সবুজ

শরণার্থীদের ‘মা’ সাদরাফকিন

ফিচার ডেস্ক | ২০:১১:০০ মিনিট, জানুয়ারি ০৯, ২০১৭

এই মুহূর্তে পৃথিবীতে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ মিলিয়ন। নানা প্রতিকূলতায় নিজ দেশ ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে বাধ্য হওয়া এই মানুষের কণ্টকাকীর্ণ জীবনযাত্রাকে সহজ করে দিতে পারে একটি ছোট শব্দ— ‘জেনোফিলিয়া’, এর অর্থ ‘ভিনদেশীদের প্রতি মমতা’। শব্দটি পৃথিবী নামের এই ছোট গ্রহের মতো যদিও সুন্দর, তবু যেন আজকাল এটি দেখা বেশ বিরল। এর উল্টোটা ‘জেনোফোবিয়া’, সেটিই যেন আজকাল জেঁকে বসেছে পৃথিবীতে। তবে এই কথাটি অন্য অনেক মানুষের জন্য সত্য হলেও একেবারেই খাটানো যাবে না মেসিডোনিয়ান নারী লেন্স সাদরাফকিনের ক্ষেত্রে। কারণ তিনি এমন একজন, যাকে তার অঞ্চলের শরণার্থীরা ডাকেন ‘দ্বিতীয় মা’ বলে। 

লেন্স সাদরাফকিন মেসিডোনিয়ার ভেলেস শহরের এক সাংবাদিক, যিনি একই সঙ্গে একজন মানবাধিকারকর্মীও। অনেক দিন ধরেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন তার শহরের পথ ধরে পশ্চিমের দেশগুলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া গ্রিসের শরণার্থীদের নিয়ে। সম্প্রতি তিনি তার অভিজ্ঞতাগুলো লিখিত আকারে তুলে ধরেছেন ‘সামো প্রাশাজ’ নামের একটি প্লাটফর্মে। সেখানে উঠে এসেছে এ মানুষগুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তার নানা অভিজ্ঞতা ও ভাবনার হূদয়স্পর্শী কিছু বর্ণনা।

সাদরাফকিনের এ ভাবনার শুরুটা হয়েছিল একদম তার চোখে দেখা কিছু অভিজ্ঞতা থেকে। তার বাসা এমন একটা জায়গায় ছিল, যেখানে রেলগাড়ির ট্র্যাক ধরেই এগিয়ে যেত পাশ্চাত্যে অভিবাসনপ্রত্যাশী শরণার্থীরা। এর বাইরে সাধারণ পরিবহনগুলো তারা এড়িয়েই চলত। কারণ, তাতে করে তাদের বহনকারী যানচালকদের বিপদে পড়ার একটা আশঙ্কা থেকে যায়। এ জনস্রোত থামাতে মেসিডোনিয়ান কর্তৃপক্ষ যদিও বা কিছু আইন তৈরি করতে শুরু করল, তাতে সংখ্যাটা কিছুটা কমে এলেও তা নেহাত কম ছিল না। এর মাঝে বহু শরণার্থীই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বা অজানা দেশে স্থানীয় দুর্বৃত্ত শ্রেণীর লোকজনের খপ্পরে পড়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকত সেখানে।

শরণার্থীদের নিয়ে কাজ শুরুর কথা বলতে গিয়ে সাদরাফকিন ২০১৩ সালের এমন একটা সময়ের কথা উল্লেখ করেন, যখন সে অঞ্চলে সবসময়ের মতোই ছিল প্রচণ্ড শীত। সময়টা হবে মার্চ অথবা এপ্রিল, অথচ শীতের হাত থেকে রেহাই নেই। এর মাঝে যখন তিনি কয়েকজন শরণার্থীকে ও ছোট ছোট ছেলেকে দেখলেন প্রতিকূল আবহাওয়া, সেসঙ্গে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার সঙ্গে লড়াই করে যেতে, তিনি তাদেরকে কিছু রুটি কিনে দিলেন। আইনের কড়াকড়ি ছিল, তাই রাতেই এ কাজগুলো করতেন। রাজনৈতিক ব্যক্তি আর গণমাধ্যমগুলোর প্রচারণার সুবাদে লোকের মধ্যে ‘আগন্তুক ভীতি’র অভাবও ছিল না। তবুও কাজ করে গেছেন এ নারী নিজের মতো করে। নিজের লেখনীতে সাদরাফকিন বলেন, ‘সে সময় অপেক্ষা করার অথবা তারা কে বা কী, এসব কথা জিজ্ঞাসা করার সময়টাই ছিল না।’

প্রথমে সাদরাফকিন কাজগুলো করতেন নিজের ব্যক্তিগত যা সামর্থ্য, তার মধ্য থেকেই। নিজের কিছু জিনিসপত্র বিক্রিও করতে শুরু করেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে আরো কিছু খোলা মনের মানুষদের সঙ্গে মিলেমিশে একটি নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কাজ করতে শুরু করেন। বর্তমানে অনেকের অর্থিক সহায়তা একত্র করে তা থেকেও খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো শরণার্থীদের কিনে দিচ্ছেন তিনি। আর মাঝে মাঝে তার উঠোনে এসে জড়ো হয় ৩০০-৪০০, এমনকি পাঁচশর মতো শরণার্থী। এমন সময় গুরুত্ব বুঝে যাচাই-বাছাই করে যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদেরকেই আলাদাভাবে দেখভাল করতে হয় তার। রেড ক্রসকে ফোন দিয়ে সহায়তা চান কখনো, কখনোবা নিজেই আক্রান্তদের ক্ষত পরিষ্কার করতে বসে যান। আর সেজন্যই তারা সাদরাফকিনকে ডাকেন ‘লেন্স’ বা ‘মা’!

এমনকি বয়সে বড় এমন অনেক মানুষও রয়েছেন, যারা সাদরাফকিনকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। একবার সে শরণার্থীদের মাঝে একজন এ নারীকে বলেছিলেন, ‘আমি আলেপ্পোয় একজন মাকে রেখে এসেছিলাম, তুমি আমার দ্বিতীয়জন।’ কেউ আবার গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার পরে ফোন দিয়ে বলেন, ‘মা, আমি নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে গেছি।’ তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হন সাদরাফকিন।

সাদরাফকিন যেমন বোঝেন এই আগন্তুকদের, তেমনি তারাও বোঝেন এই মাকে। এক্ষেত্রে ভাষা, দেশ কোনো কিছুই যেন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না। একবার ইরাক অথবা সিরিয়া থেকে কোনো এক ছেলে তাকে লিখেছিল, ‘আমি যেকোনো মূল্যে হেঁটেই যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি, তুমি কি আছ?’

হ্যাঁ, ভাগ্যবঞ্চিত এই মানুষের জন্য আগের মতোই মমতার দুই হাত বাড়িয়ে আছেন মেসিডোনিয়ার এই ‘মা’ সাদরাফকিন।