইলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে পরিস্থিতি আবার দমবদ্ধকর হয়ে উঠতে পারে।

মস্কোভিত্তিক ম্যাক্রো অ্যাডভাইজরির অংশীদার ক্রিস ওয়েফার বলেন, সত্যিকার অর্থেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হচ্ছে। দুই বছরের মন্দার ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিয়েছে দেশটি। তবে অর্থনীতির এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে প্রয়োজন অব্যাহত বিনিয়োগ। কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিনিয়োগ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে মস্কোর প্রতি ট্রাম্প সরকারের বন্ধু মনোভাব দেখে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিনিয়োগকারীই এখানে অর্থলগ্নিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু নতুন নিষেধাজ্ঞায় নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ব্যাংক ও জ্বালানি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব কারণে বিনিয়োগকারীরা এখন রাশিয়ায় অর্থলগ্নি নিয়ে ভরসা ও স্বস্তি পাচ্ছেন না।