শেষ পাতা

বাণিজ্যিকভাবে শামুক-ঝিনুক চাষের উদ্যোগ সরকারের

জেসমিন মলি | ০০:৪৭:০০ মিনিট, জুলাই ২৯, ২০১৭

দেশের জলাশয়গুলোয় মাছ ও চিংড়ি ছাড়াও আরো অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ জলজ সম্পদ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো শামুক ও ঝিনুক। অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় অপ্রচলিত এসব জলজ প্রাণীর বাণিজ্যিক চাষের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শামুক-ঝিনুক উৎপাদনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে তাদের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশে ঝিনুক ও শামুক সংরক্ষণ, পোনা উৎপাদন এবং চাষ প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্প নিয়েছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। চলতি বছরের জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চলতি অর্থবছরের অগ্রাধিকার প্রকল্প তালিকায় রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, কক্সবাজার, চাঁদপুর, বগুড়া, যশোর ও বাগেরহাটে শামুক-ঝিনুক চাষ করা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পটির মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঝিনুক ও শামুকের পোনা উৎপাদন এবং চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশে ঝিনুক ও শামুকের পপুলেশন ডিনামিক্সের ওপর বেইজ-লাইন তৈরি, ঝিনুক ও শামুক সংরক্ষণের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগও রয়েছে প্রকল্পটিতে।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির সুপারিশ করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) পুনর্গঠন করে চলতি বছরের ১৪ জুন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মীর শওকাত আলী বাদশা বলেন, কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন অধিদপ্তর ও বিভাগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য গৃহীত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পগুলো দ্রুত ও যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশের বিপুল জলরাশি বিভিন্ন ধরনের মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীতে পরিপূর্ণ। দেশের স্বাদু ও লোনা পানিতে ১৬ প্রজাতির ঝিনুক পাওয়া যায়। ঝিনুকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো মুক্তা তৈরি। ঝিনুকের খোলস থেকে চুন তৈরি এবং এর মাংসল অংশ হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়। বিশ্বের অনেক দেশে ঝিনুকের মাংসল অংশ খাওয়ার রীতি রয়েছে। সামুদ্রিক ঝিনুক (ওয়েস্টার) সামুদ্রিক খাবারের মধ্যে বেশ দামি এবং অনেক দেশে এর ওপর ভিত্তি করে খামার গড়ে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকে ভারতে বাণিজ্যিকভাবে সামুদ্রিক ঝিনুকের উৎপাদন শুরু হয়।

মানুষ ও জলজ পরিবেশ উভয়ের জন্য ঝিনুক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জলাশয় থেকে শৈবাল, জৈব পদার্থ, দ্রবীভূত ক্ষতিকারক উপাদান যেমন— ভারী ধাতু দূরীকরণে ঝিনুকের ভূমিকা রয়েছে। এভাবে ঝিনুক প্রাকৃতিকভাবে পানি পরিষ্কারক হিসেবে কাজ করে। জলজ খাদ্য-শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে ঝিনুক একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং এরা জলজ খাদ্য শিকলের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ঝিনুক চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে ঝিনুক চাষের মাধ্যমে মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীসহ দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার উন্নয়ন সম্ভব।

দেশের বিভিন্ন জলাশয় যেমন— পুকুর, খাল, বিল, হাওড় ও বাঁওড়ে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির শামুক পাওয়া যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শামুকের মাংস খাদ্য হিসেবে প্রচলিত। তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চিংড়িঘেরে গলদা চিংড়ির খাদ্য হিসেবে এ শামুক ব্যবহার হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশের শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় বসবাসরত জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র পরিসরে শামুকের চাষ করছে। পাশাপাশি শামুক চাষে আলাদা খাবার দেয়ার দরকার হয় না। শামুক পুকুরে বায়োফিল্টার হিসেবে কাজ করে বলে পানির গুণাগুণ ভালো থাকে।