সম্পাদকীয়

বাল্যবিবাহ বন্ধের একটি দিকনির্দেশনা

সাজেদা আমিন, এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ, সারা হোসেন, জাকি ওয়াহাজ | ২০:৪৭:০০ মিনিট, মে ২৮, ২০১৭

একটি কিশোরী মেয়েকে যখন জোর করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করা হয়, তার দুর্ভাগ্য তখন থেকেই শুরু। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, যেসব মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগে হয়, তাদের আরো পরে বিয়ে হওয়া মেয়েদের তুলনায় শিক্ষাপ্রাপ্তির সুযোগ কম, পারিবারিক জীবনে নির্যাতনের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে।

তা সত্ত্বেও এখনো অনেক উন্নয়নশীল দেশে বাল্যবিবাহ একটি সাধারণ প্রথা বা রীতি হিসেবে বিদ্যমান। ইউনিসেফের তথ্যানুসারে, বর্তমানে বিশ্বে ৭০ কোটি নারী জীবিত রয়েছেন, যাদের বিয়ে ১৮ বছর বয়সের আগে হয়েছে। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে প্রতি তিনজনের একজনের বিয়ে হয়েছে তাদের শিশুকালে।

এই ক্ষতিকর অবস্থার ইতি টানতে কী করা যেতে পারে? এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যেমন একটি সম্ভাব্য প্রতিচিত্র হতে পারে, তেমনি এটি আবার একটি সতর্কতার বাণীও বহন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সের কিশোরী মেয়েদের বিয়ের হার বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ; নারীদের ওপর নির্যাতনও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। দুর্ভাগ্যক্রমে বাল্যবিবাহজনিত অপরাধের হাত থেকে মেয়ে ও নারীদের রক্ষা-সংক্রান্ত আইনি প্রচেষ্টাগুলোকে বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে উল্লেখযোগ্য বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সমাজে বিদ্যমান ধর্মীয় মতবিভেদ ও লিঙ্গবৈষম্যও বাল্যবিবাহবিরোধী আইনি লড়াইকে ব্যাহত করছে।

বাল্যবিবাহ রোধ আইন (সিএমআরএ), ১৯২৯— যা কিনা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রচলিত— এ অনুযায়ী কেউ যদি ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ের আয়োজন করে বা ‘চুক্তি’ বা ‘সম্পাদন’ করে, তবে তাকে কারাদণ্ড অথবা জরিমানার মাধ্যমে সাজা দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এ আইন প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয় এবং বাস্তবে কদাচিত্ কার্যকর হয়ে থাকে।

গত তিন বছরে এ আইন সংশোধন করার জন্য একটি বিলের বিভিন্ন খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এ প্রস্তাবগুলোয় সহায়তা ও অংশগ্রহণের অপরাধের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে, বাল্যবিবাহ বাতিল করার কথা বলা নেই। যিনি বাল্যবিবাহ সম্পাদন করবেন বা যেসব প্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরীদের বর-কনে হিসেবে গ্রহণ করবেন, তারা হয়তো আইন ভাঙবেন এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হবেন। তবে বিবাহটি কিন্তু আইনসম্মতই থাকবে।

এ খসড়া আইনের প্রতিটি সংস্করণ বাল্যবিবাহের আইনগত এ দিকটি উন্মুক্ত রেখেছে। তার ওপর এ খসড়াগুলোয় কঠোর জরিমানা ও কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আরো বেশি দায়িত্ব অর্পণ করা হলেও ব্যতিক্রমের জন্য আরো বেশি ছাড় দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে ১৮ বছর বয়সের নিচে বিয়েকে ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইন দ্বারা অনুমতি দেয়া হয়েছে। সদ্য পাসকৃত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ ব্যতিক্রমকে এক অর্থে অনুমতি দিয়েছে।

এ ‘বিশেষ ক্ষেত্র’ কী, তা একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এভাবে যে, এটি ‘পারিবারিক’ সম্মানজনিত। যেমন— এই ‘বিশেষ ক্ষেত্রে’ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ধর্ষণের কারণে গর্ভবতী হয়ে পড়া কোনো কিশোরী, যদি তার বাল্যবিবাহে আদালতের অনুমতি এবং তার মা-বাবার সম্মতি থাকে। কিন্তু যে বিষয়টি নীতিনির্ধারকরা বিবেচনায় নেননি, সেটা হচ্ছে— এ ধরনের নীতিকাঠামো নারীদের সম্মতি প্রদানের অধিকার সম্পর্কিত আইনি বিধানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যেগুলো কিনা অতীতে প্রায় এক শতক ধরে নারী অধিকারের আইনি সুরক্ষা করছে।

এসব আইনি চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়ন অভিজ্ঞতা আশার আলো দেখাতে পারে। গত তিন দশকে কিশোরী ও নারীদের জীবনযাপনের মান উন্নয়নে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এক প্রজন্ম আগেও মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল। আজ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা উভয় ক্ষেত্রেই লিঙ্গসমতা বহুলাংশে অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। নারী শিক্ষার সামাজিক গুরুত্ব প্রসঙ্গে একটি সর্বজনীন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য এক্ষেত্রে ছিল মূল চালিকাশক্তি।

এমনকি বাল্যবিবাহ ইস্যুতে পেছনের তিন বছরে রাজনৈতিক অগ্রগতিও বেশ উত্সাহব্যঞ্জক। ২০১৪ সালে জুলাইয়ে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গার্ল সামিটে বাংলাদেশের সরকার বলেছিল, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে মেয়েশিশুদের বিয়ে নির্মূলের লক্ষ্য স্থির করেছে। এ বয়সী কিশোরীদের বিয়েকে নীতিলক্ষ্যবস্তু করাটা ছিল একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং এ ধরনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও কার্যকরের দাবি ক্রমেই বাড়ছে। তা সত্ত্বেও এটা আশাব্যঞ্জক যে, এ বিষয়ে সরকারের মধ্যে অন্তত যথেষ্ট রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কিছু অংশকে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিষয়ে সচেতন করার ক্ষেত্রে এখনো যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার সম্প্রদায়গুলো প্রায়ই ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম মূল্যায়ন করে। এর একটি অন্যতম কারণ মেয়েদের দক্ষতা অর্জন ও বৈতনিক কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ। সে কারণে পারিবারিক দিক থেকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়াকে একজন মেয়ের ভবিষ্যত্ নিশ্চিতের সবচেয়ে উত্কৃষ্ট উপায় বলে মনে করা হয়। কিন্তু নারীদের জীবনের সীমাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রিত হয় পিতৃতান্ত্রিক নিয়ম দ্বারা, যা কিনা সমাজ, সম্প্রদায় ও পরিবারকেও নিয়ন্ত্রণ করে।

পিতৃতান্ত্রিক রক্ষণশীল মূল্যবোধ কিশোরী ও যুবতী নারীদের জীবনের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে। এর একটি কারণ হলো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পরিবারের ‘সম্মান’ কন্যা ও বধূর চারিত্রিক ‘বিশুদ্ধতার’ সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। সেক্ষেত্রে একজন অবিবাহিত কিশোরী মেয়ের সুনাম অবশ্যই সতকর্তার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। কেননা চারিত্রিক সুনামের ক্ষতি হলে সমাজে মেয়েটির পরিবারের সম্মান যথেষ্ট ক্ষুণ্ন হতে পারে। বাল্যবিবাহ আইন সংস্কারের প্রস্তাব সমর্থন করার জন্য সরকার প্রায়ই এই স্পর্শকাতর বিষয়টির উদ্ধৃতি টানে। এ প্রেক্ষাপটে সদ্যপাসকৃত বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ‘বিশেষ ক্ষেত্রের’ বিধান পিতৃতান্ত্রিক বিরোধিতা অথবা ধর্মীয় চরমপন্থীদের সম্ভাব্য ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর একটি মোক্ষম রাজনৈতিক পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে এই ব্যতিক্রমকে আইনি প্রক্রিয়ায় মেনে নেয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে একটি চড়া সামাজিক মূল্য দিতে হতে পারে। নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহ বন্ধে বাংলাদেশের সফলতা নির্ভর করবে বিদ্যমান নীতিমালায় ফাঁকফোকর বন্ধ করে আইনের শাসন শক্তিশালী ও কার্যকর করার ওপর। পাশাপাশি এ ধরনের পদক্ষেপের সঙ্গে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রচারণা, জনমত গঠন ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে, যা সর্বস্তরের মানুষকে বাল্যবিবাহ নির্মূলের লক্ষ্যপূরণে সহায়তা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এবং একই সঙ্গে নারীদের ক্ষমতায়ন হবে। সে রকম প্রকল্প ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত অ্যাঞ্জেলিক কিডহো বলেছেন, ‘পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে থেকেই দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলিক পরিবর্তন আসে। এবং এটি বিশেষভাবে নির্ভর করে মা-বাবা উভয়ের সম্মিলিতভাবে সমাধান খুঁজতে পারার সংস্কৃতির ওপর, যা কিনা সুনির্দিষ্টভাবে তাদের মেয়ের জীবনে পরিবর্তন আনবে।’ সাম্প্রতিক সময়ের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বেসরকারি খাতের কিছু সফল উদ্যোগ (যেমন— ব্র্যাকের কিশোরী ক্লাব প্রকল্প; পপুলেশন কাউন্সিল পরিচালিত বালিকা প্রকল্প) অ্যাঞ্জেলিক কিডহোর এ বক্তব্যকে সমর্থন করে।

২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এখনো বাংলাদেশের জন্য খুব সম্ভব। যদি সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জনবান্ধব প্রক্রিয়ায় ও যৌথভাবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে মিলে এই সামাজিক ব্যাধির মোকাবেলায় নেতৃত্ব দেয়। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, বাংলাদেশের জনগণ সাগ্রহে সাড়া দেবে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]

 

সাজেদা আমিন: সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট, পপুলেশন কাউন্সিল, নিউইয়র্ক সিটি
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ:  অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস, মালয় বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়ালালামপুর
সারা হোসেন: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ এবং অবৈতনিক পরিচালক, ব্লাস্ট (বিএলএএসটি)
জাকি ওয়াহাজ: সিনিয়র লেকচারার, কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
ভাষান্তর: আবু সাঈদ